রামকালী প্রায় বিরক্ত স্বরে বললেন, তা এইটা কি কথার জায়গা?
ভুবনেশ্বরীর চোখে যে ধারাশ্রাবণ, তা ঘোমটার মধ্যে থেকেই ধরা যায়।
সেই শ্রাবণ-বর্ষণের মধ্যেই তার কথা শোনা যায়, কখন তোমায় পাচ্ছি?
রামকালী ঈষৎ শান্তস্বরে বলেন, তা কথাটা কি, বলে নাও চটপট! চারিদিকে লোকজন
বলছি–সত্যর কথা–
রামকালীর গলায় কেমন একটা বিরূপ গম্ভীর স্বর বাজে, হ্যাঁ শুনলাম। ওর দিকে একটু লক্ষ্য রাখবে। বেশী দৌড়ঝাঁপ না করে। যাও, বাড়ির মধ্যে যাও।
ভুবনেশ্বরীর শরীর একটা মূক অভিমানে কেঁপে ওঠে, আর কথা বলে না সে, আস্তে আস্তে মুখ ফিরিয়ে সরে আসে।
তার গতিভঙ্গীর দিকে তাকিয়ে রামকালীর একবার মনে হয়, আর একটু নরম করে কথা বললে ভাল হত। নির্বোধ মানুষটা মেয়ের এই সংবাদে ভয়ে সারা হচ্ছে। কিন্তু কি করবেন রামকালী, এটা তো আর স্ত্রীর সঙ্গে গালগল্পের জায়গা নয়!
ভাবেন কোনো এক সময় বলে দেবেন, ভয় পাবার কিছু নেই।
কিন্তু কোন সেই সময়?
রামকালী জানেন কি?
জানেন কি স্ত্রীর সঙ্গে গালগল্প করা কি বস্তু? স্নেহ প্রেম ভালবাসা এগুলো ব্যক্ত করার বস্তু নয়, এটাই জানেন রামকালী।
সত্যর শ্বশুরবাড়িতে খবর পাঠতে কাকে নির্বাচন করা যায়, তাই ভাবতে ভাবতে চণ্ডীমণ্ডপে গিয়ে বসেন রামকালী।
.
মোক্ষদা চলে আসেন।
এবং তোড়জোড় লাগিয়ে দেন সত্যর শ্বশুরবাড়িতে খবর দেবার।
গিরি তাঁতিনী যাবে।
গরুরগাড়ি নিয়ে রাখুও যাবে। গিরির জন্যে তসর শাড়ি আসে, রাখুর জন্যে হলুদে ছোপানো ধূতি-চাঁদর। মস্ত একটা পেতলের হাঁড়িতে একহাঁড়ি ঘানিভাঙা তেল, আর মস্ত একটা মটকিতে বোঝাই কাঁচাগোল্লা। এ দৃশ্য দেখলেই ঘটনাটা বুঝতে পারবে সত্যর শাশুড়ী, মুখ ফুটে বলতেও হবে না।
ওরা বেরোবার মুখে রামকালী হঠাৎ থামান। মোক্ষদাকে উদ্দেশ করে একগেঁজে টাকা বাড়িয়ে ধরে বলেন, সেখানে লোকজন সবাইকে যেন পরিতোষ করে আসে, দিয়ে দাও গিরির হাতে।
সংসারসুদ্ধ সবাই আহ্লাদে ভাসছে, দীনতারিণীর মৃত্যুশোক এ আহ্লাদকে পরাভূত করতে পারছে। শুধু রামকালীই যেন পরাভূত হয়ে যাচ্ছেন, চেষ্টা করেও তেমন আহ্লাদ আনতে পারছেন না।
যেন রামকালীর কী একটা লোকসানই ঘটেছে।
সত্য বড় হয়ে যাচ্ছে, সত্য বড় হয়ে গেছে!
গিয়েই তো ছিল। তবু যেন কোথায় একটু আশা ছিল। মাতৃশ্রাদ্ধের বিরাট কাজের মধ্যে দেখছিলেন সত্যর ছুটোছুটি আসা-যাওয়া গালগল্প। মনে করছিলেন যা ভাবছিলাম তা নয়, শুধু শ্বশুরবাড়ির চাপে পড়েই
ভাবছিলেন হাতের কাজটা হালকা হলেই সত্যকে ডেকে কাছে বসিয়ে কথা বলবেন।
কাজ না মিটতেই মোক্ষদা এলেন ভগ্নদূতের মূর্তিতে।
আর কাকে “কাছে” বসাবেন রামকালী?
অনেক দূরে চলে গেল যে সে।
নাঃ, কাছে আর কোনোদিন পাবেন না তাকে রামকালী।
এক নতুন চক্রের চক্রান্তে পড়ে অন্য আর এক রাজ্যের প্রজা হয়ে গেছে সত্য।
সে রাজ্য প্রমীলার রাজ্য, সে চক্রান্ত বিধাতার চক্রের।
২৬. নবকুমার চলে গিয়ে পর্যন্ত
নবকুমার চলে গিয়ে পর্যন্ত এই কটা দিন আরো টো-টো করে বেড়াচ্ছিল সত্য, বাঁধা গরু ছাড়া পাওয়ার ধরনে, নবকুমারের উপস্থিতিতে সামান্য যেটুকু সাবধান হতে হচ্ছিল তাও ঘুচেছিল, হঠাৎ শ্যেনদৃষ্টি মোক্ষদার মোক্ষম আবিষ্কারের ফলে স্বাধীনতা সাংঘাতিক রকম খর্ব হয়ে গেল তার।
বিদ্রোহ করা চলছে না, উঠতে বসতে উপদেশের ঠেলা। দরজায় বসিস নি, দুজনের মাঝখান দিয়ে যাস নি, সাঁঝ-সন্ধ্যে হয়ে গেলে উঠোনে নামিস নি, শনি-মঙ্গলবারে পথে বেরোস নি পুকুরে একা যাস নি, নিষেধের বৃন্দাবন একেবারে। তাছাড়া আছে “বিধি”।
পায়ের আঙুলে রুপোর আঙটি পরে থাকো, চলের আগায় আর শাড়ীর আচলে সর্বদা গিঠ বেঁধে রাখো, শত্রুপক্ষ জাতীয় কোনো মহিলাকে দেখলেই সরে বসো এবং নজর-খরা কোন মহিলার নজরে পড়ে গেছ সন্দেহ হলেই দেহের কোনোখানে লোহা পুড়িয়ে ছ্যাকা দাও, রাত্রে খোপা খড়কে রাখো, এইসব অনুশাসনের শাসনে চলতে হচ্ছে সত্যকে।
সত্যকে যেন বেঁধে মারছে এরা।
তবু সত্য যখন-তখনই ভয়ানক অঘটন ঘটিয়ে বসছে।
যেমন অন্যমনস্কতায় পান-ধোওয়া জল মাড়িয়ে গেল, মাছ-ধোওয়া জল ডিঙিয়ে গেল, হেঁচতলায় নিজের শাড়িখানা মেলে দিয়ে বসল, এই সব সর্বনেশে কাণ্ড!
ভুবনেশ্বরী কেবল বলে, অ সত্য, কখন কি করে বসবি, আয় না আমার কাছে, একটু বোস না!
এক-আধবার বসে সত্য।
হয়তো ভিতরের কোন ক্লান্তিতেই। কিন্তু বেশীক্ষণ মায়ের কাছে কাছে থাকতে তার লজ্জা করে। তাছাড়া চিরচঞ্চল চিত্ত তার দীর্ঘকাল শ্বশুরঘর করেছে অচঞ্চল ভুমিকা নিয়ে, আর সে সহজ ক্লান্তির কাছে হার মানতে রাজী হয় না, হয় না মমতার কাছে বশ্যতা স্বীকার করতে।
অতএব একদিন রামকালীর কাছে নালিশ পৌঁছায়। বলা হল, তুমি শাসন করো।
কিন্তু রামকালী কি করলেন শাসন?
নাকি চিকিৎসক-জনোচিত নিষেধের বাণী বর্ষণ করলেন?
না, সে সব কিছুই করলেন না রামকালী। কেন কে জানে ভিতরে ভিতরে একটা পীড়া বোধ করছেন তিনি। কেমন যেন একটা বিমুখতা। যেন শেষ সম্বলটুকুও হারিয়েছেন, তাই মনের মধ্যে নির্লিপ্ত শূন্যতা।
রামকালী শুধু একদিন মেয়েকে ডেকে বললেন, গুরুজনরা যা বলছেন, মন দিয়ে শুনবে। ওঁরা বোঝেন, ওঁদের কথা মেনে না চললে ক্ষতি হতে পারে।
