তা হয় না সারদা!
তাও হয় না?
সারদাপ্রসাদ ঘাড় ফিরিয়ে বলে, বাড়ির লোকেরা, বাড়ির ছেলেরা রোজগার করে এনে বাড়ির হেডের হাতে দেয় না?
সরোজাক্ষ একটু থেমে যান।
কিন্তু সরোজাক্ষ থেমে থাকেন না, আবার কথা বলে ওঠেন।
হয়তো সরোজাক্ষর শত্ৰুগ্রহই কথা বলায়। নইলে সরোজাক্ষ তত বাদ-প্রতিবাদের মানুষ নন। সরোজাক্ষ তো একটা বিষয় নিয়ে দুটো কথা বলতে ভালবাসেন না।
তবু আজ বললেন।
বললেন, ওটা তোমার রোজগারের টাকা হলে হয়তো আপত্তির ছিল না সারদা, কিন্তু তা তো নয়।
তা নয়?
সারদাপ্রসাদ কায়দা করে জামার কাঁধে মুখ নামিয়ে চোখটাকে কিঞ্চিৎ ভদ্রমতো করে নিয়ে বলে, তবে কি আমি চুরি করে এনেছি?
কী করেছ তা অবশ্য তুমিই জানো, কিন্তু হঠাৎ তুমি—
তা জানি৷ সারদা ক্ষুব্ধ আহত গলায় বলে, হঠাৎ আমাকে কেউ একটা অফিসারের চেয়ারে বসিয়ে দিয়েছে সে কথা বলছিও না। পাবলিশার দিলে সেটাও রোজগারই।
পাবলিশার?
সরোজাক্ষর মুখে একটা সূক্ষ্ম হাসি ফুটে ওঠে।
সে হাসি সারদাপ্রসাদের চোখ এড়ায় না। সারদাপ্রসাদের মনে হয় সিঁড়িটা দুলছে। সারদাপ্রসাদের মনে হয় চিরদিন যে মাটিটার উপর সে মাটি ভেবে নিশ্চিন্তে দাঁড়িয়ে ছিল, হঠাৎ দেখা যাচ্ছে সেটা চোরাবালি।
সারদাপ্রসাদের মাথা থেকে পা পর্যন্ত একটা তরল আগুন ছুটোছুটি করে ওঠে। সারদাপ্রসাদ ধৈর্য হারায়, জীবনে কখনও যা না করেছে তাই করে, সরোজাক্ষর সামনে তীব্র গলায় চেঁচিয়ে ওঠে, হাসলেন যে? হাসলেন কেন?
সরোজাক্ষ চমকে ওঠেন।
সরোজাক্ষর হঠাৎ মনে হয়, সারদাপ্রসাদের গলার স্বর জীবনে এই প্রথম শুনলেন।
এই অপরিচিত স্বরকে আর শুনতে সাহস হল না সরোজাক্ষর, বললেন, হাসব কেন?
বলে ঘরে ঢুকে এলেন।
হাসলেন তো–বলে সারদাপ্রসাদও পিছু পিছু আসে।
কিন্তু ততক্ষণে অন্য ঘটনা ঘটে গেছে। সারদাপ্রসাদের ওই বিকৃত কণ্ঠের চিৎকার সুনন্দাকে ঘর থেকে বার করেছে, বার করেছে মীনাক্ষীকেও, আর নামিয়ে এনেছে বিজয়াকেও।
ওরা সাহস করল না।
বিজয়া সাহস করলেন।
বিজয়া ঘরে ঢুকে এসে বলে উঠলেন, ব্যাপার কি ঠাকুরজামাই? হঠাৎ হাল্লা তুলেছ যে?
হাল্লা?
সারদাপ্রসাদের ভিতরের গুহার হঠাৎ-জেগে-ওঠা ঘুমন্ত বাঘটা আবার গর্জে ওঠে, আপনারা ভেবেছেন কী? আমি একটা মানুষ নই? আমার রোজগারের টাকা দাদা পা দিয়ে ছুঁলেন না, অবিশ্বাসের হাসি হাসলেন, আর আপনি
তোমার রোজগারের টাকা
বিজয়ার এতক্ষণে সারদাপ্রসাদের হাতের উপর চোখ পড়ে, বিজয়ার চোখে লোভের আগুন জ্বলে ওঠে। টাকা হচ্ছে টাকা, তার ইতিহাসটা যাই হোক।
আর মোটামুটি ইতিহাসটা বিজয়া অনুমান করেই নেন। যেভাবেই হোক ওই টাকাটা সারদাপ্রসাদ এনেছে এবং সরোজাক্ষকেই দিতে এসেছে, কিন্তু মহাপুরুষটি নিতে অস্বীকৃত হচ্ছেন।
বিজয়া বলে ওঠেন, তুমিও আচ্ছা বটে ঠাকুরজামাই, টাকা দিতে এসেছ পরমহংস ঠাকুরের কাছে? যাঁর কাছে টাকা মাটি, মাটি টাকা! আমরা বাবা সংসারী মানুষ, আমাদের কাছে টাকা টাকা! আমায় দাও
বিজয়া আপন পরিধেয়র শুচিতা ভুলে প্রায় ছোঁ মেরে টাকাটা নিয়ে নিতে যান।
কিন্তু সরোজাক্ষকে বুঝি আজ সর্বনাশের নেশায় পেয়েছে। তাই সরোজাক্ষ কঠিন গলায় বলেন, না। নেবে না। ও টাকা সারদা নিজের জমি-জমা বেচে নিয়ে এসেছে–
জমি-জমা!
আকাশ থেকে পড়ে সারদা।
আপনি সেই কথা ভাবছেন?
তবে কি সত্যিই ভাবব সারদা, তোমার ওই বই নিয়ে পাবলিশার—
ওই! আবার আপনি হাসছেন। সারদাপ্রসাদের মাথায় আগুন জ্বলে ওঠে, সারদাপ্রসাদ আবার চেঁচিয়ে ওঠে,নেহাত নাম বলা বারণ আছে তাই, নইলে আমি এক্ষুনিই আপনাকে নিয়ে গিয়ে ভজিয়ে দিতাম। দেখাতাম সত্যিই কেউ দিয়েছে কিনা।
নাম বলা বারণ! তবে আর কী করা–সরোজাক্ষ খাটের উপর বসে পড়ে বলেন, কিন্তু ওই অনামা অজানা টাকা তো তোমার বউদিকে নিতে দিতে পারি না সারদা।
নিতে দিতে পারেন না?
সারদাপ্রসাদও বুঝি বসে পড়ে।
তার মানে এ-সংসারের উপর আমার কোনও দাবি নেই! আমার টাকা আপনারা পা দিয়েও ছোঁবেন না? অথচ আমি চিরকাল নিজের বাড়ি ভেবে-সারদাপ্রসাদ ছটফটিয়ে পায়চারি করতে করতে বলে, বিনা দ্বিধায় খেয়েছি পরেছি, আবদার করেছি। তার মানে সেটা দয়ার ভাত খেয়েছি। তার মানে আপনি আমাকে বাড়ির একটা পোষা কুকুর-বেড়াল ছাড়া আর কিছু ভাবেননি।
আঃ। সরোজাক্ষ প্রায় ধমকে ওঠেন, কী বাজে বাজে কথা বলছ?
বাজে নয়, বাজে নয়, ঠিকই বলছি–সারদা সরোজাক্ষর সামনে এসে দাঁড়ায়, লাল লাল চোখে বলে, বুঝতে পারছি চিরদিনই আপনি আমার লেখাকে ব্যঙ্গের দৃষ্টিতে দেখেছেন। আজ সেই হাসি প্রকাশ পেয়ে গেছে। আমি মুখ, আমি গাধা, তাই বিশ্বাস করে এসেছি–সারদাপ্রসাদের চোখের জল এবার সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে পরম শত্রুতা করে বসে। সারদা ভাঙা ভাঙা গলায় বলে ওঠে, কিন্তু জগতে একজনও খাঁটি লোক আছে–জিজ্ঞেস করুন গে আপনার খুড়িমাকে, টাকা সারদা কোথায় পেয়েছে–
আবেগে উত্তেজনায় নাম প্রকাশের নিষেধবাণী রক্ষা করা সম্ভব হয় না সারদাপ্রসাদের। বলে ফেলে জামার হাতাটা তুলে তুলে ঘন ঘন চোখের জলটা মুছতে থাকে সারদা।
পুরুষমানুষের চোখের জল একটা মর্মান্তিক দৃশ্য বইকী! বোধ করি জগতের প্রধানতম মর্মান্তিকের অন্যতম। সরোজাক্ষ অপ্রতিভ হচ্ছিলেন, কিন্তু খুড়িমা শব্দটা যেন সরোজাক্ষর মাথার মধ্যে হাতুড়ির ঘা বসিয়ে দিল। সেই আঘাতে সরোজাক্ষর সামনের অন্ধকারের পরদাটা ছিঁড়ে উড়ে গেল। সরোজাক্ষ আর ওই মর্মান্তিক দৃশ্যটার জন্যে অপ্রতিভ হতে পারলেন না।
