তা সারদাপ্রসাদ যাই ভাবুক, সরোজাক্ষ সেই নোটের তাড়াগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ভাবেন, সারদা কি শেষটায় চুরি-ডাকাতি ধরল নাকি?
সারদার সঙ্গে ওই চুরি-ডাকাতি শব্দটা খাপ খাওয়ানো সহজ নয়, কিন্তু এটাই কি বিশ্বাস করা সহজ, সত্যি সত্যিই কোনও প্রকাশক ওকে তিন-তিন হাজার টাকা অগ্রিম দিয়ে বসেছে। কথায় ভুলে টাকা খসাবে, ব্যবসাদাররা এমন কাঁচা ছেলে নয়।
তবে আর কী?
ইদানীং যে সারদা উপার্জনের চেষ্টায় ঘুরছে সেটা সরোজাক্ষ বিজয়ার সুতীব্র এবং সশব্দ স্বগতোক্তির কল্যাণে নিজের এই আত্ম-নির্বাসন কক্ষে অবরুদ্ধ থেকেও টের পেয়েছেন, কিন্তু সেই চেষ্টার গাছে যে সহসা এতখানি ফল ধরে, সে ফল একেবারে পেকে উঠেছে, তাই বা বিশ্বাস করা যায় কী করে?
টাকাটা যে সারদাপ্রসাদ কোনও অলৌকিক পথে পেয়েছেন, তাতে সন্দেহ নাস্তি, কিন্তু অবোধ লোকটা কার খপ্পরে পড়ল সেইটাই তো চিন্তা।
তা ছাড়া সারদাপ্রসাদের এই আচরণটাও চিন্তার। এনে ফেলে দিয়েই ছুটে পালাবার হেতুটা কী?
লজ্জা?
হতে পারে।
কতকগুলো ব্যাপারে অহেতুক লজ্জা ওর আছে। কারও প্রতি মায়া-মমতা প্রকাশ করতে পারে না সে, ওটা খুব লজ্জার বিষয় ওর কাছে। তাই যে-কোনও ভাবে পাওয়া ওই টাকাটা অমন করে
কিন্তু সরোজাক্ষ?
সরোজাক্ষর কি লজ্জা নেই?
সরোজাক্ষ ওর সেই অব্যক্ত মায়া-মমতার শিকার হবেন?
না, তা হয় না।
সরোজাক্ষকে আপন নির্বাসন কক্ষ থেকে বেরোতে হল।
সরোজাকে ওই পলায়মান লোকটাকে ডেকে বলতে হয়, তা হয় না।
সারদাপ্রসাদ সেই তার অবোধ মুখটা নিয়ে বলে, হয় না? তার মানে?
মানে বুঝিয়ে দিতে হবে, এমন শক্ত কথা তো এটা নয় সারদা? ধরে নিচ্ছি তোমাকে তোমার কোনও পাবলিশার দিয়েছে টাকাটা। কিন্তু আমি সে টাকা নিতে যাব কেন? আর আমাকেই বা দিতে যাবে কেন তুমি?
আপনি নিতে যাবেন কেন? আপনাকে দিতে যাব কেন? সারদা হতভম্ব মুখে তাকিয়ে থেকে বলে, তবে কাকে দেব?
সরোজাক্ষ বলেন, দেবার কথা আসছে কোথা থেকে? তোমার টাকা তোমার নিজের কাছে রেখে দেবে। ব্যাঙ্কে জমা দেবে।
সারদাপ্রসাদের মুখটা আস্তে আস্তে লাল হয়ে ওঠে। তবু সারদাপ্রসাদ উত্তেজিত হয় না। শান্ত গলায় বলে, আমার টাকা আমি ব্যাঙ্কে জমা করে রাখব।
সদা উত্তেজিত সারদাপ্রসাদের মুখে এই শান্ত ভাবটা অদ্ভুত দেখতে লাগে। কিন্তু সরোজাক্ষর চোখে বোধহয় সেটা ধরা পড়ে না। কারণ সরোজাক্ষর চোখ দুটোই অন্যদিকে। সরোজাক্ষ আকাশে চোখ রেখে কথা বলছেন।
তাই সরোজাক্ষ আগের মতো সুরেই বলেন, হ্যাঁ, তাই তো রাখবে। সেটাই তো স্বাভাবিক। ভবিষ্যতে ওই টাকা থেকে তুমি অন্য খণ্ডগুলো ছাপাতে পারবে। সব সময় এ রকম পাবলিশার নাও পেতে পারো!
সারদাপ্রসাদও এবার অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে কথা বলে,ওই টাকা দিয়ে ভবিষ্যতের সুবিধের কথা ভাবব? সেই ভবিষ্যতের জন্যে আমি দোরে দোরে ঘুরে
থেমে যায়।
হয়তো শেষটা আর বলা সঙ্গত নয় বলে বলে না। অথবা হয়তো শেষটা আর বলতে পারে না বলেই বলে না।
কিন্তু যতটুকু বলেছে, বোঝবার পক্ষে সেটাই যথেষ্ট।
সরোজাক্ষর মুখটা লালচে হয়ে ওঠে।
সরোজাক্ষ গম্ভীর মুখে বলেন, আমার জন্যে তুমি দোরে দোরে ঘুরে টাকার সন্ধান করে বেড়িয়েছ?
আহা হা! কী আশ্চর্য! ইয়ে মানে আমি কি তাই বলছি? মানে আমি বলতে চাইছি, আমি বাউণ্ডুলে মানুষ, টাকা-ফাঁকা নিয়ে করবটা কী? হয়তো কোথায় রাখতে কোথায় রেখে হারিয়েই ফেলব। এ বরং নিরাপদ থাকল।
তা হয় না।
জজের রায় দেবার ভঙ্গিতে ওই ছোট্ট কথাটুকু উচ্চারণ করেন সরোজাক্ষ।
কিন্তু ওইটুকুই তো যথেষ্ট।
সারদাপ্রসাদের কানদুটো ঝাঁ ঝাঁ করে ওঠে। ওই টাকাটাকে ঘিরে ও মিষ্টি একটি স্বপ্ন দেখতে দেখতে আসছিল। আর কিছুই নয়। মিষ্টি একটু প্রসন্নতা, বইটা সম্পর্কে একজনও আগ্রহী হয়েছে শুনে এতটুকু আনন্দ। কিছুটা রিহার্সালও দিতে দিতে এসেছিল সারদাপ্রসাদ, প্রকাশকের নামধাম জিজ্ঞেস করলে কী বলবে।
সরোজাক্ষ সারদাপ্রসাদের সেই রঙিন কাঁচের ফুলদানিটা আছড়ে ভেঙে দিলেন!
তবু সারদাপ্রসাদ, হ্যাঁ, সেই গরম জলে ফেটে পড়া চোখটাকে কষ্টে সামলে সারদাপ্রসাদ ভাবল, আমারই ভুল হয়েছিল। আমার ভাবা উচিত ছিল দাদা এইরকমই একটা কিছু বলবেন। দাদাকে তো আমি জানি, এ টাকা বউদির হাতে দিলেই ঠিক হত। আমি দাদার একটু প্রসন্নতার আশায় এই বোকামিটা করে বসলাম।
তাই সারদাপ্রসাদ কষ্টে গলা পরিষ্কার করে বলে,ঠিক আছে। আপনাকে নিতে হবে না।
বলে ফের ঘরে ঢুকে নোটের তাড়া তিনটে কুড়িয়ে নিয়ে ছাদের সিঁড়ির দিকে এগোয়।
সরোজাক্ষ অবোধ নন।
সরোজাক্ষ বুঝতে অক্ষম হন না, সারদাপ্রসাদের লক্ষ্যটা কী।
তাই সরোজা গম্ভীর গলায় ডাকেন, সারদা।
শুধু সারদা।
তার বেশি কিছু নয়।
তবু সেই কেবলমাত্র ওই ডাকটির মধ্যেই ভয়ংকর একটি প্রতিবাদ। যেন পায়ে লোহার শিকল পড়ল সারদাপ্রসাদের।
অগত্যা দাঁড়িয়ে পড়তে হল তাকে।
সেই দাঁড়িয়ে পড়ার মধ্যেও শক্তি সংগ্রহ করতে লাগল সে। বেশ তো, উনি না নিলেন তো বয়েই গেল, বউদি কখনওই
মনে করল শক্তি সঞ্চয় হয়ে গেছে।
তাই শান্ত গলায় বলল, কী বলছেন?
বলছি টাকাগুলো নিয়ে তুমি ছাতে যাচ্ছ কেন?
যাচ্ছি এমনি।
এমনি বলে কোনও কথা হয় না সারদা!
এমনি আবার কী। আমি বাড়ির গিন্নিকে দেব।
