সরোজাক্ষ কপালটা টিপে ধরে ধিক্কারের গলায় বলে উঠলেন, সারদা, সত্যিই তুমি মুখ অবোধ। তাই খুড়িমা তোমাকে মাধ্যম করে তোমার পাবলিশার সেজে খুড়িমা ও টাকা আমার সংসারকে ভিক্ষে দিয়েছেন সারদা! জানেন–তুমি সেটা বুঝতে পারবে না। তুমি সত্যিই বিশ্বাস করবে তোমার ওই ছেঁড়া কাগজের বোঝাগুলো
কথার মাঝখানে থেমে যান সরোজা। বোধ করি হঠাৎ হুঁশ হয়। কোথায় গিয়ে পড়ছিলেন।
কিন্তু এ হুঁশে কি আর কোনও উপকার হয়? যেখানে পৌঁছতে যাচ্ছি ভেবে থমকালেন, সেখানে তো পৌঁছে গেছেনই।
ওই আধখানা কথায় শান্ত হয়ে গেছে সারদাপ্রসাদ। তার চোখের জল শুকিয়ে গেছে।
সারদাপ্রসাদ সেই শুকনো চোখ আর শান্ত গলায় বলে, এখন বুঝতে পারছি সেটা! মূর্খের শতেক দোষ, একথাটা শাস্ত্রেই আছে, তবে অন্ধেরও চোখ ফোটে।
বলে টাকাগুলো আবার পকেটে পুরে ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়, সিঁড়ি দিয়ে নেমে যায়।
সুনন্দা দেখে, মীনাক্ষী দেখে, ঘটনাটা কী ঠিক না বুঝলেও ওরা ভীত হয়। ওদের সাহস হয় না, ওই চিরসহজ মানুষটার কাছে এগিয়ে গিয়ে প্রশ্ন করতে, যাচ্ছ কোথায়?
এমনকী বিজয়াও মূক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন।
আর সরোজাক্ষ?
তিনি তো চির মূক।
তিনি যেন অনুভব করেন, তাঁর হৃদপিণ্ডের একটুকরো অংশ তিনি নিজেই খামচে ছিঁড়ে বার করে ফেলে দিলেন। সেই খামচানো জায়গাটায় হয়তো চিরদিনই ক্ষত থেকে যাবে।
সরোজাক্ষ আর কোনওদিন ওই মূর্খ অবোধ লোকটার মুখের দিকে তাকাতে পারবেন না।
কিন্তু এ ছাড়া আর কী করতে পারতেন সরোজাক্ষ?
বিজয়ার মতো টাকাকে কেবলমাত্র টাকা ভাবতে পারার ক্ষমতা তাঁর কোথায়? তবে এবার সরোজাক্ষকে স্বীকার করতেই হবে, মানুষ পরিবেশের দাস! পরিবেশকে অস্বীকার করে নিজের ছাঁচে নিজেকে গড়ব বলে পণ করে বসে থাকলে সেটা ব্যর্থতার বোঝা হয়ে ওঠে মাত্র।
সরোজাক্ষ কালই আবার কলেজের দরজায় গিয়ে দাঁড়াবেন। ঘাড় হেঁট করে বলবেন, আমি ভুল করেছিলাম।
আমি ভুল করেছিলাম!
মনে-প্রাণে স্বীকার না করলেও, বলতেই হয় মানুষকে একথা।
আমি ভুল করেছিলাম।
না বললে এই সমাজের মধ্যে তোমার ঠাঁই হবে না। তুমি যদি তোমার কর্মস্থলে গিয়ে সাধু হয়ে থাকতে চাও, যদি ঘুষ নিতে না চাও, দুর্নীতির প্রশ্রয় দিতে না চাও, যদি দুর্নীতিকে উদঘাটিত করতে চাও, তোমার ভাগ্যে জুটবে উৎপীড়ন, অসুবিধে, লাঞ্ছনা, অপমান, জুটবে দারিদ্র, অসহায়তা, অনিশ্চয়তা।
তুমি দরজায় দরজায় ঘুরে পৃথিবীর চেহারাটা দেখতে পাবে, তখন তুমি ফিরে গিয়ে বলতে বাধ্য হবে, আমি ভুল করেছিলাম, সাধু থাকার পণ করে মস্ত একটা ভুল করেছিলাম।
তুমি পৃথিবীর মন্ত্রে দীক্ষা নেবে তখন।
পৃথিবীই দেবে সে দীক্ষা।
সরোজাকে কেউ দীক্ষা দিতে আসেনি, কিন্তু ভিক্ষা দিতে এসেছে। তার থেকে অসহায়তাই বা আর কী আছে?
সরোজাক্ষকে অতএব পুরনো দরজায় ফিরে গিয়ে বলতেই হবে, আমি ভুল করেছিলাম।
আর সেটা যদি বলতে না পারো, ভীরু কাপুরুষের মতো পৃথিবী থেকে বিদায় নাও।
সরোজাক্ষ কি সেই পথই বেছে নেবেন?
ছি ছি!
তার মধ্যেই বা সম্মান কোথায়? গৌরব কোথায়? নিজের মতো করে বাঁচা কোথায়? নিজের মতো করে মরাটাকে পৃথিবী ক্ষমা করে না।
বলে, ছি ছি! লোকটা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালাল!
অথচ অতর্কিতে সহজ আর স্বাভাবিক মৃত্যু আসবে সেইসব মানুষের, যারা দীর্ঘদিন পৃথিবীটাকে আঁকড়ে ধরে থেকে অনেক শ্বাস-প্রশ্বাসের সংখ্যা গুনতে চায়।
সরোজাক্ষর দরজায় নাকি একদিন মৃত্যুর পদধ্বনি শোনা গিয়েছিল, দরজা থেকে ফিরে গেছে, ঘরে এসে ঢোকেনি। অতএব সরোজাক্ষকে জীবনের দরজায় গিয়ে হাত পাততে হবে।
কারণ পৃথিবী যদি কাউকে দীক্ষা দিতে না পারে, তোভিক্ষা দিতে আসে।
.
আচ্ছা তুমি আমার সঙ্গে এরকম শত্রুতা করছ কেন বলো তো?
নীলাক্ষ পরম আদরে স্ত্রীকে নিবিড় বাহুবন্ধনে বেঁধে বলে, সেই সেদিনের রাগটা বুঝি আর ভুলতে পারছ না?
সুনন্দা সুকৌশলে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে অবাক গলায় বলে, রাগই বা কীসের, শত্রুতাই বা কীসের?
নীলাক্ষ মনে মনে দাঁতে দাঁত চেপে বলে, হারামজাদি শয়তানি! ভদ্রঘরের বউ হতে এসেছিলে কেন তুমি? স্টেজে যাওনি কেন? পাবলিক থিয়েটারের স্টেজে? পয়লা নম্বরের একটি অভিনেত্রী হতে পারতে! অথচ আমার উপকারের জন্যে একটু প্রেমের অভিনয় করতে ক্ষয়ে যাও তুমি! তুতিয়ে পাতিয়ে খোশামোদ করে পাঠালে, তুমি শয়তানি আমাকে জব্দ করবার জন্যে এমন বাড়াবাড়ি করে বসো যে, পা থেকে মাথা অবধি জ্বলে যায়। বুঝতে পারি না সেটা সত্যি, না অভিনয়। যেমন মেহেরাটার সঙ্গে করছিলে। ব্যস, যেই সে একটু বেশি এগোতে গেল, অমনি তুমি পতিব্রতা হিন্দু কুলবধূ হয়ে ছিটকে পালিয়ে এসে ঘরের কোণে আশ্রয় নিলে! আর আমার অবস্থাটা কী হল? ভাবলে সেটা? ভাবছ একবারও? ব্যাটা বদমাশ যে এখন আমাকে জুতোর ঠোক্কর দিয়ে সরিয়ে দিচ্ছে, তার কি? তাকে আমি দোষ দিই না। এতখানি অপমানে পুরুষ বাচ্চা খেপে যাবে না? কিন্তু আমাকে যে সেই খ্যাপা কুকুরের কামড় খেতে হচ্ছে। পতিব্রতা! তাই যদি, পতির একটু উপকার করতে পারো না–এত অহংকার! আরে বাবা, তুই একটা বিবাহিতা মেয়ে, তোর আস্ত সুস্থ একটা স্বামী রয়েছে, তোর আবার এত ভয়টা কী?
কিন্তু মনের দাঁত মনের বাইরে মুখে আসে না। মুখের মধ্যেকার সাজানো দাঁতের পাটিটাই মুখের বাইরে উঁকি মারে।
