সারদাপ্রসাদ বলে, আশ্চর্য! আপনি একজন বিধবা মহিলা, আপনি সাহস করছেন, অথচ এই শহরের তাবড় তাবড় প্রকাশকমশাইরা বলেন, রিস্ক নিতে পারব না। তার মানে জিনিসটার প্রতি আস্থা নেই। তার মানে ভিতর থেকে কোনও প্রেরণা নেই। তার কারণ দেশ সম্পর্কে চিন্তা করেনি কোনওদিন। শুনলে অবাক হবেন, সেদিন একটি ছোকরাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আচ্ছা বলো তো এই যে আমাদের দেশে আকাশ-প্রদীপ দেওয়ার রীতি আছে, এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা কী? ছোকরা বাংলায় এম-এ, খুব নাকি ভাল ছাত্র, বলল কিনা, বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা বলে কিছু নেই, সম্পূর্ণ কুসংস্কার। স্রেফ মরা গোরুর ঘাস খাওয়ার ব্যাপার! মরে-যাওয়া পিতৃপুরুষের প্রেতদের জন্য যমপুরীতে আলো দেওয়া হয়। বলে সে কী ব্যঙ্গ হাসি! অথচ একটু ভেবে দেখলেই তাৎপর্যটা দেখতে পেত। তখন ছোকরার চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিলাম,ওহে বাপু, ওটা হচ্ছে গোলা লোকদের জন্যে ব্যাখ্যা! মানুষ জাতটা তো এক নম্বরের অবাধ্য? ভাল কথা কিছু শুনবে না তো? তাই একটা রূপকের বহিরঙ্গ। আসলে শ্যামাপোকার উৎপাত থেকে আত্মরক্ষার উপায়। বাড়িতে উঁচুতে একটা করে আলো জ্বললে পোকাগুলো সেখানেই ভিড় করবে। তা ছোকরা কথাটা বিশ্বাস করল কিনা কে জানে! হেসে চলে গেল। দেওয়ালির আলো ও আতসবাজির তাৎপর্যটাও বুঝিয়ে দেব ভেবেছিলাম, সময়ই দিল না। তা যাক সেকথা, আপনি তা হলে মনস্থই করে ফেলেছেন?
হৈমবতী প্রায় হইচই করে ওঠেন, মনস্থ বলে মনস্থ। আমি তো দিন গুনছি। তবে কিন্তু ওই যা বলেছি, একটি শর্তে। কিছুতেই যেন –
হ্যাঁ, একটি শর্ত হৈমবতী করেছেন তাঁর জামাইয়ের সঙ্গে। হৈমবতী যে প্রকাশিকা হতে চলেছেন, এটা যেন এখন না প্রকাশ হয়ে পড়ে। সবাইকে তিনি তাক লাগিয়ে দিতে চান।
সারদাপ্রসাদ সেকথা বিশ্বাস করেছে বইকী! এবং তাতে আমোদই অনুভব করেছে।
সারদাপ্রসাদ ঘাড় হেলিয়ে বলে, তা আবার বলতে! এ শুধু আপনি জানবেন, আমি জানব, আর কম্পোজিটার জানবে। আচ্ছা তা হলে চলি। সময় অন্তর একটু দেখবেন উলটেপালটে।না কি একেবারে ছাপা হলেই?
হৈমবতী ঘাড় হেলিয়ে বলেন, তাই ভাল।
কিন্তু ওই যা বললাম কাকিমা, প্রুফটা আমার নিজের দেখা দরকার।
হ্যাঁ সে তো নিশ্চয়, হৈমবতী অমায়িক গলায় বলেন,তুমি নিজে না দেখলে তো যা তা কাণ্ড হয়ে যাবে।
সারদাপ্রসাদ উচ্ছ্বসিত হয়।
এই, এইজন্যেই আপনাকে এত পুজ্যি করি কাকিমা! বোঝেন সব জিনিসটা। একটা অক্ষরের এদিক ওদিকে যে জিনিসটা একেবারে মার্ডার কেস হয়ে যাবে, একথা কজন বোঝে?
সারদাপ্রসাদ শেষবারের মতো পরম স্নেহভরে কাগজের বোঝাগুলোর উপর হাত বুলিয়ে বলে, তা হলে রইল? দেখবেন যেন কিছু
না না, এ আমি এখুনি যত্ন করে তুলে রাখছি।
সারদাপ্রসাদ আবার একটু বসে।
একগ্লাস জল চায়।
জল খাওয়ার অবকাশে আরও বার দুই-তিন কাগজগুলো স্পর্শ করে উঠে দাঁড়িয়ে বলে, যাক, আপনি আমায় বাঁচালেন। চাকরি খুঁজে খুঁজে বেড়ানোর দায় থেকে বাঁচালেন!
চাকরি?
হৈমবতী যেন আকাশ থেকে পড়েন। হৈমবতী যেন কোনওদিন শোনেননি, সারদাপ্রসাদ নামে অবোধ প্রাণীটা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে চাকরি খুঁজে বেড়াচ্ছে।
তাই আকাশ থেকে পড়া গলায় বলেন, চাকরি?
সারদাপ্রসাদ হেসে ওঠে।
যেন সবটাই কৌতুকের বিষয়।
বলে,আর বলেন কেন? ওইসব গণ্ডমুখ পাবলিশারদের উপর চটেমটে গিয়ে খাতাপত্তর গুটিয়ে চাকরিই খুঁজতে বেরিয়েছিলাম। করতে তো হবে একটা কিছু?
হৈমবতী ঈষৎ হেসে বলেন, তা তো সত্যি! সরোজও তো
না না সেজন্যে নয়, সেজন্যে নয়। দাদার কীসের অভাব? হাতির জন্যে মশা কী করবে? এ কেবল আমার নিজেরই জন্যে। মানে চুপ করে কি দিন কাটানো যায়?
সারদাপ্রসাদ তাড়াতাড়ি পালায়।
হৈমবতী অনেকক্ষণ সেইদিকে তাকিয়ে থাকেন। হৈমবতীর মুখে একটা বিচিত্র বিষণ্ণ হাসি ফুটে ওঠে।
৫. দশ টাকার নোটের তাড়া
চেক নয়, একশো টাকার নোটও নয়, স্রেফ দশ টাকার নোটের তাড়া। হয়তো হৈমবতী ওটাই সুবিধে বুঝেছিলেন।
সরোজাক্ষ সেই তিন তাড়া নোটের দিকে তাকিয়ে অবাক গলায় বলেন, কী এ?
সারদাপ্রসাদ যেন শেষ মুহূর্তে ট্রেন ধরতে যাচ্ছে।
সারদাপ্রসাদের ভঙ্গিতে অন্তত সেই ব্যস্ততা। নোটের তাড়া তিনটে সরোজাক্ষর সামনে ফেলে দিয়ে প্রায় দৌড়ে পালিয়ে যেতে যেতে বলে যায়, কিছু না, কিছু না। একজন পাবলিশার প্রথম খণ্ডটা নিয়ে হাজার তিনেক টাকা অ্যাডভান্স দিল, তাই
সারদাপ্রসাদের কণ্ঠে অনায়াস তাচ্ছিল্যের সুর। যেন হাজার তিনেক টাকাটা কিছুই না, যেন সেটা খোলামকুচির সমগোত্র, তাকে পকেট থেকে বার করে যেখানে-সেখানে ফেলে দেবার মধ্যে আশ্চর্যের কিছু নেই।
পালিয়ে গিয়ে অবশ্য পরিষ্কার করে কিছু ভাবতেও সময় লাগে বেচারার।
বুকের ধড়ফড়ানি কমলে তবে ভাবে, নাঃ মিথ্যে কথাটা আর কী? পাবলিশার বলতে দোষ কোথায়? বাংলায় তবু প্রকাশিকা বলে একটা শব্দ আবিষ্কার করা হয়েছে, কিন্তু ইংরেজি ভাষায় ওই পাবলিশার শব্দটার নারী সংস্করণ কী হওয়া উচিত তা যখন সারদাপ্রসাদের জানা নেই, তখন পাবলিশার ছাড়া আর কী বলবে সে?
তবে হ্যাঁ, মনে মনে মাথাটা নাড়ে সারদাপ্রসাদ, ওই দিয়েছে শব্দটা উচ্চারণ করা গর্হিত হয়েছে। দিয়েছেন বলা উচিত ছিল। কিন্তু কেমন গোলমাল হয়ে গেল। যাক গে, ভবিষ্যতে যাতে না জিভটা অমন অসতর্ক হয়ে বসে, হুশ রাখতে হবে।
