সারাক্ষণ মনের মধ্যে এই গজরানি নিয়ে কাটাচ্ছে নীলাক্ষ। অথচ সুনন্দাকে বাগ মানাতে পারছে না।
এমনকী বাপের বাড়িতেও তেমন বেশি বেশি যাচ্ছে না। সুনন্দার মা পর্যন্ত অনুযোগ করছেন, সুনু আর আসছে না কেন বাবা? বিচ্ছু বাবুকেও দেখতে পাচ্ছি না অনেকদিন
কিন্তু কেন সুনন্দার এই পরিবর্তন?
এ বাড়ির ছোট ছেলেটা, একদা নাকি যার বউদির প্রতি ছিল অগাধ শ্রদ্ধা ভালবাসা, সে অবজ্ঞা করেছে বলে?
আরে দূর দূর!
সুনন্দা কি পাগল? সেই ছেলেটা আবার একটা মনুষ্য পদবাচ্য নাকি? তাই তার একটু শ্রদ্ধা অশ্রদ্ধার প্রশ্নে সুনন্দা নামের দামি মানুষটা নিজেকে বদলাতে বসবে? তবে হয়তো তার ওই অবজ্ঞার আরশিতে হঠাৎ নিজের এই আত্মঘাতী মূর্তিটা দেখতে পেয়ে থমকে দাঁড়িয়েছে সুনন্দা। হয়তো ভাবছে, কার উপর আক্রোশ করে এই আত্মহনবনের যজ্ঞ করতে বসেছি আমি? যার উপর আক্রোশ, সে কি আক্রোশেরই যোগ্য?
গভীরে তলিয়ে গেলে হয়তো দেখা যায় আক্রোশের পাত্র নীলাক্ষ নামের ওই অর্থলোভী স্বার্থপর অন্তঃসারশূন্য লোকটাই নয়। হয়তো এ বাড়িতে যে আর একটি আত্মচিন্তা-কেন্দ্রিক পুরুষ নিজেকে সংসারের সমস্ত মালিন্য থেকে ভাসিয়ে নিয়ে উর্ধ্বে স্থাপন করে রেখেছেন, তিনি।
অভিমান বুঝি সুনন্দার তাঁরই উপর। যেন উনি রক্ষা করতে পারতেন, উনি সে কর্তব্য পালন করেননি। উনি কেবলমাত্র আপন অহমিকার পরিমণ্ডলে বাস করেছেন, আপন সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখার দিকে সজাগ থেকেছেন। তার মানে উনি গৃহকর্তার কর্তব্য পালন করেননি। উনি ভেবেছেন পাছে কেউ ওঁর নির্দেশ না মানে!
কিন্তু সুনন্দার বাবা তো এমন নয়?
তিনি নিজের ওই সম্মানহানির ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকেন না কখনও। তিনি স্ত্রী পুত্র পরিবারকে বকেন, শাসন করেন, ভালবাসেন। অতএব তাঁর শাসিত প্রজাকুল সেটাকেই স্বাভাবিকনীতি ভেবে তটস্থ থাকে।
কিন্তু সরোজাক্ষ যদি হঠাৎ শাসন করতে নেমে আসেন? কেউ কি স্বাভাবিক ভাববে? শাসিতা নিজেদের অপমানিত ভাববে।
অথচ আমি সেইরকমই একটি সংসার চেয়েছিলাম– সুনন্দা ভাবে, সেই আমার ধারণাগত পারিবারিক আদর্শের ছাঁচে তৈরি সংসার। চেয়েছিলাম কল্যাণী বধু হতে, সেবাময়ী স্ত্রী হতে, স্নেহময়ী মা হতে। আমি তা হতে পেলাম না। আমার স্বামীর লোভের আগুনে ধ্বংস হয়ে গেলাম আমি।আমি নির্লজ্জ পোশাক পরাটাই বাহাদুরি বলে গণ্য করতে শিখলাম, লোকব্যবহারে আমি শালীনতা বর্জন করতে শিখলাম, আমি অকল্যাণের মশাল হাতে নিয়ে জীবনের সমস্ত মূল্যবোধগুলিকে পুড়িয়ে দিতে শিখলাম।
তার মানে আমি জগতের সেই চরমতম বোকামির নিদর্শন–চোরের ওপর রাগ করে মাটিতে ভাত খাওয়ার উদাহরণ হলাম। অথচ লোকে আমায় বুদ্ধিমতী বলত। আর আমিও বিশ্বাস করতাম সে কথা।
আপন জীবনটুকুকে যে নিজের মতো করে সাজাতে পারে না, ধুলোয় ছড়িয়ে ফেলে, তার আবার বুদ্ধির বড়াই!
.
কিন্তু শুধু সুনন্দাই নয়, আরও একজন ওই শব্দটা ব্যবহার করে প্রবল কণ্ঠে।
বুঝলেন কাকিমা, এ যুগের সবাই বুদ্ধির বড়াই করে। ভাব দেখায় যেন সব বোঝে। আমি বলব, কিছু বোঝে না।
বিরাট একবোঝা কাগজ হৈমবতীর টেবিলে বসানো, তার দুদিকে দুজন বসে। হৈমবতী আর সারদাপ্রসাদ।
হৈমবতী নাকি তাঁর কোনও এক বান্ধবীর কাছে শুনেছেন পুস্তক প্রকাশনের ব্যবসাটা খুব লাভজনক। টাকায় টাকা আয়। তাই তিনি একটি পাবলিশার হয়ে বসতে চান। এবং প্রথম বই হিসেবে সারদাপ্রসাদের ওই গবেষণা-পুস্তকটি গ্রহণ করতে চান।
ওই কাগজের বোঝা তাই নিয়ে এসেছেন সারদাপ্রসাদ।
সারদাপ্রসাদ উদাত্তকণ্ঠে বলেন, দাদার পরে এই প্রথম আর একজনকে দেখলাম যে-লোক ভারতবর্ষের ঐতিহ্য সম্পর্কে শ্রদ্ধাশীল। অথচ চিরদিনই বউদির মুখ থেকে আপনার সমালোচনাই শুনে এসেছি, আপনি নাকি ফ্যাসানি, আপনি নাকি মেমসাহেব।
বলে ফেলে একথা সারদাপ্রসাদ। আপন উদ্দেশ্য সিদ্ধির আশায় তোয়াজ করতেও নয়, আর বিজয়ার নিন্দে করতেও নয়। অথবা বিজয়ার নামে লাগিয়ে দিয়ে সুয়ো হতেও নয়। বলে নিতান্তই আবেগের বশে।
হৈমবতী নিজেই ওকে ডেকে পাঠিয়েছেন, জানিয়েছেন সেই সেইদিন থেকে তাঁর মাথায় ওই বইটাকে কেন্দ্র করে একটা বিজনেস-চিন্তা ঘুরছে। তাই তিনি প্রেসের মালিক-টালিকদের সঙ্গে কথাবার্তা বয়ে দেখেছেন, এইবার কাগজপত্র কিনে শুরু করবেন। এখন সারদাপ্রসাদ কতটা অ্যাডভান্স চান, সেইটাই হৈমবতীর জিজ্ঞাসা।
সারদাপ্রসাদ প্রথমে চমকে উঠেছিল। রক্তিম মুখে বলেছিল, আপনার কাছে অ্যাডভান্স নেব? বলেন কী?
কিন্তু হৈমবতী বুঝিয়েছেন, বিজনেসের ব্যাপারে সমস্ত কেতাকানুন মেনে শুরু করাই সঙ্গত; নইলে নিজের কাছে গুরুত্ব থাকে না, কেমন যেন এলেবেলে মনে হয়।
সারদাপ্রসাদ এ যুক্তিতে ভিজেছে। সারদাপ্রসাদ অতএব বলেছে, আপনি যা বলেন।
হৈমবতী বলেছেন, আমার তো বাপু এই প্রথম ব্যবসায় নামা। বেশি দিতে পারব না। প্রথমে হাজার তিনেক দিই, তারপর আরম্ভ হলে–
অঙ্কটা সারদাপ্রসাদের কাছে আশাতীত। আর সে কথাটা প্রকাশ করতে কুণ্ঠাও বোধ করেনি সে। কিন্তু হৈমবতী যে সব হিসেব-নিকেশ করে কাজে নামছেন। হৈমবতী তো জানছেন, যে তিনটি খণ্ডে বইটি সম্পূর্ণ, তার এক-একটা খণ্ডই অন্তত ত্রিশ টাকা করে হবে। দ্বিতীয়, তৃতীয় খণ্ডটা অবশ্য এখনও লেখা হয়নি, কিন্তু মালমশলা তো সবই মজুদ, লিখতে আর কতক্ষণ? প্রথম খণ্ড ছাপতে ছাপতেই হয়ে যাবে। তা সে যাক, যে বইয়ের দাম হবে তিরিশ টাকা, তার জন্যে অগ্রিম অন্তত ওই তিন হাজার না দিলে প্রকাশিকার সম্ভ্রম থাকবে কেন?
