পাপ!
সুনন্দা যেন আকাশ থেকে পড়ে। সুনন্দার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে ওঠে। সুনন্দা ব্যঙ্গের গলায় বলে, কোন যুগে আছিস তুই যে, তাই এখনও পাপ পুণ্য, পাপের প্রায়শ্চিত্ত, এইসব পচা পুরনো শব্দগুলো নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছিস? রাবিশ!
কিন্তু এ ব্যঙ্গ কাকে করে সুনন্দা?
সত্যিই কি মীনাক্ষীকে?
মীনাক্ষীর দিক থেকে কোনও উত্তর আসে না। মীনাক্ষী যেন আবার পৃথিবীর দিকে পিঠ ফিরোয়।
সুনন্দা ওর ওই পৃথিবীর দিকে পিঠ ফিরোনো ছবিটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আস্তে বলে,দেখ মীনা, অসতর্কে কাউকে যদি কুকুরে কামড়ায়, সে কি সেই কামড়ের বিষটাকে দূর করবার চেষ্টা না করে তাকে আঁকড়ে বসে বলে,বিষটা থাক! আমার অসাবধানতার প্রায়শ্চিত্ত করব।
মীনাক্ষী তথাপি নীরব।
সুনন্দা একটু অপেক্ষা করে ক্ষুব্ধ হাসি হেসে বলে, এ যুগের সভ্য সমাজকে তেমন করে দেখবার সুযোগ তোর আসেনি মীনা, তাই তুই এখনও তোর সেই প্রপিতামহীর সংস্কারের বালিতে মুখ গুঁজে পড়ে আছিস। এভাবে অসুবিধে-মুক্ত হওয়াটা এখন এত বেশি স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে, ও নিয়ে কেউ মাথা ঘামাচ্ছে, এটা শুনলেই লোকে হাসে।
বিউদি, আমার এসব কথা শুনতে কষ্ট হচ্ছে।
সুনন্দা একটু হেসে আস্তে কৌতুকের গলায় বলে, তার মানে অপরাধীটি নেহাত আততায়ী নয়? তোমার প্রেমপাত্র। তাই তার দেওয়া উপহার
বউদি! আমাকে নিজের ধরনে মরতে দাও।
সুনন্দা যেন একটা বাচ্চার অভিমান দেখছে, তাই সুনন্দা বলে ওঠে,এই তো নিজের ধরনে মরাটা তো হয়েই গেছে। এইবার আমাদের ধরনে বাঁচাবার চেষ্টা করব আমরা।
দোহাই তোমাদের বউদি! আমার জন্যে তোমরা একটু কম ভেবো। আমি নিজেই এত বেশি ভাবছি যে, যথেষ্টর অতিরিক্ত হয়ে যাচ্ছে।
তবু তো বোকার মতো ডিসিশান নিচ্ছিস। আদি-অনন্তকাল ধরে যা চলে আসছে, হয়তো অনন্তকাল ধরেই চলবে, সেই সহজ পথটা ছেড়ে অন্য পথ ধরে চলতে চাইছিস। সেটা চাইলে সমাজে চলে না মীনা! যে প্রপিতামহীর সংস্কারের কথা বলছি, তাঁরও পিতামহী প্রপিতামহীদের আমল থেকেই সমাজের সমস্ত পবিত্রতা আর শুচিতার সংস্কারের অন্তরালে প্রবাহিত হয়ে চলেছে বিপন্মুক্তির অভিযান। পরিবারের সুনাম যাবে, বংশে কলঙ্ক পড়বে–এই ভয়ংকর ভয়ে জলজ্যান্ত মেয়েগুলোকেই রাতারাতি ভ্যানিশ করে দিয়েছে মানুষ–এ ইতিহাসও তো কম নেই? মোট কথা, পাপ পুণ্য ধর্ম বিবেক, ওগুলোর ধার ততক্ষণই ধারে মানুষ, যতক্ষণ অবস্থাটা থাকে বেশ পোেষা জন্তুর মতো শান্ত শিষ্ট বাধ্য। কিন্তু যে মুহূর্তে মানুষ দেখবে অবস্থা অসুবিধের হয়ে উঠেছে, সেই মুহূর্তেই তার পাপ পুণ্য ধর্ম বিবেক, এসবের সংস্কার মুছে যাবে। সেই অসুবিধেটা দূর করতে, করতে পারবে না এমন কাজ নেই। এই হচ্ছে সংস্কারের মূল্য, এই হচ্ছে চিরন্তন মূল্যবোধের মূল্য। পাপ পুণ্য ধর্ম অধর্মের একটা ফাটকাবাজার আছে বুঝলি? স্বার্থ আর সুবিধে এঁরাই হচ্ছেন সে বাজারের মালিক।
মীনাক্ষী ওদিকে পিঠ ফিরিয়ে থেকেই বলে, তোমার এই দামি-দামি কথাগুলো থাক বউদি, আমার ভাল লাগছে না।
সুনন্দা তবু যেন হাসির গলায় বলে, তা হলে বলছিস হেরে ফিরে যাব?
তোমার কোনটা হার কোনটা জিত জানি না বউদি, শুধু জানি আমিই বড় বেশি হেরে গেছি।
সুনন্দা তবু অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে, সুনন্দা তবু বোঝাতে চেষ্টা করে এ যুগ এই তুচ্ছ ব্যাপারটাকে নিয়ে চিন্তা করে না, এটাকে নিতান্তই অ্যাকসিডেন্ট বলে মনে করে। তারপর ফিরে যায়।
যাবার সময় শুধু আবারও বলে, বুঝলাম লোকটা তোর প্রেমাস্পদ, তাই পাপ প্রায়শ্চিত্ত এইসব শব্দগুলো বেছে নিয়ে মনকে চোখ ঠারছিস। কিন্তু তোর এই প্রায়শ্চিত্ত পদ্ধতিটা কোন মাটিতে বসে চালাবি তাই ভাবছি। যুগ যতই উদার আর প্রগতিশীল হোক, তুমি যে একটা গোত্র-পরিচয়হীন প্রাণীকে স্নেহের ছায়ায় আশ্রয় দিয়ে মানুষ করতে বসবে, সেটি চলবে না। কর্ণকে চিরদিনই কুন্তীর ক্রোড়চ্যুত হতেই হয়। হাজার হাজার বছরের পৃথিবীতে সমাজের কত পরিবর্তনই হল, কিন্তু কর্ণকুন্তী সংবাদটা অপরিবর্তিতই রয়ে গেল।
.
সুনন্দা হেরে ফিরে গেল।
কিন্তু বিজয়া কি হার মানবেন?
বিজয়া নিজের খুব শক্ত অসুখ বলে বড় মেয়েকে তারকরান। বিজয়ার এক ভক্ত গুরুভাইকে এই তারবার্তা প্রেরণের ভার দেন বিজয়া।
.
নীলাক্ষ বড় মুশকিলে পড়ে গেছে।
নীলাক্ষ বাইরের জগতে ঘুরছে যেন হালভাঙা নৌকোর মতো, হাতিয়ারহীন সৈনিকের মতো। অথচ কিছুতেই যেন সুনন্দাকে বশে আনতে পারছেনা। সুনন্দা প্রায় রোজই বলে-মাথা ধরেছে, বলে, জ্বর আসছে–বলে, মুড নেই।
আশ্চর্য!
এই যে মেহেরা সাহেব গাড়ি পাঠাতে চাইছে এবং সেইসঙ্গে এ ইশারাও জানাচ্ছে বেশি চালাকি চালালে নীলাক্ষ নামক মিথ্যে বাঘটাকে পুনর্মুষিক করে দেবে, এটা কি কম যন্ত্রণার?
তুই তুচ্ছ একটা মেয়েমানুষ, একটু উপকারে লাগিস বলেই না তোকে এত তোয়াজ করা, নইলে তোর কাছে হেঁট হতে আসি আমি? সেই সুযোগটুকু পেয়ে তুই আমাকে দেখাতে আসিস মুড?
অনবরত মনে মনে এই কথাগুলোই মনের মধ্যে ফুঁসতে থাকে নীলাক্ষর, কী দাম তোর? কী ছিলি আগে? সেই তো এক হাঁড়িঠেলা মা আর বাজারবওয়া বাপের বেটি। চেহারা তো ছিল তেল-জবজবে গাঁইয়া একটা মেয়ের মতো। সাতচড়ে রা বেরোতো না।কে তোকে এতখানি করে তুলল? ঘসে মেজে পিটিয়ে বুঝিয়ে, কে তোকে বাইরের পৃথিবীর যোগ্য করে তুলল? কে তোকে ওইসব লাখপতি কোটিপতিদের চোখের সামনে নিয়ে গিয়ে তুলে ধরল? এই আমি নয়? এখন আমায় তুই মুড দেখাতে আসিস? কারণ আমি তোকে মাথায় তুলেছি বলে, কেমন? সেই যে সেদিন? মেহেরা সাহেবটার সঙ্গে বলতে গেলে কেলেঙ্কারির তো কিছু বাকি ছিল না, তবু কিছু বলেছি আমি? দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করিনি? করেছিলাম কেন, না তুই আমার সাহায্যকারিণী সহধর্মিণী এই বিশ্বাসে। আর তোর বুদ্ধির উপর আস্থার বশে। বিশ্বাস রেখেছিলাম, আর একটু প্রশ্রয় দিয়ে তুই ওই মাতালটাকে কাত করে, তারপর সম্মানহানির ছুতো করে একটা মোটা খেসারত বাগাবি৷ তা নয়, তুই খালি হাতে ফিরে এসে স্বামীকে নস্যাৎ করতে কাটা কাটা বুলি ছাড়লি! একবার একটু এদিক ওদিকে সব সতীত্ব ধ্বংস হয়ে গেল তোমার!! ওটাও একটা শো বাবা, জানতে আর বাকি নেই। হয়তো কোনওদিন আমাকেই হুট আউট করে দিবি।
