.
এ ঘরে সুনন্দা দৈবাৎই আসে।
বলতে গেলে আসেই না।
আজ এল।
এসে মীনাক্ষীর পড়ার চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসে পড়ে সহজ আন্তরিক গলায় বলল,কী রে মীনা, তুই নাকি পড়া ছেড়ে দিবি বলেছিস?
মীনাক্ষী এ আক্রমণে ভুরুটা একটু কোঁচকাল। বুঝতে পারল না, এটা আবার কী!
স্ব-ইচ্ছেয় এসেছে, না কারও প্রেরিত দূত হয়ে? কার হবে? ছোড়দাটাও তো চলে গেছে। মার প্রেরিত নিশ্চয়ই নয়। তবে কি বাবার? মীনাক্ষী নিজের মৃত্যুকে ডাকতে লাগল। আকস্মিক মৃত্যু।
সুনন্দা আবার বলল, মা বলছিলেন, তুই নাকি আর কলেজ-টলেজ যাস না, বই স না। অথচ জ্বরটর সব বাজে কথা।
সুনন্দার গলায় কোন বহু যুগের আগের ঘরোয়া সুর।
সুনন্দা কতকাল এ সুরে কথা বলেনি। মীনাক্ষীর কী হল কে জানে, সুনন্দার নিজের কানটাই যেন অনাস্বাদিত একটা স্নিগ্ধস্বাদে ভরে গেল। যেন এখনও এই সহজ ঘরোয়া কথা বলার শক্তিটা তার আছে। দেখে নিজেই অবাক হয়ে গেছে সুনন্দা। কাটা-ছাঁটা গলায় মাপামাপা কথা বলতে বলতে সুনন্দা যেন যান্ত্রিক হয়ে গিয়েছিল, সুনন্দা তাই এই আকস্মিক আবিষ্কার হয়ে যাওয়া শক্তিটার স্বাদ আর-এক গণ্ডুষ পান করতে চাইল।
সুনন্দা বলল, হল কি তোর? সারা বছর ফাঁকি দিয়ে, এখন বুঝি পরীক্ষার সময় ভয় ধরেছে?
ভয়। পরীক্ষার!
মীনাক্ষী হঠাৎ উঠে বসল।
মীনাক্ষীও বুঝি সুনন্দার এই নতুন রূপে অথবা পুরনোকালের রূপে বিচলিত হল। তাই মীনাক্ষী কথা বলল।
উদাস বিষণ্ণ গলায় বলল, আমি আর তোমাদের সেই মীনাক্ষী নেই বউদি।
সুনন্দা নির্লজ্জ বেশ করে পার্টিতে গিয়ে মদ খায়, সুনন্দা মেহেরা সাহেবের গায়ে ঢলে পড়ে হি-হি করে হেসে তার স্বামীর কর্মোন্নতির সহায়তা করে, সুনন্দা সর্বপ্রকার ভাবপ্রবণতাকে ব্যঙ্গ হাসি দিয়ে বিদীর্ণ করে, তবু মীনাক্ষীর ওই বিষণ্ণ মুখটার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ মায়ায় মন ভরে গেল তার। সুনন্দার মনে হল, হয়তো বা বিজয়ার সন্দেহটাই সত্যি।
কিন্তু সুনন্দা সেই জটিল সন্দেহটা নিয়ে কোনও প্রশ্ন করল না, হেসে উঠে বলল, নেই? তুই আর সে মীনাক্ষী নেই? কন্ধকাটা শাঁখচুন্নি হয়ে গেছিস?কই বুঝতে পারছি না তো? ঠিক তো আগের মতোই দুই হাত দুই পা দুই চোখ দুই কান ও একটি মাথাসমেত আস্ত একটা মানুষকেই দেখছি।
মীনাক্ষী অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বলল, বাইরে থেকে যা দেখা যায় সেটাই তো সব নয়।
সুনন্দা এক মুহূর্ত কী ভাবল, তারপর কৌতুকের গলায় বলে উঠল, সর্বনাশ! এ মেয়েটা কী বলে গো! ভিতরের অদৃশ্য কোটরে কিছু ঘটনা ঘটাচ্ছিস নাকি রে বাবা!
মীনাক্ষী চমকে ওঠে।
মীনাক্ষীর মনটা হঠাৎ বিমুখ হয়ে ওঠে।
ওঃ তাই!
বিদ্রূপ করতে আসা হয়েছে।
ওই মমতার কণ্ঠটুকু তা হলে ছল!
মীনাক্ষীর সেই বিষণ্ণ-বিধুর স্বরটুকুতে রূঢ়তার ছাপ পড়ে। মীনাক্ষী ঈষৎ সোজা হয়ে বসে বলে,ও, অনুসন্ধানে এসেছ?
সুনন্দা গম্ভীর হয়।
বলে, তোর অবশ্য সেটাই মনে হওয়া স্বাভাবিক। আমার প্রতি এর চাইতে উচ্চ ধারণা আর কীই বা হবে! কিন্তু এ ধারণা বদলালেও পারতিস! যদিও মার নির্দেশেই এসেছি আমি, তোকে সদুপদেশ দিয়ে প্রতিকারে প্ররোচিত করবার হুকুম নিয়ে। তবু থাক।সুনন্দা মুখ ফিরিয়ে বলে, ভেবে এক এক সময় হাসি পায় মীনা, অথচ একদা বাংলাদেশের লক্ষ্মী বউয়ের আদর্শটাই আমার আদর্শ ছিল।
মীনাক্ষী একটু চুপ করে থেকে বলে, হয়তো আদর্শ নামের লোকটা একদম ক্ষমতাহীন, ঘটনাচক্রই সমস্ত কিছুর নিয়ামক।
তা বটে! ঘটনাচক্রের কোপে পড়ে আমি তো একদিন তোদের মৈত্র পদবি ছেড়ে মিসেস মেহেরা হতে বসেছিলাম। শেষে আবার ওই ঘটনাচক্রই রক্ষে করল। একটা মদে চুরচুরে লোকের প্রেম নিবেদনের উপর আস্থা রাখা সমীচীন মনে হল না। এর জন্যে তোমার দাদা খুব ক্ষুব্ধ হলেন। ভেবেছিলেন ওই পদবি বদলের বদলে একটা বিরাট অঙ্কের চেক বাগাতে পারবেন। তা সে আশায় ছাই পড়ল। হতভাগাটাকে ঘুম পাড়িয়ে রেখে এসে আবার তোমার দাদার স্কন্ধে ভর করলাম।
বউদি।
মীনাক্ষীর এই কদিনের নীরব হয়ে থাকা কণ্ঠে একটা তীব্র সুর ঝলসে ওঠে,দাদার মূর্তিটাকে এতটা নারকীয় করে বলবার দরকার ছিল না। তোমাকে তো কেউ কিছু বলতে যায়নি।
মীনাক্ষী ভেবেছিল, এ অপমানে সুনন্দা ঠিকরে উঠে বেরিয়ে যাবে। কিন্তু তা গেল না সুনন্দা। ও সেই একই ভাবে চেয়ারের পিঠটায় দোলা দিতে দিতে বলে, তোকেও তো কেউ কিছু বলতে আসেনি। তবু তুই মৃত্যুশয্যার পণ নিয়ে পড়ে আছিস কেন? বিবেক না কী যেন সেই আছে না একটা? সেটাই হুকুম করে। সে যাক, মায়ের হুকুম হয়েছে তোমার যদি কোনও দুর্ঘটনা ঘটে থাকে তো, প্রতিকার অফিসে নিয়ে যেতে।
বউদি!
মীনাক্ষী তীব্র গলায় বলে ওঠে, মা বলেছেন এই কথা?
বললেন তো
কেমন একটা ঘৃণায় আর ধিক্কারে মীনাক্ষীর ঠোঁটটা যেন বেঁকে যায়। মীনাক্ষী তীব্রতর গলায় বলে, মা না রাতদিন ঠাকুর পুজো করেন? মা না মশা ছারপোকা পিঁপড়ে মারাকেও জীবহত্যা বলে ধরেন?
সুনন্দা হঠাৎ হেসে ওঠে।
সুনন্দা বলে, মানুষ নামের জীবটা এমনি সব উলটোপালটা জিনিস দিয়েই তৈরি রে মীনা! ওইজন্যেই বোধহয় বলে পঞ্চভূতের দেহ। কিন্তু এ ছাড়া আর উপায়ই বা কী বল?
মীনাক্ষী আবার শুয়ে পড়ে।
মীনাক্ষী দেয়ালমুখো হয়।
মীনাক্ষী যেন ধূসরকণ্ঠে বলে,পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়। সেটা আরও একটা পাপ দিয়ে হয় না।
