ঝড়টা অবশেষে হাল ছেড়ে দিয়ে অন্য একটা ঘরে গিয়ে আছড়ে পড়ে। যে ঘরটা নাকি তার চিরশত্রুর ঘর।
মান-অপমানের মাথা খেয়ে তোমার কাছেই এসে পড়তে হল বউমা! তবে এও বলে রাখছি বাছা, এ কলঙ্ক শুধু একা আমারই নয়, তোমাদেরও। তোমার এই শ্বশুরকুলের কলঙ্কের কথা যদি রাষ্ট্র হয়, তো চুনকালি তোমাদের মুখেও পড়বে। আমি তো লক্ষ্মীছাড়া মেয়েকে জিজ্ঞেস করে করে হার মেনে গেছি, একটা বাক্যি বার করতে পারিনি মুখ থেকে। তুমি একবার চেষ্টা করে দেখো দিকি। আমার ভাগ্যিক্রমে আজকাল যখন বাড়িতে থাকচ্ছ।
সুনন্দা শুনল৷ সুনন্দাও প্রায় পাথরের পুতুলের মতোই ভাবশূন্য মুখে তার শাশুড়ির উত্তেজনা রক্তিম মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
ওটাই এখন ওর প্রকৃতি।
যেন কিছু বুঝতে পারছি না।
তুমি সব বিশদ বোঝাবে, তবে আমি বুঝব।
অথচ সুনন্দা সবই টের পাচ্ছে।
কারণ সুনন্দা আজকাল প্রায়ই বাড়িতে থাকছে। আর মেয়েমানুষের প্রখর দৃষ্টিতে ঘটনার স্পষ্ট চেহারাটা ধরা পড়তে দেরি হচ্ছে না।
তবু সুনন্দা অবোধ সাজল।
তাকিয়ে রইল ভাবশূন্য চোখে।
দেখে অবশ্য হাড় জ্বলে গেল বিজয়ার, তবু বিজয়া মনের রাগ মনে চেপে আবার বললেন, লক্ষ্মীছাড়িকে বোঝাও গে একটু, এভাবে পড়ে থাকলে লোকলজ্জা বাড়বে বই কমবে না। আর এও জিজ্ঞেস করো গে একটা কিছু ঘটিয়ে বসেছে কিনা। ভগবান, এমন কপালও করে এসেছিলাম!
কপালের দুঃখ গাইতে পারেন বিজয়া, কারণ এই ভয়াবহ সংকটের সময় কিনা বড় মেয়ে কাছে নেই। সে গেছে বম্বে বেড়াতে। অজন্তা ইলোরা দেখে তবে ফিরবে।
মেয়ে থাকলে কি তিনি বউয়ের শরণাপন্ন হতেন? তা ছাড়া এখন যে আবার ঢঙিনী ঢং করে বাড়িতেই থাকছেন বেশি বেশি। বেশিরভাগ দিনই নীলু একা বেরিয়ে যাচ্ছে। কী কারণ কে জানে! বিজয়াকে পাহারা দিচ্ছে নাকি?
হ্যাঁ, এ কথাও ভাবতে দ্বিধা করেন না বিজয়া, হয়তো বিজয়ার উপর চোখ রাখতেই সুনন্দা বাড়ি বসে থাকছে। হয়তো দেখছে বিজয়া কী করেন।
যাক এখন একটি মোক্ষম চাল দেওয়া গেল, ভাবলেন বিজয়া, এ বাড়ির কলঙ্ককালিমা যে ওদের গালেও উঠবে সেটা বুঝিয়ে ছেড়েছি। এ কাহিনী আর বাপের বাড়ি গল্প করতে যাবে না। তা ছাড়া এ আস্থা আছে বউয়ের উপর, নিষেধ করলে বলবে না কাউকে। সে বরং নিজের বড় মেয়ের সম্পর্কে বিশ্বাস কম। তার পেটে কথা থাকে না।
বিজয়া তাই ভাবলেন, মান সম্মান খুইয়ে বউয়ের শরণ নিয়ে এখন উদ্ধার তো হই। তবু নিজ কপালকে ভর্ৎসনা করলেন।
বউ কিন্তু সেই দুঃখে সমবেদনা দেখাল না, শুধু অবাক গলায় বলল, আপনি যে কী সম্পর্কে কথা বলছেন, কিছুই তো বুঝতে পারলাম না।
বিজয়া একটু থতমত খেলেন, তারপরই এই হাড়ে বজ্জাত বউয়ের ন্যাকামিতে নিজের হাড়টাই জ্বলে গেল তাঁর। তবু সামলে বললেন, কী সম্পর্কে সেটা কি আর তোমার মতো বুদ্ধিমতাঁকে খুলে বলতে হবে বউমা? দেখছ তো ছোট ননদটাকে? আর ওর কী হয়েছে, তাও অবশ্যই অনুমান করতে পারছ?
অনুমান? আমি?
সুনন্দা আকাশ থেকে পড়ে।
আমি কী অনুমান করব? আমি কি ডাক্তার? স্লো ফিভার–মানে ঘুসঘুসে জ্বর কত কারণেই হয়।
জ্বর? জ্বরটা সত্যি ওর গায়ে নাকি বউমা? বিজয়া তীব্র চাপাগলায় বলেন,ও তো মনের জ্বর। সেই জ্বরে জর্জর হচ্ছে। সেই একদিন কোন চুলোয় রাত কাটিয়ে এসে কী সর্বনাশ যে ঘটাল কে জানে!
সুনন্দা অমায়িক গলায় বলে, পাড়াগাঁয়ে রাত কাটালে মশা থেকে ম্যালেরিয়া হতে পারে, জল থেকে বিকোলাই হতে পারে, ব্যাঙ থেকে—
থামো বউমা, তুমি আর ন্যাকামি কোরো না। বিজয়া ক্রুদ্ধ গলায় বলেন, মেয়েমানুষ হয়ে মেয়েমানুষের কী জ্বালা জানো না? তদবধি ও কেন ঘরের কোণে মুখ গুঁজে পড়ে আছে তা জানো?
শরীর খারাপ হলে তো থাকবেই।
তা সেই খারাপটাই কোন জাতের সেটাই দেখো। দেখে তার প্রতিকার করো। মশা ছারপোকা সাপ ব্যাঙ ছাড়াও শত্রু আছে মেয়েমানুষের। সেই শত্রুর নিপাত চেষ্টা করতে হবে।
এবার সুনন্দা ঘৃণা আর রাগের সংমিশ্রণে গঠিত একটা ভাব নিয়ে বলে, এসব কী বলছেন আপনি! মীনাক্ষী না আপনার নিজের মেয়ে?
বিজয়া ধিক্কারে বিচলিত হন না। বলেন, নিজের মেয়ে বলেই তো এত জ্বালা বউমা! পাড়ার মেয়ে হলে কি আর এইভাবে মরমে মরতাম? এখন দেখো গে যাও বাছা। তোমার উপর সব দায় ফেলে দিলাম! যা প্রতিকার করবার করো।
বললেন, অনায়াসেই বললেন এই মান-খোওয়ানো কথা।
কিন্তু সুনন্দা সেই ধুলোয়-পড়া সম্মানের দিকে না তাকিয়ে স্থির গলায় বলে, আপনি কিছু নিশ্চিত হয়েছেন?
তা নিশ্চিত ছাড়া আর কী? বিজয়া কপালে করাঘাত করেন, কী হাল হয়েছে মেয়েটার, তাকিয়ে দেখলে বুঝতে! লেখাপড়ায় এত মন ছিল, সে জিনিস ভাসিয়ে দিল। বই ছুঁচ্ছে না, কলেজ যাচ্ছে না।
বিজয়া হঠাৎ আঁচলে চোখ মোছেন।
সুনন্দা নির্নিমেষে একবার সেদিকে তাকিয়ে দেখে আরও স্থির ধাতব গলায় বলে, আপনি কী ধরনের প্রতিকারের কথা বলছেন?
বিজয়ার গায়ে বিষ ছড়ায়।
বিজয়ার গায়ে আগুন ছড়ায়।
তবু বিজয়া মেজাজ শান্ত রেখে ক্ষুব্ধ ব্যঙ্গের হাসি হেসে বলেন, সেকথা কি আমি তোমাকে শেখাতে যাব বউমা? তোমাদের একালে কত ব্যবস্থা হয়েছে, তোমরা আধুনিক মেয়েরা সেসবের কত জানো শোনো। প্রাণটা যাতে না যায়, সেভাবে
কথার মাঝখানে কথা বলে ওঠে সুনন্দা। হেসে উঠে বলে,আমাদের একাল তা হলে আপনাদেরও কিছু কিছু সুবিধে করে দিচ্ছে? আচ্ছা ঠিক আছে, দেখি কী করতে পারি।
