সুনন্দা বলত, বাবা, এই বইটার এখানটা ঠিক বুঝতে পারছি না, বলুন তো লেখক এখানে কী বলতে চেয়েছেন?
মীনাক্ষী বলত, উঃ কী করে যে বউদি অত মোটা মোটা বইগুলো এক-একদিনে শেষ করে!
কমলাক্ষ তখন তো বাড়িতেই।
কমলাক্ষ চাপা গলায় বলত, মানুষ যে কেন পড়ার বইয়ের বোঝা টানার পরও আবার বই পড়তে বসে, এ আমার বুদ্ধির বাইরে। রেখে দাও বউদি, বই রেখে দাও, নইলে এ বাড়ির কর্তার হাওয়া গায়ে লাগবে। তার চেয়ে একহাত ক্যারাম হয়ে যাক।
নীলাক্ষ বলত, দ্যাখ কমল, লেখাপড়া শিখে ঢিকিয়ে টিকিয়ে চাকরি করে কিছু হয় না। যদি বড়লোক হতে চাস তো ব্যবসা করতে হবে। বিজনেস জিনিসটা কী, সেটাই শিখতে চেষ্টা কর এখন থেকে।
ময়ূরাক্ষীও তখন বাড়িতে।
ময়ূরাক্ষী তখন কুমারী।
ময়ূরাক্ষী বলত, থামো তুমি দাদা! বাঙালির মাথায় ওসব হয় না। যারা লোটা কম্বল সম্বল করে দুপয়সার ছোলাভাজা খেয়ে দিন কাটিয়ে দিতে পারে, তারাই পারে ওসব। বাঙালির রুচি আলাদা।
আর হঠাৎ সেই আসরে পাগলা সারদাপ্রসাদ এসে পড়ে বলে উঠত, তোরা এইসব বাজে কাজে মত্ত হয়ে সময় নষ্ট করছিস, অথচ আমার সেই নতুন চ্যাপ্টারটা শুনতে বলছি, সময়ই হচ্ছে না তোদের! অথচ শুনলে বুঝতিসকী ইন্টারেস্টিং! রাবণ স্বর্গের সিঁড়ি গাঁথছিল, গাঁথতে গাঁথতে অসমাপ্ত রেখে মরে গেল। আসলে ব্যাপারটা কী? রাবণ দূরপাল্লার রকেটের পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছিল। আরও কিছুদিন সে পরীক্ষা চালিয়ে যেতে পারলে কাজটায় সফল হতে পারত, চাঁদে মঙ্গলে শুক্রে যেতে পারত। কিন্তু তার আগেই রাবণব্যাটা একটা পাপযুদ্ধে নেমে ধ্বংস হল। যেমন এখন ভিয়েতনামের যুদ্ধ শুরু হয়েছে। কিন্তু কে বলতে পারে রাবণের সেই ফরমুলাটাই কোনওরকমে এ যুগে কারও হস্তগত হয়েছে কিনা। সেকালে লোকে মন্ত্রগুপ্তি করতে ওইসব ফরমুলা তামার সিন্দুকে পুরে জলে ভাসিয়ে দিত।তা সেই রাবণের ফরমুলাই পাক, কিংবা নিজেরাই আবিষ্কার করুক, এ যুগ কিছু নতুন করছে না, সেটাই তোমাদের শোনাতাম।
.
কিন্তু সারদাপ্রসাদের কথা কেউই শুনতে চাইত না। পাশ কাটাত। কিন্তু তাকে অপমান করে নয়, কৌশল করে।
তারপর ওর আড়ালে হাসাহাসি করত।
সেই পারিবারিক আসরে অনুপস্থিত থাকতেন শুধু বিজয়া। বিজয়া তাঁর ঠাকুরঘরের দুর্গে বসে থাকতেন।
কিন্তু আজকাল বিজয়া আর অষ্টপ্রহর সেই দুর্গে বসে থাকতে পাচ্ছেন না।
বিজয়া যেন ছটফটিয়ে নেমে আসছেন।
বিজয়ার গলা যখন-তখনই দোতলায় একতলায় শোনা যাচ্ছে।
বিজয়ার কি হঠাৎ খেয়াল হয়েছে বাড়ির গিন্নি নিজেকে সংসার থেকে ভাসিয়ে রাখলে সংসারটা ভেসে যায়?
বিজয়ার কথা বিজয়াই জানেন, তবে সরোজাক্ষ মাঝে মাঝে বিস্মিত হন। সরোজাক্ষ জীবনে যা না করেছেন, তাই করেন এক এক সময়। বিজয়া কী বলছেন শুনতে চেষ্টা করেন।
বিজয়ার উচ্চ চিৎকার থেকেই সরোজাক্ষ একদিন টের পান, সারদাপ্রসাদ চাকরি খুঁজে বেড়াচ্ছেন।
অথবা বেড়াচ্ছেন না, ছল করে রাস্তায় ঘুরছেন।
সরোজাক্ষ স্তব্ধ হয়ে যান।
সরোজাক্ষ নিজের কর্তব্য নির্ণয় করতে বসেন।
কিন্তু একদিন বিজয়ার আশঙ্কা সত্য হয়।
সুনন্দা তার ননদের দিকে তাকায়।
সুনন্দা একদিন তার ঘরে ঢুকে পড়ে বলে, তোর কী হয়েছে বল তো মীনা?
জানলা দিয়ে পড়ন্ত বিকেলের রোদ এসে ঘরের দেয়ালে পড়েছিল, মীনাক্ষী তাড়াতাড়ি বিছানা থেকে উঠে জানলাটা বন্ধ করে দিল।
ওই পড়ন্ত বেলার ঝিকিমিকি আলোকে বড় ভয় মীনাক্ষীর। ওটা যেন একটা সর্বগ্রাসী কালো দৈত্যের সোনালি মুখোশ। মুহূর্তে ছিঁড়ে যাবে মুখোশটা, মুহূর্তে সেই কালো দৈত্যটা তার লোমশ থাবাটা বাড়িয়ে মীনাক্ষীকে চেপে ধরবে, সেই থাবার মধ্যে নিষ্পিষ্ট হয়ে যাবে মীনাক্ষী, মুছে যাবে মীনাক্ষী নামের মেয়েটা।
.
কিন্তু মীনাক্ষী নামের সেই মেয়েটা কি আছে এখনও? সেই ভীরু অথচ বিদ্রোহী, মৃদু অথচ সতেজ, এমনি উলটোপালটা উপাদানে গঠিত সেই মেয়েটা?
নিজে তো সে ভাবছে, সে শেষ হয়ে গেছে, মুছে গেছে, মরে গেছে। তাই পৃথিবীর দিকে পিঠ ফিরিয়ে চুপ করে বিছানায় পড়ে আছে সে।
এই পৃথিবীর দিকের একটি দরজা মাঝে মাঝে ঝড়ের ধাক্কায় খুলে যায়, আর সে ঝড় আছড়ে আছড়ে পড়ে মীনাক্ষীর উপর। রাতদিন শুয়ে থেকে থেকে আর কত মুখ পোড়াবে? বাড়ির লোক তো কানা নয়, তারা ভাবছে কী? জ্বর বলে শুয়ে থাকলেই তো আর লোকের সন্দেহের হাত এড়ানো যায় না? বলবে না তারা, এতদিন ধরে জ্বর যদি তো ডাক্তার আসে না কেন?
কিন্তু মীনাক্ষী সেই ঝড়ের মুখে বোবা কালা পাথর। মীনাক্ষী দেয়ালের দিকে মুখ করে শুয়ে থাকে।
কখনও কখনও সেই ঝড় আবার কাছে এসে ফিসফিস গলায় কথা কয়, মীনাক্ষীর গালে কপালে উত্তপ্ত নিশ্বাসের তাপ এসে লাগে। কেলেঙ্কারি তো করেই এসেছ বুঝতে পারছি, এখন চূড়ান্ত বিপদ কিছু ঘটেছে কিনা তাই বলো। তা হলে শতজন্মের নরক ভোগ স্বীকার করে নিয়েও তার ব্যবস্থা করতে হবে।
পাথরের কি অনুভূতি থাকে?
পাথরও কি ভয়ে বিস্ময়ে ঘৃণায় শিউরে উঠতে পারে?
বোঝা যায় না।
বোঝা গেলে হয়তো একটা তীব্র চিৎকার দেয়ালে দেয়ালে ধাক্কা খেত। ছি ছি! ছি ছি!
বলে উঠত–এই আমার পুণ্যবতী আর ধর্মশীলা মা।
আর্তনাদটা ওঠে না।
বোবা দেয়ালের দিকে মুখ করে পড়ে থাকে একটা বোবা পাথরের পুতুল।
