কমলাক্ষ মায়ের কাছে এসে বলে, ব্যাপারটা কী বলল তো মাদার? কর্তা আর রাস্তায় বেরোন না কেন? অসুখ তো কিছু দেখি না।
বিজয়ার মাথার মধ্যে এখন সর্বদাই আগুন জ্বলছে। বিজয়া তাঁর ছোট মেয়েকে উঠতে বসতে ভস্ম করছেন আর নিজের মৃত্যুকামনা করছেন।
তাই বিজয়া তাঁর অনেকদিন পরে বাড়ি আসা ছোট ছেলেটাকেও রেয়াত করে কথা বলেন না। কড়া গলায় উত্তর দেন, কেন বেরোন না তা আমায় জিজ্ঞেস করতে এসেছিস কেন? আমায় রাতদিন তার সঙ্গে গলাগলি করতে দেখছিস বুঝি? যা না, নিজে জিজ্ঞেস করছে না।
আমি? বাপস!
কমলাক্ষ ভয়ের ভান করে।
কেন, বাপস কেন? বিজয়া তিক্ত গলায় বলেন, নিজের বাপ বই পাড়ার লোক নয়, পাগল-ছাগল হয়ে যাচ্ছে কিনা তোরা দেখবি না তো দেখবে কে?
আমার দরকার নেই বাবা!
কমলাক্ষ বলে, আমি শিগগিরই চলে যাচ্ছি বাবা! বাড়ির যা অবস্থা দেখছি।বাড়ির কর্তাটি তোমার ভাষায় পাগল-ছাগল হয়ে যাচ্ছে, বাড়ির গিন্নি সর্বদাই সিংহবাহিনী, বাড়ির বড় ছেলে গোল্লার দোরে গিয়ে বসে আছেন, বাড়ির বড় মেয়ে একবার করে এসে ছটা বিকীর্ণ করে চলে যাচ্ছেন, বাড়ির ছোট মেয়ে মিছিমিছিজ্বর বলে রাতদিন শুয়ে আছেন, আর বাড়ির যে একটা মজার মানুষ ছিল, সে রাস্তায় চাকরি দেবে গো? চাকরি দেবে গো করে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
বিজয়ার মাথায় আগুন জ্বলছে, তবু বিজয়া থমকে ভুরু কোঁচকান। বিজয়া বলেন, চাকরি চাকরি করছে কে?
কেন, শ্রীযুক্ত পিসেমশাই!কমলাক্ষ হো হো করে হেসে ওঠে, বাবা চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন, তাই উনি সংসারের ভার নেবেন। সোজাসুজি বাবার চেয়ারটায় গিয়ে বসলেই পারেন।
বিজয়া ক্রুদ্ধ গলায় বলেন, চাকরি খুঁজছে? সংসারের জন্যে? তাই বুঝিয়েছে বুঝি তোকে? ওই একখানা লোক! কী ঘুঘু, কী ঘুঘু! তোদের সবাইকে ও এক হাটে বেচে অন্য হাটে কিনতে পারে। রাতদিন ঘুরে বেড়াচ্ছে ও কেন জানিস? ওর সেই মস্ত দামি মহাভারতখানি ছাপাবার তালে। সেই বই ছাপলেই নাকি পৃথিবী জুড়ে ধন্যি ধন্যি পড়ে যাবে। সব বদমাইশি। ওই ছল করে সারাজীবন শালার ঘাড় ভেঙে রাজার হালে কাটিয়ে এল, এখন দেখছে সেখানে মৌচাকের মধু শুকিয়ে এসেছে, তাই নিজের নেশার খরচটার জন্যে হন্যে হয়ে বেড়াচ্ছে।
নেশা? আরে দূর! কমলাক্ষ বলে ওঠে,ও অপবাদটি অন্তত ও ভদ্রলোককে দিও না।
বলেই হঠাৎ চুপ করে যায়।
কমলাক্ষর মনে হয় জগতের কাউকেই বিশ্বাস করা যায় না।
বিজয়া ছেলের এই ভাবান্তর দেখেন এবং তার কারণটাও অনুমান করতে পারেন।
তাই বিজয়া চাপা রোষের গলায় বলেন, সংসারসুদ্ধ সকলেরই তো ব্যাখ্যা করলি, বলি, বাড়ির বউয়ের কথাটা বুঝি বলতে সাহস হল না?
কমলাক্ষ একটু চুপ করে থাকে।
তারপর অস্তে বলে, সাহস হল না নয় মা, রুচি হল না।
আস্তেই বলে।
কারণ সুনন্দা এখন বাড়ি আছে।
কেন কে জানে সুনন্দা এখন প্রায়ই বাড়ি থাকছে।
সুনন্দা বাপের বাড়ি যাওয়া বন্ধ করেছে।
সুনন্দা সন্ধ্যাবেলায় সেজেগুজে নীলাক্ষর সঙ্গে বেরোচ্ছে না।
কিন্তু কেন?
বিজয়া মনে-মনেই প্রশ্ন করেন, কেন? হঠাৎ এ পরিবর্তন কেন?
চোরের মন ভাঙা বেড়ায়, তাই বিজয়া নিজের ভাঙা বেড়াটার দিকেই তাকান। বিজয়ার নিশ্চিত বিশ্বাস হয়, সুনন্দা মীনাক্ষীকে সন্দেহ করছে। সুনন্দা মীনাক্ষীকে লক্ষ করবার জন্যেই বাড়িতে থাকছে।
সন্দেহ করতেই পারে।
মেয়েমানুষের চোখ! ফাঁকি দেওয়া সহজ নয়। মীনাক্ষীর যে কোনও অসুখ করেনি, মীনাক্ষী যে শুধু মরমে মরে পড়ে আছে, একথা সুনন্দা বুঝতে পেরেছে।
বিজয়া ভাবেন, আমি কি একদিন ওই পাজি বউটার সঙ্গে কোনও উপলক্ষে ঝগড়া বাধিয়ে ওকে বাড়িছাড়া করব?
তা হলে হয়তো মীনাক্ষীর ব্যাপারটা লোক জানাজানি হয়ে যাবে না। তা হলে হয়তো মীনাক্ষী আস্তে আস্তে সামলে ওঠবার সময় পাবে। তারপরেই ধরে বেঁধে একটা বিয়ে দিয়ে দেবেন তার।
হয়তো সুনন্দার পরিবর্তনের মূলে অন্য কিছু।
হয়তো সুনন্দা তার ননদের দিকে তাকায়ওনি, তবু বিজয়া ওই কথাই ভাবছেন।
কিন্তু একদিন সত্যিই সুনন্দা তাকিয়ে দেখল।
সুনন্দা লক্ষ করল মীনাক্ষীর জন্যে কোনও ডাক্তার আসে না, মীনাক্ষী উঠে গিয়ে ভাতটাতও খায়, অথচ মীনাক্ষী কলেজ যায় না, রাতদিন ঘরের মধ্যে পড়ে থাকে।
সুনন্দা ভাবে, তবে কি মীনাক্ষী কোনও পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি? তাই লজ্জায় এরকম করছে?
হয়েছে ভাল।
বাবা বাড়ি থেকে বেরোনো ছেড়েছেন, বাবার মেয়েও তাই করছে। আর বাবার পুত্রবধূও সুনন্দা মনে মনে যেন নিজের জন্যেই ব্যঙ্গ হাসি হাসে, বাবার পুত্রবধূও বাইরের পৃথিবী থেকে ডানা গুটিয়ে নিয়ে এসে ঘরে বসতে চাইছে। এবার কি তবে ব্রতকথার গল্পের মতো অতঃপর সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে ঘরকন্না করবে?
না কি এ শুধু কোনও একটা ঝড়ের আগের গুমোট?
সুনন্দাও নিজের ঘরেই থাকতে ভালবাসে।
যেন এটা একটা হোটেল।
একই রান্নাঘরে রান্না হয় এদের, কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন পরিবারের লোক, ঘরে ঘরে বাস করে।
একদা যে এরা একই পরিবারভুক্ত ছিল, এরা একই জায়গায় বসে গল্প করত, খেত, পরস্পরের দিকে তাকালো, পরস্পরের কথা জানত, তা আর যেন এখন কারুর মনে পড়ে না।
অথচ ছিল সে অবস্থা।
সরোজকে কখনওই বেশি কথা বলতেন না, তবু তাঁর আশেপাশে এসে বসত সবাই।
