মীনাক্ষী হঠাৎ নিচু হয়ে একখানা ভাঙা ইট কুড়িয়ে নেয়। ঘৃণার গলায় বলে, ইতর শয়তান, ছোটলোক! আর এক পা-ও যদি এগোও, তোমার প্রাণের চিন্তাও করব না আমি তা জেনো৷
করো, তবে খুনই করো আমায় দিবাকর যেন কৌতুকের গলায় বলে, ভেবেছিলাম একরাতের জন্যে স্বর্গের টিকিট কিনছি, তা যখন হবে না, তখন তোমার হাতে মরেই স্বর্গে যাই।
পাকা অভিনেতা দিবাকর দাস, তেমনি ভাবেই বলে, মনে একটা অহংকার ছিল, বুঝি গরিব চাষা হয়েও রাজকন্যার ভালবাসা পেয়েছি। দেখছি সে অহংকার মিথ্যে।
মীনাক্ষী একটু নরম হয়।
নরম গলাতেই বলে, সেটা বুঝতে পেরেছ তার জন্যে ধন্যবাদ। আশা করি বুঝে ফেলে আবার সেই মিথ্যেটাকে গায়ের জোরে সত্যি করে তোেলার চেষ্টা করতে যাবে না। নাও, টর্চটাকে বার করো দিকি, চলো–
হঠাৎ হেসে ওঠে দিবাকর, জোরে জোরে বলে, যার অন্য জোর নেই, তার গায়ের জোরই ভরসা। মিথ্যে আর ভুগিও না, হাতের ইটটা ফেলল। আশ্বাস দিচ্ছি, জগতের কেউ জানতে পারবে না। আবার তোমায় যথাযথ ফেরত নিয়ে যাব।
তোমার কৃপার কথা মনে থাকবে–মীনাক্ষী অন্ধকারেই ক্ষীণ নক্ষত্রলোককে ভরসা করে এগোতে এগোতে বলে, তবে দরকার হবে না, আমি নিজেই যেতে পারব।
মীনাক্ষী চেষ্টা করে করে অন্ধকারেই এগোতে থাকে।
কিন্তু মীনাক্ষীর নিয়তি বুঝি অলক্ষ্যে ক্রুর হাসি হাসে। ঠিক সেই সময় সহসা শূন্য প্রান্তরের দিকে দিকে তীব্র চিৎকারে আকাশ সচকিত করে তোলে স্বেচ্ছাবিহারী গ্রাম্য শেয়ালের দল।
মীনাক্ষী যে-শত্রুর ভয়ে পালাচ্ছিল সেই শত্রুকেই ডেকে ওঠে, দিবাকর টর্চটা ধরো। তোমার ধর্মের দোহাই।
কিন্তু দিবাকর কি ওকে আলো দেখাবার জন্যে, ওর ফিরে যাবার পথ সুগম করার জন্যে টর্চটা ধরে? দিবাকর কি ধর্মের ধার ধারে?
তা ধারে না, তা ধারে না।
দিবাকর সত্যি সত্যিই সস্তা নাটকের ভিলেনের ভূমিকায় অভিনয় করে।
মীনাক্ষীর হাতের ইট কোনও কাজে লাগে না।
অন্ধকারে স্থানচ্যুত হয়ে কোথায় হারিয়ে যায়।
মীনাক্ষীও বুঝি হারিয়ে যায় একটা অতলস্পর্শী অন্ধকারের মধ্যে।
.
লে বাবা! আমি এলাম মাথা ফাটিয়ে, আবার তুই এলি জ্বর করে–কমলাক্ষ চেঁচিয়ে বলে, ও মা দেখে যাও তোমার ছোট মেয়ে ফিরেছেন। তবে শুধু হাতে নয়, গ্রাম থেকে বেশ একখানি উপহার নিয়ে।…ব্যাপার কী বল দিকি? পাড়াগাঁয়ের মাটিতে গিয়েই কি ডোবার জলে ডুব দিয়েছিলি নাকি?
হ্যাঁ দিয়েছিলাম! তাই দিয়েছিলাম। মীনাক্ষী ক্লান্ত গলায় বলে, এখন একটু শুতে দে দিকি।
শুতে চায় মীনাক্ষী।
নিজেকে ছেড়ে দিয়ে শুয়ে পড়তে চায়। কোনও কিছু ভাববে না, কোনও ঘটনা বিশ্লেষণ করতে বসবে, কাউকে দোষ দিতে যাবে না, নিজেকে ধিক্কার দেবে না, শুধু একটা নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে একটু ঘুমোবে।
কিন্তু কে তাকে নিশ্চিন্তে ঘুমোতে দেবে?
অনভিজ্ঞ ওই ছেলেটা জ্বরশব্দটাকে বিশ্বাস করে নিচ্ছে বলেই কি বিজয়ানামের ভয়ানক অভিজ্ঞ তীক্ষ্ণদৃষ্টি মহিলাটি তাই বিশ্বাস করবেন?
.
এ সংসারে একটিমাত্র মানুষ সুখী ছিল, প্রকৃত সুখী।
কিন্তু তারও সুখ গেছে।
তার সেই মনোরম গৃহকোটরটি ছেড়ে পৃথিবীর হাটে নেমে দিশেহারা হয়ে যাচ্ছে সে। ভাবছে–
আশ্চর্য! কী বুদ্ধিহীন এই পৃথিবী! এ পৃথিবী যেন তার জানা জগতের বাইরের আর কিছু জানতেই চায় না। শুধু তাই নয়, যেটা তার অজানা তাকে ব্যঙ্গ করে, বিদ্রূপ করে, হাস্যকর বলে স্রেফ উড়িয়ে দেয়। একবার কৌতূহলের বশেও উলটে দেখতে রাজি হয় না।
দীর্ঘদিনের সাধনার ফল, প্রাচীন ভারতের জ্ঞান ও আধুনিক জগতের বিজ্ঞানের পাণ্ডুলিপির বোঝা বয়ে পৃথিবীর দরজায় ঘুরে এই মূর্খ পৃথিবী সম্পর্কে হতাশ হয়ে এখন সারদাপ্রসাদ চাকরি খুঁজছে।
অথচ জগতের কোনও কাজই জানে না সে। তবু সে শুধু যাকে পায় তাকেই বলে বসে, দাদা, একটা চাকরি জোগাড় করে দিতে পারেন?
তবে ঝোঁক তার প্রেসে কাজ করবার।
হয়তো ওই প্রেসের চাকরির ঝোঁকের অন্তরালে কোনও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার আশা প্রচ্ছন্ন আছে। তার।
কিন্তু সবাই চায় পূর্ব অভিজ্ঞতা!
আগে কোথায় কাজ করেছেন? কোন প্রেসে?
করিনি কোথাও। এখানে করব বলে এসেছি।
ওঃ, তা হঠাৎ প্রেসে কাজ করতে ইচ্ছে হল যে? অন্য কোথায় কাজ করতেন? ছেড়ে এলেন কেন এ বয়েসে?
সারদাপ্রসাদ বিরক্ত হয়।
রেগে রেগে বলে,কেন, কী বিত্তান্ত, এত কৈফিয়ত আপনাকে দিতে যাব কেন মশাই? আপনার চাকরি খালি আছে কিনা তাই বলুন।
অপর পক্ষই কি তবে ছেড়ে কথা কইবে, মেজাজ দেখাবে না? নাই বা তাকে বহাল করা হচ্ছে, চাকরি যে চাইতে এসেছে, সে-ই চাকর। অতএব মনিবের গলাতেই বলে তারা, আছে খালি। কিন্তু আপনাকে দেব না। তবে এইটুকু জেনে যান, ওইসব কেন কী বিত্তান্ত না জেনে কেউ আপনাকে একখানা অফিসারের চেয়ারে বসিয়ে দিতে আসবে না। একটা বেয়ারার কাজ করতে এলেও শুধু আপনার কেন, আপনার সাত পুরুষের ঠিকুজি কুষ্ঠির বিত্তান্ত জানতে চাইবে।
কেন? কেন শুনি মশাই? দাগী আসামি নাকি?
ওরা হ্যা-হ্যা করে হেসে ওঠে।
বলে, ওঃ চিড় খাওয়া! তাই বলি।
চিড় খাওয়া ব্রেনের লোক স্বাভাবিক হয় না।
কিন্তু সরোজাক্ষর ব্রেনেও কি চিড় খেয়েছে? তাই তিনি বাড়ির চৌকাঠের বাইরে পা দেওয়াটাও ছেড়ে দিয়েছেন?
ডাক্তারের নিষেধকাল কবে পূর্ণ হয়ে গেছে, তবু মানুষটা ঘর ছেড়ে নড়ে না, এ কী কুদৃশ্য!
