মীনাক্ষী চুপ করে গিয়েছিল।
মীনাক্ষীর মনটা ভারী ভারী হয়ে গিয়েছিল। মীনাক্ষীর মনে পড়েনি দিবাকরের হাতটা তার কাঁধের উপর রয়ে গেছে।
এক সময় দিবাকর আবার হালকা গলায় বলে, নাঃ, তোমার মনটা খারাপ করে দিলাম। কী জানো? দেশে এলেই–যাক গে, ওসব কথা থাক। হ্যাঁ, কী বলছিলে তখন? এখানে পাকাবাড়ি আছে কিনা। তা একেবারে নেই, তা নয়। অনেক হতভাগ্যের মধ্যে, এক-আধজন ভাগ্যবানও থাকে তো৷
দিবাকর, তুমি যে বলেছিলে স্টেশন থেকে খুব বেশি দূরে নয় তোমাদের বাড়ি, কিন্তু অনেকক্ষণ তো হাঁটছি।
গ্রামের হিসেবে এইই সামান্য মীনাক্ষী! তোমার বুঝি খুব কষ্ট হচ্ছে?
না না, কষ্ট হতে যাবে কেন? এমনি বলছি।
আর একটু কষ্ট করতে হবে।বলেছিল দিবাকর।
তারপর বেলা যখন মরণোন্মুখ, তখন দিবাকর এই ধ্বংসগ্রস্ত পোড় অট্টালিকাটায় এসে ঢুকল মীনাক্ষীকে নিয়ে।
মীনাক্ষী অবাক হয়ে বলে, এখানে কী? এটা তোমার বাড়ি নাকি?
না। আমার কেন হবে? দিবাকর হঠাৎ যেন ব্যঙ্গের গলায় কথা কয়ে ওঠে,নিন্দে করছিলে এখানে কোঠাবাড়ি নেই বলে, তাই কোঠাবাড়ি দেখাতে নিয়ে এলাম।
ওর এই স্বরটা ভাল লাগল না মীনাক্ষীর। ভয়ানক অস্বস্তি হল কপাট উড়ে যাওয়া জানলা দরজার ফোকরগুলো দেখে। ভয় করে উঠল ভাঙা দেয়ালের গায়ে গায়ে গাছের শিকড় নামা দেখে।
মীনাক্ষী তাই রুক্ষ গলায় বলে উঠল, নিন্দে আবার কখন করলাম? শুধু জিজ্ঞেস করেছি। ঘাট হয়েছে বাবা! চলল চলল, সন্ধে হয়ে আসছে, কোথা থেকে হয়তো সাপ-খোপ বেরিয়ে পড়বে ।
দিবাকর একটা নির্লজ্জ হাসি হেসে বলে, এক্ষুনি চলে যাব মানে? এত কলাকৌশল করে এত তোড়জোড় করে আসা কি এক্ষুনি চলে যাবার জন্যে?
সহসা চারধারের ভাঙা দেয়ালগুলো ভূমিকম্পে দুলে ওঠে, ঝিকিমিকি আলোটা মুহূর্তে গাঢ় অন্ধকারের গহ্বরে ডুবে যায়, একটা দাঁতখিচনো দৈত্য ওই ফোকরে ফোকরে উঁকি দিয়ে দিয়ে বেড়ায়।
মীনাক্ষীর হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে যায়।
মীনাক্ষীর বুকের ভিতরে প্রকাণ্ড একটা পাথরের চাঁই এসে বসে।
তবু মীনাক্ষী চিৎকার করে ওঠে, ভাঙা ভাঙা গলায়।
একথার মানে কী দিবাকর?
দিবাকর বিচলিত হয় না।
দিবাকর তেমনি নির্লজ্জ হাসি হেসে বলে, মানে অতি প্রাঞ্জল। কলকাতার সমাজে কোনওখানে তো পাওয়া যাবে না তোমায়, তাই অনেকদিনের একটা বাসনা পূরণ করতে এত কাঠখড় পোড়ানো
দিবাকর!
মীনাক্ষী তীব্র তিরস্কারে চেঁচিয়ে ওঠে, এতবড় শয়তান তুমি?
দিবাকর রূঢ় গলায় বলে, গরিব যদি জগতের কোনও ভোগ্যবস্তুর দিকে হাত বাড়ায় তা হলেই সে শয়তান বলে গণ্য হয়। কিন্তু এছাড়া তোমায় আমি পেতাম কী করে?
পাওয়া!
মীনাক্ষী অন্ধকার হয়ে যাওয়া পটভূমিকায় তার একদার প্রেমাস্পদের মুখটা দেখবার চেষ্টা করে। সবটা মিলিয়ে শুধু একটা ছায়ামাত্র দেখতে পায়। তার উদ্দেশেই ক্ষুব্ধ গলায় বলে, একে তুমি পাওয়া বলো?
বলি। তাই বলি– দিবাকর নিষ্ঠুর গলায় বলে,এইমাত্র স্বর্গ থেকে পড়নি তুমি মীনাক্ষী, এই পৃথিবীটাকে দেখনি তা নয়। আমাদের মতো রক্তমাংসের মানুষের কাছে পাওয়ার আর কোন অর্থ আছে তুমিই বলো?
দিবাকর, এত নীচ হোয়য়া না, নিজেকে এত ছোট কোরো না। তোমার সভ্যতার কাছে, তোমার ভদ্রতার কাছে নিজেই তুমি এ প্রশ্নের উত্তর চাও।
সভ্যতা? ভদ্রতা? ওগুলো তো স্রেফ এক-একটা মেকি শব্দ। আমি ওর ধার ধারি না। আমি ঠিক করেছি
তুমি কী ঠিক করেছ, সেটা আমার না জানলেও চলবে–মীনাক্ষী ভিতরের ভয় চাপা দিয়ে সহজ ভাব দেখায়। যেন দিবাকর নামের ওই ছেলেটা একটা বাজে বিষয় নিয়ে তর্ক করছে এইভাবে জোরে জোরে বলে, তোমার বাড়ি দেখার সাধ আমার মিটেছে, এখন দয়া করে এখান থেকে বেরিয়ে চলো দিকি। স্টেশনের দিকে চলল। অদ্ভুত! যেন একটা হিন্দি সিনেমার ভিলেনের অভিনয় করতে বসেছ তুমি।
দিবাকর পকেট থেকে একটা টর্চ বার করে। এদিকে ওদিক দেখে নিয়ে আবার পকেটে পুরে ফেলে মীনাক্ষীর একটা হাত চেপে ধরে কাছে টানবার চেষ্টা করে বলে, ঠিকই বলেছ। তোমাদের তথাকথিত রোমান্টিক নায়ক হবার বাসনা আমার নেই। ভিলেনই হতে চাই আমি। অনেক চেষ্টা করে, অনেক মিথ্যের আশ্রয় নিয়ে এ ব্যবস্থা করেছি, দয়া করবার ক্ষমতা আজ আমার নেই। এ বাড়ির ও-পাশের একটা অংশ বাসযোগ্য আছে, এবং বাস করেও একজন। আমার প্রতি দয়াপরবশ হয়ে সে আজকে ঘরের অধিকার ছেড়ে চলে গেছে। একদা কোনও এক রাজা-মহারাজার বাগানবাড়ি ছিল এটা
দিবাকর! আমি তোমার এই বাড়ির ইতিহাস জানবার জন্যে ব্যগ্র নই। হাতটা ছাড়িয়ে নেয় মীনাক্ষী, খুব খারাপ লাগছে আমার।
কিন্তু হাতের তালুটা বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে আসছিল তার। ওই লোকটা যে একদা তার বন্ধু ছিল, এটা আর মনেও পড়ছে না। একটা হিংস্র জানোয়ারের সামনে পড়ার মতোই অবস্থা হচ্ছে তার। আর ছুটে পালাবার চিন্তাটাই পেয়ে বসে তাকে।
কিন্তু সূর্যালোকের শেষ কণিকাটুকুও যে মুছে গেল! মীনাক্ষী চারধারে গাঢ় অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই দেখতে পায় না। মীনাক্ষী তবু সেই অন্ধকারেই সেই ভাঙা অট্টালিকার দেউড়ি দিয়ে বেরিয়ে আসে। ছুটতে চেষ্টা করে।
কিন্তু কোথায় ছুটবে?
এই নীর অন্ধকারে কে জানে কোথায় আছে কাঁটা ঝোঁপ, কোথায় আছে ডোবা পুকুর। দিবাকর এগিয়ে আসে। বলে, মীনাক্ষী, বৃথা ছেলেমানুষি কোরো না। এটা লোকালয়ের থেকে অনেক দূরে, চেঁচিয়ে মরে গেলেও কেউ শুনতে পাবে না। আর পৃথিবীর কেউ জানতেও পাবে না, তোমাকে আমি কয়েক ঘণ্টার জন্যে পৃথিবী থেকে চুরি করে এনে—-
