তার বদলে আমি কী পেয়েছি?
পেয়েছি মেহেরা সাহেবের প্রেমমুগ্ধ দৃষ্টি। পেয়েছি শকুন্তলা রায়ের ঈর্ষা। আর পেয়েছি জগৎকে তুচ্ছ করবার ক্ষমতা।
এখন আমি আমার স্বামীকে অনায়াসে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতে পারি। শ্রীমতী বিজয়া দেবীকে অবহেলার চরম দেখাতে পারি। পারি আরও অনেক কিছুই।
কারণ এই গৃহগণ্ডির বাইরে আমার যে একটা মূল্য আছে সেটা টের পেয়েছি আমি।
পাওয়ার খাতায় আরও জমা পড়েছে।
কিন্তু সুখ পেয়েছি কি?
নিদেন শান্তি?
অথবা আরও সস্তা জিনিস, স্বস্তি?
পাইনি।
ওর কোনওটাই পাইনি।
কারণ ওর বদলে ওই দামি দামি জিনিসগুলো আমি সত্যি চাইনি। আমি শুধু আমার স্বামীর ওপর আক্রোশ করে নিজেকে ধ্বংস করেছি।
এখন ও আমাকে ভয় পায়।
এটাকে যদি সুখ বলো তো সুখ।
অথচ কমল আমায় অগ্রাহ্য করে মুখ ফিরিয়ে চলে গেল বলে আমার পৃথিবীটা বিস্বাদ হয়ে যাচ্ছে।
আমি চোরের উপর রাগ করে মাটিতে ভাত খেয়েছি। আমি ওর উপর প্রতিশোধ নিতে গিয়ে নিজের উপর প্রতিশোধ নিয়েছি।
আমার শ্বশুর আমায় শ্রদ্ধা করতেন, এখন আমি তাঁর সামনে মুখ তুলে দাঁড়াতে পারি না।
অথচ আমি ওঁর ঘরের সামনে দিয়ে মাতাল হয়ে টলতে টলতে আসি।
এই অদ্ভুত জীবনটার পরিসমাপ্তি কী, জানি না।
হয়তো যখন আমার ছেলে বড় হয়ে আমায় ঘৃণা করবে, তখন এর পরিসমাপ্তির চেহারা দেখতে পাব।
সুনন্দা নীচে রাস্তার দিকে তাকায়।
কতটুকু দুরত্ব?
হঠাৎ এখান থেকে ঝাঁপ দিয়ে পড়লে এখুনি সব প্রশ্নের উত্তর মিলে যেতে পারে কি?
এই মুহূর্তে সেইরকম একটা ইচ্ছে দুর্দম হয়ে উঠছে।
আশ্চর্য!
একটা খুদে ছেলে আমায় ঘৃণা করছে, তাই আমার কাছে সমস্ত পৃথিবীটা অর্থহীন হয়ে যাচ্ছে?
ছিঃ!
পেটে আজ আনন্দরস পড়েনি, তাই এমন দুরবস্থা।
শুনেছি মাতালদের মদ না খেলে অকারণ বিষাদ রোগ হয়।
আমারও তাই হয়েছে।
কী মজা! কী মজা! আমিও মাতাল। তার মানে আমি জাতে উঠেছি। আমি অভিজাত হয়েছি। আর আমায় গেরস্ত ঘরের বউ বলে চেনা যাবে না।
শকুন্তলা রায়ের পর্যায়ে উঠে গেলাম আমি।
কী মজা!
কিন্তু এত মজার মধ্যেও আমার কান্না পাচ্ছে কেন? আজ তো আমি নেশা করিনি। আমার শরীরের সব রক্তই কি তবে মদ হয়ে গেছে? নেশা না করেও নেশা হয়? তাই শুধু শুধু কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছে, শুধু শুধু হাততালি দিতে ইচ্ছে করছে।
ও-মা-গো, আমি কী করি?
.
ঝিকিমিকি বেলায় এই বাড়িটায় ওকে নিয়ে এসে ঢুকল দিবাকর। কিন্তু সেই ঝিকিমিকির পরমায়ু যে বেশি নয়, তা ধরা পড়ছে তার লালচে আভায়।
কিন্তু বাড়িটা কি গরিবের পাতার কুটির?
যে কুটিরে দিবাকরের মহীয়সী জননী তাঁর অগাধ স্নেহসাগর নিয়ে অপেক্ষা করে বসে থাকেন দিবাকরের আশায়?
না, সে বাড়ি এ নয়।
এ কোনও বিগতকালের ধনীর পরিত্যক্ত অট্টালিকার ধ্বংসাবশেষ।
যতক্ষণ স্টেশন থেকে হাঁটাপথে আসছিল মীনাক্ষী, ততক্ষণ বেশ ভালই লাগছিল তার। ঝোঁপঝাড় গাছপাতার মাথায় পড়ন্তবেলার আলোর লুকোচুরি, ছবিতে দেখা কুঁড়েঘরের মতো উঁচু উঁচু মাটির দাওয়া দেওয়া পাতার কুঁড়ে, পানাপুকুর, পায়েচলা পথ, ক্কচিৎ এক-আধটি গ্রামবধুর জল আনতে যাওয়ার দৃশ্য, মনের জগতে পাড়াগাঁয়ের যে ছবি আঁকা আছে, তার সঙ্গে প্রায় হুবহু মিলে যাচ্ছে।
দিবাকর এইগুলোর পরিচয় দিতে অনর্গল কথা বলছিল, কিন্তু মীনাক্ষীর মনে হচ্ছিল এত কথার দরকার ছিল না। এর আর পরিচিতি দেবার কী আছে? আঁকা ছবিতে যা দেখেছে, সিনেমার ছবিতে যা দেখেছে, তারই জীবন্ত সংস্করণ বই তো নয়!
অনেকবার ভাবল বলে যে, দিবাকর তুমি একটু কম কথা বলো, শান্ত হও, ধীরে কথা কও, ওরে মন নত করো শির।কারণ সন্ধ্যা আসছে।
কিন্তু বলতে পারল না।
বলবার ফাঁক পেল না।
আবার কোনও এক সময় যখন ফাঁক পেল, তখন নিজেই কথার বীজ পুঁতে বসল। বলল,আচ্ছা, তোমাদের এখানে ইটের দেয়াল করতে নেই নাকি? সমস্তই তো দেখছি মাটির বাড়ি।
দিবাকর মৃদু হেসে বলে, মাটির মানুষদের দেশ যে।
তারপর পকেট থেকে রুমাল বার করে অকারণ তার সেই অগ্নি-গোলকের মতো চোখ দুটো মুছে নিয়ে বলে, এই মাটির দুখানা ঘর তুলতেই এদের যথাসর্বস্ব বাঁধা পড়ে, সারাজীবন ঋণ আর শোধ করে উঠতে পারে না।
মীনাক্ষী একটু ছেলেমানুষি গলায় বলে, বাঃ, তা কেন? মিস্ত্রিকে না দিয়ে নিজেরা করে নিলেই পারে? কী আর শক্ত?
দিবাকর উচ্চতরালে হেসে ওঠে। নির্জন পথে পথ চলতে দিবাকরের সেই হাসিটায় হঠাৎ যেন গা ছমছম করে ওঠে মীনাক্ষীর।
এতে এত হাসির কী আছে? ভয় ভাঙতেই বোধ করি তীক্ষ্ণ প্রশ্ন করে মীনাক্ষী, এতে এত হাসির কী আছে? যারা ঘর বানায় তারাও তো মানুষ? চাষা-টাষা মানুষরা যদি নিজেরা খেটেখুটে
নিজেরা খেটেখুটেই করে নেয় মীনাক্ষী, মিস্ত্রির স্বপ্ন দেখে না এরা। মেয়ে-পুরুষ, বালবাচ্চা সবাই মিলে খাটে। কিন্তু মাল-মশলা তো চাই?
মাল-মশলা? মীনাক্ষী অবাক হয়ে বলে, মাল-মশলা আবার কী? শুধু তো মাটি! চারদিকে এত মাঠ–।
নাঃ তোমাকে যতটুকু অবোধ ভেবে রেখেছিলাম, দেখছি তার দশগুণ অবোধ তুমি। মাঠ পড়ে আছে বলেই কি মাটি নেওয়া যায়? যার জমি সে আপত্তি করবে না? তা ছাড়া বাঁশ বাখারি, দড়ি পেরেক, এইসব চাই না?
বাঃ, ওর এত কী দাম!
অনেক দাম মীনাক্ষী, এদের কাছে ওই তুচ্ছ বস্তুগুলোই অনেক দামি।
দিবাকরের গলার স্বর ভারী হয়ে আসে। দিবাকর আস্তে মীনাক্ষীর কাঁধের উপর একটা হাত রেখে বলে, শহুরে নাট্যকাররা এদের দুঃখ দুর্দশায় বিগলিত চিত্তে জোরালো নাটক লিখে মঞ্চস্থ করে বাহবা লোটেন, কিন্তু জানো, এদের দুঃখের এক সহস্রাংশও তাতে প্রকাশ হয় না। এদের কথা ভাবো মীনাক্ষী! গভীর ভাবে ভাবো।
