আহা আমার নিজের জন্যে যেন–মীনাক্ষী ঝংকার দিয়ে ওঠে,আমাদের বাড়িটি কেমন, জানো না বুঝি? পারমিশন পেতে। এই কথাই বলে। বাধা তার নিজেরই মধ্যে, তা বলে না।
ওইখানেই ভুল। কমলাক্ষ বলে, ওটা পাবার চেষ্টামাত্র না করে নিজের মনে কাজ করে যাও, দেখবে সব সহজ হয়ে যাবে। এত কিছু নাবালিকা নও তুমি যে, একদিনের জন্যে কোথাও যেতে পাবে না। এটা কি ঊনবিংশ শতাব্দী নাকি?
মীনাক্ষী হয়তো একটু আশ্বস্ত হয়, কিন্তু মীনাক্ষী আশ্চর্য হয়। কতদিন আসেনি কমলাক্ষ! এর মধ্যে কী অদ্ভুত পরিবর্তন হয়েছে তার।
কমলাক্ষই সর্বদা বলত,আরে বাবা, একটু বাধ্য বাধ্য ভাব, একটু মত নেওয়া নেওয়া খেলা, এগুলো করলেই যদি বুড়ো ভদ্রলোককে, আর পুণ্যশীলা মহিলাটিকে সন্তুষ্ট রাখা যায়, করলে ক্ষতি কী? সত্যি তো আর খোসামোদ করছ না? একটু ভোয়াজ দেখাচ্ছ, মিটে গেল সমস্যা।আসল কথা কাজ হাসিল। সেটা লাঠি মেরেও হয়, তোয়াজ করেও হয়। আমার মতে, তোয়াজটা অনেক সহজ। একটা যন্ত্র ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করলেও তেল দিতে হয়। আর এ তো মানুষ! দেখবি যথাসময়ে একটু তেল প্রয়োগে সব শান্ত।
কিন্তু এ কমলাক্ষ নতুন।
এর ভাষায় যেন দিবাকরের সুর।
পুরনো দিবাকরের।
এ বলতে চায়, সাবালক হয়েও নাবালকের ভূমিকা অভিনয় করে চোলো না। তুমি হচ্ছ তোমার। তুমি কারও ইচ্ছের পুতুল নও।
মা বাপ সম্মানের জিনিস, কিন্তু যতক্ষণ তাঁরা নিজেরা সম্মাননীয় রাখেন নিজেদের
একদা তাঁরা এই হতভাগ্যদের পৃথিবীতে এনেছিলেন বলেই তাদের কিনে রেখেছেন? কে তাঁদের আনতে মাথার দিব্যি দিয়েছিল?
কেউ না।
তাঁরা নিজেদের খেয়াল চরিতার্থ করতে যা করেছেন, আমরা তার অবাঞ্ছিত আকস্মিক ফলমাত্র।
.
কমলাক্ষর নতুন মতবাদে অবাক হয়ে যায় মীনাক্ষী। আর তারপরই সেই অবাক হওয়া মন আস্তে আস্তে সাহসী হয়ে ওঠে। সত্যিই বটে, কী তুচ্ছ একটা ব্যাপারকে কতটা উচ্চ মূল্য দিচ্ছে সে। ভারী তো কাণ্ড!
দিবাকরের সঙ্গে একটা ট্রেনে চেপে বসবে, নামবে, তার মার কাছে গিয়ে দাঁড়াবে। তারপর দারিদ্র্যের ঘরের আন্তরিকতার যত্ন সানন্দে গ্রহণ করে একটা রাত কাটিয়ে সকালে চলে আসা। এর জন্যে এত ভাবছে কেন?
তুই তো এখন আছিস?
তাই ভাবছি। অন্তত যতদিন না মাথাটা সারে।
ঠিক আছে। যদি গৃহকর্তা বা গৃহিণী বিশেষ আপত্তি শুরু করেন, তুই ম্যানেজ করে দিবি।
মীনাক্ষীর বুকের পাষাণভারটা নামে। মীনাক্ষী প্রস্তুত হয়।
.
সন্ধ্যাবেলা অফিস থেকে ফেরে নীলাক্ষ, সঙ্গে স্ত্রী। শ্বশুরবাড়ি থেকে তুলে এনেছে।
মাঝে-মাঝেই এ ব্যবস্থা হয়।
নীলাক্ষ অফিস যাবার সময় সুনন্দাকে তার বাপের বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে যায়, সুনন্দা সেখান থেকেই ছেলেকে স্কুল থেকে আনিয়ে নেয়। আবার এ-বেলা নীলাক্ষ শুধু স্ত্রীকে নিয়ে ফেরে, পুত্র থাকে। নিজেরা বেড়িয়ে ফিরে তাকে উদ্ধার করে আনে সেই রাত্রে।
বিজয়া যে ছোট ছেলেকে বলেছিলেন, ভাইপোকে দেখতে চাস তো তার মামার বাড়িতে যেতে হবে–কথাটা নেহাত অত্যুক্তি নয়।
ব্যবস্থাটা ক্রমশই এই খাতে গড়াচ্ছে।
আগে এত পিত্রালয়-প্রীতি ছিল না সুনন্দার, ক্রমশই বাড়ছে। আবার তার মায়েরও মাতৃস্নেহ বাড়ছে। একদিন মেয়েকে না দেখলেই নাকি তিনি চক্ষেহারা হন। অথচ আগে হতেন না।
কমলাক্ষকে দেখে অবশ্য খুশি হয় সুনন্দা, কিন্তু কমলাক্ষ হয় না। বিচ্ছুর অভাবটা তার বড় বেশি লাগে।
নিজে সে অনেক বদলেছে, তার হৃদয়যন্ত্রে সম্পূর্ণ নতুন সুর, অথবা অসুর। কিন্তু বাড়ির এই সুর বদল তার ভয়ংকর খারাপ লাগছে।
যেন যে জিনিসটা রেখে গিয়েছিল, সে জিনিসটা তার অনুপস্থিতিতে হারিয়ে গেছে।
হয়তো এইরকম হয়।
মানুষ নিজে প্রতিনিয়ত বদলায়, কিন্তু আশা করে, আমার পারিপার্শ্বিকতা অবিচল অবিকৃত থাকুক। নিজে সে তার মূল্য দিক বা না দিক, থাকাটা দরকার।
কমলাক্ষ তেমন করে কথা কইল না।
কমলাক্ষ তার নিজের ঘরে গিয়ে অসময়ে শুয়ে পড়ল।
কমলাক্ষ সর্বপ্রথম হাতজোড় করে বলেছিল, মাথার ব্যান্ডেজ প্রসঙ্গটা বাদে, অন্য প্রসঙ্গ।
তবু সুনন্দা বরকে বলল, আমার আজ বেরোতে ইচ্ছে করছে না।
কেন? কমলাক্ষবাবুর আপ্যায়নের জন্যে? নীলাক্ষ ব্যঙ্গের গলায় বলে, বাবু তো ভাল করে কথাই কইলেন না।
সুনন্দা ভুরু কোঁচকায়।
সুনন্দা ফিরে দাঁড়িয়ে বলে, হঠাৎ এমন অদ্ভুত ধারণা হল কেন তোমার যে, আমি তোমার ছোট ভাইয়ের সেবাযত্নের জন্যে বাড়ি বসে থাকতে চাইছি?
তবে খামোকা বাড়ি বসে থাকবে কেন?
প্রত্যেকেরই ভাল লাগা, ভাল না-লাগা ব্যাপারটা আছে। আজ আমার ভাল লাগছে না।
নীলাক্ষ তবু কয়েকবার স্ত্রীকে অনুরোধ উপরোধ করল।
তারপর বিরক্ত হয়ে চলে গেল।
সুনন্দা এদিকের ছায়াও মাড়াল না। সুনন্দা অন্ধকার বারান্দায় চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
সুনন্দার মনের মধ্যে যেন একটা ভাঙা গ্রামোফোন রেকর্ড বাজতে লাগল। যে রেকর্ডের কথাগুলো হচ্ছে এইরকম–এই বাড়িতে ওকেই সবচেয়ে ভালবাসতাম আমি। মানে যখন আমি সত্যিকার আমি ছিলাম। আর ও-ও আমার সবচেয়ে প্রীতির চক্ষে দেখত। এখন ও আমায় ঘৃণা করছে। করছে সেটা তো দেখতেই পেলাম।
শুধু ওরই নয়, এখন আমি আমার সমস্ত পুরনো পরিচিত জগতের কাছেই ঘৃণিত। কারণ আমার পুরনো আমিকে ভস্ম করে সেই ভস্মের টীকা পরে নৃত্য করছি।
