কমলাক্ষ অবশ্য ওটা মানল না।
বলল, এ-ধারণার কোনও মানে হয় না তোমার। বাবা তো চিরদিনই ওইরকম অদ্ভুত আদর্শবাদী। একটা অবাস্তব পৃথিবীতেই বাস করলেন বরাবর। আর তোমরা কেই বা নয়? তুমি আছো তোমার নিজের বানানো এক অলৌকিক স্বর্গে, বাবা আছেন তাঁর আদর্শের পৃথিবীতে। আর আমরা, তোমাদের অভাগা সন্তানরা, মোহমুক্ত চোখ নিয়ে তোমাদের করুণা করছি। তা যাক, শ্ৰীমতী মীনাক্ষী দেবী গেলেন কোথায়? এসে পর্যন্ত তো তাঁর টিকি দেখছি না।
মীনা?
বিজয়া ঠোঁট উলটে ছোট ছেলের কাছে তাঁর ছোট মেয়ের পাখা গজানোর বার্তা শোনান এবং শিগগিরি যে সে একটা অজাত-কুজাতকে বিয়ে করে বসবে, এমন ভবিষ্যদ্বাণী করেন।
কমলাক্ষ মার কথাকে খুব একটা গুরুত্ব দেয় না বটে, কারণ বরাবরই জানে মার তিলকে তাল করা রোগ, তবে দাদা বউদির নতুন উন্নতির বিশদ খবরে চমকৃত না হয়ে পারে না। যা রটে তার কিছুও তো বটে।
আর দিদি? দিদির খবর কী?
দিদি!
বিজয়া ঠোঁটের সেই একই ভঙ্গি করেন, তিনিও সুবিধে পেলে বউদির দলেই যান, তবে কিপটে বলেই একটু রক্ষে। দুটিতেই তো সমান কিপটে! আসে যায়, এক পয়সার মিষ্টি কখনও হাতে করে আসে না।
মার এই একঘেয়ে কথা আর ভাল লাগছিল না কমলাক্ষর। তাই সে যাই, একটু ঘুরে আসি।বলে উঠে দাঁড়ায়।
এখন আবার কোথায় ঘুরতে যাবি মাথায় ফেট্টি নিয়ে?
মাথায় ফেট্টি? হু:, ওতে লজ্জা কী? ও তো বিজয়-গৌরবের স্বাক্ষর!
বলে হাসতে হাসতে চলে যায় কমলাক্ষ।
কিন্তু নীচতলায় সারদাপ্রসাদ ধরে।
তোমার আর কবছর বাকি?
আর এক বছর, কমলাক্ষ হেসে বলে, যদি অবশ্য ফেল না করি। কেন বলুন তো?
সারদাপ্রসাদ বলে, অ্যাঁ? ফেল করবে কেন?
পাশ করছি কেন এই ভেবেই তো অবাক হচ্ছি মাঝে মাঝে। সারা বছরই তো ফাঁকি দিই।
সারদা গম্ভীর হয়।
বলে, বাবার মাথার ঘাম পায়ে ফেলা পয়সা। সে পয়সা এইভাবে অপচয় করো?
কমলাক্ষও সহসা গম্ভীর হয়।
বলে, হঠাৎ এ-প্রশ্নটা আপনার মাথায় উদয় হল যে?
হওয়ার কারণ রয়েছে। তোমার বাবা কলেজ ছেড়ে দিয়েছেন জানো না বোধহয় তুমি!
জানতাম না। মার কাছে জানলাম।
তা এখন তো সংসারের কথা সকলকেই ভাবতে হবে, সারদাপ্রসাদ তার মুখে বেমানান একটা গাম্ভীর্য নিয়ে বলে, নীলু তো ঝেড়ে জবাব দিয়েছে।
কমলাক্ষ হালকা গলায় বলে, বাবাকে ওই পাগলামিটা ছাড়তে হবে। আবার গিয়ে জয়েন করতে হবে।
ছেড়ে দিয়ে আবার?
সারদাপ্রসাদ অবাক চোখে তাকায়।
কমলাক্ষ ওই অবাকটা বোঝে না। বলে, সেটা অসম্ভব নয়। বুঝিয়ে একটা চিঠি লিখলেই হবে। বললেই হবে হঠাৎ ঝোঁকের মাথায় কাজটা করেছিলাম
তোমার বাবার কথা হচ্ছে কমল!
সারদার গলা শান্ত শোনায়।
কমলাক্ষ চঞ্চল হয়ে ওঠে। কমলাক্ষ অশান্ত গলায় বলে, বাবা তো চিরকালই একটা অবাস্তব বুদ্ধিতে চললেন। অন্য অন্য জায়গায় মাস্টাররা ঠেঙানি খেয়ে আবার হেঁট মুখে এসে কাজ করছে, আর বাবা একটু ঘেরাও হয়ে–আশ্চর্য! ঘেরাও আবার আজকাল কে না হচ্ছে? আচ্ছা আমি একটু বেরোচ্ছি।
কমলাক্ষ বেরিয়ে যায়।
পিছনের চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে দেখে না।
দেখে না তাই ভাল। দেখলে চমকে যেত। সারদাপ্রসাদ নামের মানুষটার চোখে যে এমন আগুন জ্বলতে পারে সেটা তার ধারণার বাইরে।
.
আবার যে চোখ দুটো সর্বদাই প্রায় আগুনের ঢেলার মতো জ্বলত, সেই চোখ এমন মলিন নিষ্প্রভ নিভে যাওয়া কয়লার মতো দেখাতে পারে তেমন ধারণাও ছিল না একজনের।
কিন্তু দেখাচ্ছে তাই।
দিবাকরের চোখ দুটো যেন নিভে যাওয়া কয়লার মতো হয়ে গেছে।
কাল বিকেল চারটের গাড়িতে যেতে পারবে মীনাক্ষী?
মীনাক্ষী অস্বস্তির গলায় বলে,আচ্ছা ভোরবেলার কোনও গাড়ি ধরো না, যাতে সন্ধের গাড়িতে ফিরে আসা যায়।
তেমন কোনও গাড়ি নেই মীনাক্ষী! যেভাবেই যাও একটা রাত কাটাতে হবে।
তারপর দিবাকর বোঝতে বসে, শুধু দিনের আলোয় গিয়ে ঘুরে এলে, গ্রামের যথার্থ দৈন্য, যথার্থ চেহারা ধরা পড়বে না। তার জন্যেও অন্তত মীনাক্ষীর রাতটুকু থাকা উচিত-দেখবে–অন্ধকার মানে কী! দেখবে–অসহায়তা মানে কী! দেখবে কী আমাদের দেশ!
কিন্তু এতদিন দিবাকর তো অন্য কথাই বলেছে।
তা বলেছে বটে!
কিন্তু কেন বলেছে?
জ্বালায়।
ভেবেছে মনের মুক্তি এলেই বুঝি অবস্থারও মুক্তি আসবে। এখন বুঝছে সেটা ভুল।
অনেক কথা হয়!
অনেক কাঠ-খড় পোড়ে।
অবশেষে মীনাক্ষী রাজি হয়।
বাড়িতে কী বলবে?
বলুক না সাহসের সঙ্গে, একজন সহপাঠীর গ্রাম দেখতে যাচ্ছি। অনেকদিন ধরে বলছে।
.
কথা দিয়ে এল।
কিন্তু যেন মনের মধ্যে একটা পাষাণভার। আস্তে আস্তে বাড়ি ঢুকছিল, হঠাৎ কমলাক্ষকে দেখে যেন হাতে স্বর্গ পেল।
ছোড়দা তুই কখন এলি? হঠাৎ এখন? মাথায় কী হল?
একঝাঁক প্রশ্ন।
কমলাক্ষ যতটা সংক্ষিপ্ত করে সম্ভব উত্তরটা দিয়ে বলে ওঠে, তোমার কী ব্যাপার শ্রীমতী মীনাক্ষী দেবী, শুনলাম তোমার নাকি পাখা গজিয়েছে, তুমি নাকি উড়ছ, কোনদিন না হঠাৎ ফুড়ুৎ করে বনে পালাও।
শোনা হয়ে গেছে সব? মীনাক্ষী হালকা গলায় বলে, যাক বাঁচা গেছে, আমাকে আর খাটতে হল না।
তারপর মীনাক্ষী নিজের সমস্যার কথা পাড়ে।
কিন্তু কমলাক্ষ যেন এক ফুয়ে উড়িয়ে দেয় তার মনের পাথর।
এই ব্যাপার। এর জন্যে এত চিন্তা? নাঃ, তোদের এ যুগে জন্মানোই ভুল হয়েছে। ওই বিজয়া দেবীরই সমকালীন তুই। একদিনের জন্যে সহপাঠীর দেশে বেড়াতে যাবি, তাই নিয়ে এত দুশ্চিন্তা, এত ভাবনা!
