তাই জানতে চাইছেন, কতটা গহিত আচরণ করেছিলেন কমলাক্ষদের মাস্টার।
কমলাক্ষ তার উত্তর দিয়েছে। কমলাক্ষর মতে–
তোমরা যদি বলো গর্হিত নয় তো বলো। তোমরা তোমাদের পুরনো চশমা দিয়ে নতুন পৃথিবীকে দেখতে চাও তো দেখো। পৃথিবীর তাতে কিছু এসে যাবে না। লজ্জিত হয়ে বদলাতেও বসবে না সে নিজেকে।
এ-যুগ বলবে মাস্টার হয়েছ বলে মাথা কেনোনি। তুমি টাকার বিনিময়ে তোমার অধীত বিদ্যা বিক্রি করছ, আমি আমার টাকা দিয়ে সেই বিদ্যা কিনছি। এর মধ্যে এ-সম্পর্ক আসে কীসে যে আমাকে তুমি কিনে নেবে? আমায় তুমি সদাচার শেখাতে আসবে? কোনও ছেলে যদি হোস্টেলের বাইরে তার গার্ল ফ্রেন্ড নিয়ে বেড়ায়, তাতে তোমার নিষেধ করতে আসার কী রাইট আছে?
.
ব্যাপারটা ঘটেছিল এই।
কোন মাস্টার নাকি দেখেছিলেন, হোস্টেলের একটি ছেলে রাস্তায় তার এক গার্ল ফ্রেন্ড নিয়ে হি-হি হো-হো করে বেড়াচ্ছে।
ক্লাস কামাই করে না অবশ্য, ছুটির দিনে।
ব্যস, তিনি গেলেন নাক গলাতে। তিনি ছাত্র-জীবনের আদর্শ, হোস্টেলের ডিসিপ্লিন, এইসব নিয়ে এলেন লেকচার ঝাড়তে! তারপর তাঁকে বুঝতে হবে না, সাপের ল্যাজে পা দিলে কী হয়?
সব ছাত্র এককাট্টা হয়ে মাস্টারকে পেড়ে ফেলবে না?
তাও যদি হাতে-পায়ে পড়ত তো হত। তিনি গেলেন সুপারিন্টেন্ডেন্টকে জানাতে।
খেপবে না ছেলেরা?
ভাঙবে না কলেজের চেয়ার টেবিল যন্ত্রপাতি? যা নিয়ে কাজ করে নিজেরা। সেইসব জিনিসই ভেঙে তছনছ করে ছাড়ল।
সুপারিন্টেন্ডেন্টও তেমনি বুন্ধু, তুই না হয় মেটাবার চেষ্টা কর? তা নয় তিনি পুলিশ ডাকলেন।
ব্যস্ তার পরিণতি এই।
ছাত্ররাও অবশ্য আহত হয়েছে।
পুলিশের লাঠিতে হয়েছে।
কিন্তু পুলিশ আহত হয়েছে থান ইটে। আর মাস্টাররা আহত হয়েছেন চেয়ার-টেবিল থেকে।
কমলাক্ষ ছিল দল-নেতাদের একজন, তাই তার মাথায় একটা লাঠি না পড়ে যায়নি। কিন্তু তাতে সে কেয়ার করে না। সে বাবার কথায় সজোরে প্রতিবাদ করে,নিশ্চয়ই অন্যায় হয়েছে মাস্টারের। স্টুডেন্ট বলে কেউ নাবালক নয়। তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপারে তুমি মাথা গলাতে আসো কেন?
বোকামি করলে, তার প্রতিফল তো পেতেই হবে।
সরোজাক্ষ আস্তে বলেন, হোস্টেলের ছেলেদের নৈতিক চরিত্র সম্পর্কে শিক্ষকদের কোনও দায়িত্ব নেই?
থাকবে না কেন? আছে। কোনও ছেলে যদি রাত দশটার পর হোস্টেলের বাইরে থাকে, সে সম্বন্ধে হোস্টেলের আইনের প্রশ্ন তুলে কথা বলার দায়িত্ব বা রাইট আছে। তা ছাড়া কখনওই নয়।
সম্পর্কটা কি শুধুই আইনের? ভাল-মন্দের দায়িত্ব বলে কিছু নেই? সরোজাক্ষ শিথিল গলায় বলেন, কোনও ছেলে যদি হোস্টেলের বাইরে গিয়ে মদ খায়, শিক্ষকের চোখে পড়লে কিছু বলতে পারে না?
হোস্টেলের বাইরে? কমলাক্ষর মুখে মৃদু একটু হাসির আভাস ফুটে ওঠে, কষ্ট করে বাইরে যাবে কেন? ভেতরেই তো যথেষ্ট চলছে।
সরোজাক্ষ অবোধ বইকী!
বিশুদ্ধ গলায় যাকে বলে ন্যাকা। তা নইলে সরোজাক্ষ একথায় এত মর্মাহত হন? তাই সরোজাক্ষ বিহ্বলদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন ছেলের দিকে। যেন বুঝতে পারছেন না ও কী বলছে।
কমলাক্ষ বাপের এই মর্মাহত অবস্থা কি বুঝতে পারে না? তবু সে যেন বাপের মোহভঙ্গ করতেই নির্মম হয়।
তাই বেপরোয়া গলায় বলে, অবাক হচ্ছেন? আপনারা নেহাত ভাল ছেলে ছিলেন, আর চিরকাল বাড়ির মধ্যে মানুষ হয়েছেন, তাই পৃথিবীটাকে দেখবার সুযোগ পাননি। নইলে মদ জিনিসটা কবে ছিল না? কবে না খেয়েছে মানুষ? স্টুডেন্টরাও ছেড়ে কথা কয়নি। পুরনো কালের হোস্টেলের সঠিক ইতিহাস দেখুন তো!
তবে হ্যাঁ, আগে লোকে অনেস্ট কম ছিল, লুকিয়ে খেত, এখন লোক অনেস্ট হয়েছে, অত লুকোচুরি করে না। হোস্টেলের অধিকাংশ ছেলেই তো মদ খায়। এবং চাকফির মতো প্রকাশ্যেই খায়।
সরোজাক্ষ ছেলের দিকে নির্নিমেষে তাকিয়ে বলেন, তুমিও বোধ হয় সেই অধিকাংশের মধ্যেই পড়ো?
আমি?
কমলাক্ষ ব্যান্ডেজ বাঁধা মাথাটাই ঝাঁকিয়ে বলে, যদি বলি পড়ি না, হয়তো আপনি বিশ্বাস করবেন না। তবে বিশ্বাস করলে বলব, পড়ি না। কারণটা নীতিগত কিছু নয়, ও আমার ভাল লাগে না। তবে যারা খায়, তাদেরও এমন কিছু মহাপাতকী মনে করি না। ওটা আজকাল এত সাধারণ ব্যাপার হয়ে গেছে। ছেলেরা তো দূরস্থান, বলে মেয়েরাই
এবার একটু চুপ করে যায় কমলাক্ষ।
বোধ হয় মনে করে, বাবার পক্ষে একটু ওভারডোজ হয়ে যাচ্ছে।
সরোজাক্ষর মাথাটা আবার ঝুঁকে পড়ছে কেন? রক্তচাপে? না অন্য একটা চাপে? তাঁর নিজেরই বাড়িতে অধিক রাত্রে কোন নাটক অভিনয় হবে, সেটা স্মরণ করে?
কমলাক্ষ তো দেখবে সেই নাটকের অভিনয়। কমলাক্ষ তো দেখেনি ইতিপূর্বে।
কিন্তু আশ্চর্য, সরোজাক্ষ তাঁর ওই বেহেড পুত্রবধূকে ঘৃণার চক্ষে দেখেন না। সরোজাক্ষ যেন তাকে মমতার চক্ষে দেখেন, দেখেন করুণার চক্ষে।
তবু সরোজাক্ষর মাথা ঝুঁকে পড়ল, হয়তো সরোজাক্ষ ভাবলেন, এ প্রসঙ্গ আমি তুললাম কোন মুখে?
কমলাক্ষ চলে গেল ভিতরে।
ফুর্তিবাজ ছেলে, ওর মনে কোনও ভার দাঁড়াতে পায় না।
ও মীনাক্ষীকে দেখতে না পেয়ে, তার খোঁজ করতে গেল।
কিন্তু মীনাক্ষী কোথায়?
মাকে কাকি-দিদার আগমনবার্তা জানিয়েই সে হাওয়া হয়ে গেছে।
৪. সংসারের ঘটনা
বিজয়াই ছেলেকে নিয়ে বসলেন।
সংসারের ঘটনা পুঙ্খানুপুঙ্খ জানিয়ে আক্ষেপ করলেন। সরোজাক্ষ যে বিজয়ার উপর শত্রুতা সাধতেই চাকরি ছেড়ে সংসারটাকে ভাসাতে বসেছেন, সেকথাও বলতে ছাড়লেন না।
