কমলাক্ষও সেই সুরে বলে, কাকি-দিদাই ঠিক ধরেছেন। ওই শেষেরটা।
মারামারি? রাস্তার ছেলেদের মতন মারামারি করে কপাল ফাটালি তুই? বিজয়া ঘৃণা ধিক্কার আর ব্যঙ্গে গঠিত একটা সুরে পুনরায় চেঁচিয়ে ওঠেন, চমৎকার! এই একটা ছেলেই বাকি ছিল, সেও বাড়ির ধারা রাখছে। মহাপুরুষ বাপের মহৎ শিক্ষার ফল। বলি কী নিয়ে কার সঙ্গে করলি এসব?
বউদি, সারদাপ্রসাদ ধমকের গলায় বলে, সেই ইতিহাস একটু পরে শুনলে মহাভারত অশুদ্ধ হবে যাবে না। এখন ছেলেটাকে দেখুন শুনুন!
বিজয়াকে ধমক দিয়ে কথা একমাত্র সারদাপ্রসাদই বলতে পারে।
বিজয়া একটু দমে যান।
বলেন, আমি আর কী দেখব! তোমরাই দেখো। ডাক্তারকে খবর দাও।
ডাক্তার!
কমলাক্ষ হইহই করে ওঠে, দরকার নেই বাবা, দরকার নেই। হসপিটালের ডাক্তার দেখেছে, বেঁধেছে, ঠিক হয়ে গেছে। ব্যাপারটা উড়িয়ে দেবার ভঙ্গিতে বলে ওঠে কমলাক্ষ, বাড়ির আসল মানুষটাকে দেখছি না কেন? বিচ্ছুবাবু?
বিচ্ছু নামটা কমলাক্ষরই দেওয়া। এবং কাকুর সঙ্গেই তার ভাব ছিল সবচেয়ে বেশি। কিন্তু এখন রীতিনীতি পালটেছে।
কমলাক্ষ বাড়ি ছাড়া, নীলাক্ষ আর বউদি সুনন্দা ছেড়েছে তাদের পূর্ব নীতি। হয়তো বা সব কিছু নীতিই।
অথচ কীসের জন্যে কে কী ছাড়ছে বোঝা যাচ্ছে না।
বিজয়া কিন্তু এই অবকাশে সুযোগ ছাড়েন না। বিজয়া বলে ওঠেন, তোর জানা সংসারের ভোল এখন অনেক বদলে গেছে, বুঝলি? ভাইপোকে দেখতে ইচ্ছে হলে এখন হয় তার ইস্কুলে যেতে হবে, নয় তার মামার বাড়ি।
কমলাক্ষ অনেকদিন আসেনি, পর পর দুটো ছুটিতে ক্যাম্পে যেতে হয়েছিল তাদের, তাই ঈষৎ অবাক হয়ে বলে, হঠাৎ এ ব্যবস্থা?
দুদিন থাকলেই বুঝতে পারবি। তোর বউদি তো এখন ছেলেকে বাপের বাড়িতে রেখে পার্টিতে নাচতে যাচ্ছে।
বাঃ বাঃ, শুনে বড় আহ্লাদ হচ্ছে।
সরোজাক্ষ স্থিরদৃষ্টিতে স্ত্রীর দিকে তাকান।
হৈমবতী অস্বস্তি বোধ করেন।
হৈমবতী বলেন, আমি এখন যাই সরোজ আর তারপরই বোধ করি এই হঠাৎ চলে যাওয়ার অস্বস্তি কাটাতে বলেন, কমল, তুই তো এখন আছিস? একটু ভাল হলে যাস একদিন। শুনব তোর বীরত্বের কাহিনী।
তার আগেই শুনবেন–কমলাক্ষ হেসে হেসে বলে, কাগজেই দেখতে পাবেন। এমন একখানা জোরালো ঘটনা কি আর কাগজে না বেরোবে? খড়গপুর টেলজিক্যাল স্কুলে ছাত্র-বিক্ষোভ। শিক্ষকগণ প্রহৃত, পুলিশ ও ছাত্রের মধ্যে সংঘর্ষ, উভয় পক্ষে আহতের সংখ্যা বাইশ, তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।অবশ্য তার দুজনই পুলিশ। থান ইটের ব্যাপার তো!
দিব্য হেসে হেসে বলে কমলাক্ষ!
যেন ব্যাপারটা কিছুই নয়।
যেন হাসিরই কথা, তাই হেসে হেসে বলছে।
অতএব বলতে পারা যায়, বাড়ি থেকে অনেক দূরে থেকেও এ বাড়ির আর-এক ছেলেরও ভোল পালটেছে। মারামারি করে মাথা ফাটিয়ে এসে লজ্জা পাচ্ছে না সে। লজ্জা পাচ্ছেনা শিক্ষককে পিটিয়ে, পুলিশকে হটিয়ে।
হৈমবতী চলে গেলেন।
বিজয়া ব্যস্ত হয়ে বলতে গিয়েছিলেন, তোমার জন্যে চায়ের জল চড়িয়েছে, তোমার জন্যে খাবার আনতে গেছে
হৈমবতী হেসে কমলাক্ষর গায়ে একটু হাত বুলিয়ে বলে যান, আমার ভাগটা আমার নাতি খাবে।
বিজয়া পাশ কাটান।
হাসপাতালের ব্যান্ডেজ, অনায়াসে ছুঁয়ে চলে গেল বিধবা মানুষ।
মার চেয়ে দরদ!
বিজয়ার কি ইচ্ছে হচ্ছিল না, ছেলের গায়ে-মাথায় হাত বুলোতে? কিন্তু ব্যান্ডেজের জাতটা দেখতে হবে না?
চমৎকার দেশটি হল আমাদের! বলে সারদাপ্রসাদও আবার মাথায় তেল ঘষতে ঘষতে চলে যায়। সারদা আর হৈমবতী চলে যেতে সরোজা আস্তে বলেন, এগুলোর কি খুব দরকার ছিল?
কমলাক্ষ মাস্টার পিটিয়ে আর মাথা ফাটিয়ে এসে, হেসে ওড়াবার চেষ্টা করলেও, বাবার মুখোমুখি একটু আড়ষ্ট হয়। তবু সহজ গলায় বলতে চেষ্টা করে, পরিস্থিতি শুনলে আপনিই বুঝবেন দরকার ছিল কিনা।
সরোজাক্ষ ঈষৎ দৃঢ় গলায় বলেন, আমার পক্ষে হয়তো বোঝা শক্ত। কারণ আমাদের আমলে দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা ছিল। তবু জিজ্ঞেস করি কত খারাপ পরিস্থিতি হলে তুমি আমায় ধরে ঠেঙাতে পারো?
ও আবার কী কথার ছিরি! বিজয়া বিরক্ত গলায় বলেন, কমল, তুই চলে আয়। হাত-মুখ ধুবি, খাবি।
তুমি যাও, ও যাচ্ছে–সরোজা বলেন, আমার প্রশ্নের উত্তরটা তোমায় দিয়ে যেতে হবে কমল! আমি কতটা গর্হিত আচরণ করলে তুমি আমায় ধরে মারতে পারো?
কমলাক্ষর অবশ্য কথাটার অন্তর্নিহিত অর্থটি বুঝতে দেরি হয় না, তবু সে পাশ কাটাতে বলে, হঠাৎ একথাটা বলছেন কেন?
কেন বলছি, সেটা বোঝবার মতো ক্ষমতা অবশ্যই তোমার হয়েছে। চিরদিন এই শিক্ষাই তো পেয়ে এসেছ শিক্ষক পিতার তুল্য!
কমলাক্ষ এবার উদ্ধত গলায় বলে, আপনাদের আমলের ওসব আদর্শ আর চলবে না বাবা! তখন ব্যাপারটা উভয় পক্ষেই ছিল। শিক্ষক শিক্ষকের মতো ব্যবহার করতেন।
সেই কথাই তো জানতে চাইছি, কতদুর গর্হিত কাজ করেছেন তাঁরা যে, ধরে মারতে হয়?
খুব চটপট বলল না অবশ্য কমলাক্ষ, তবে জেরার মুখে বেরোলো ঘটনার ইতিহাস।
এধরনের জেরা সরোজাক্ষ জীবনে করেন না ছেলে-মেয়েদের। যখন ওরা ছোট ছিল, ছোটখাট খুঁটিনাটি নিয়ে বিজয়া জেরা করতে বসতেন, সরোজাক্ষর কানে গেলে বিরক্ত হতেন। বলতেন,ওতে ওদের অসহিষ্ণু করে দেওয়া হয়, ভীরু করে দেওয়া হয়, মিথ্যে কথা শেখানো হয়। ছেড়ে দাও।
কিন্তু আজ হঠাৎ সরোজাক্ষ নিজেই ব্যাপারটাকে ছেড়ে দিলেন না। যেন কেমন এক কৌতূহল, আর জিজ্ঞাসু চিত্ত নিয়ে জানতে চাইলেন। যেন দেখতে চান এই জগতের আর কোথায় কী ঘটছে, তার সঙ্গে মিলিয়ে দেখবেন নিজের অবস্থা।
