স্বভাবগত দ্রুতভঙ্গিতে প্রায় চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কথাগুলো বলে নেন বিজয়া, মাঝখানে বাধা দেবার অবকাশ না রেখে।
কথার শেষে আর বাধা দেবার প্রবৃত্তি থাকে না সরোজাক্ষর।
সন্দেহ নেই, ইচ্ছে করেই এই কথাগুলো হৈমবতীর সামনে উচ্চারণ করে নিলেন বিজয়া, তাতে আর সন্দেহ নেই।
কারণ হৈমবতী ভদ্র সভ্য সুরুচিসম্পন্না। কারণ হৈমবতী সরোজাক্ষর শ্রদ্ধেয় প্রিয়জন। অতএব এই কুরুচিপূর্ণ কথাগুলো বিজয়ার মুখ থেকে হৈমবতীর সামনে উচ্চারিত হলে সরোজাক্ষ মরমে মরে যাবেন। বলে নিয়ে বিজয়া যেন বিজয়গর্বের উল্লাস অনুভব করেন।
নাও, এখন কোথায় মুখ লুকোবে লুকোও?
খুব যে দুজনে মুখোমুখি হয়ে বসে উচ্চাঙ্গের কথাবার্তা হচ্ছিল, ঘরের মধ্যে তোমার কোন উচ্চবস্তুর চাষ হচ্ছে দেখে যাক শৌখিন খুড়ি!
আজ বাদে কাল বাড়ি বাঁধা দিতে হবে, গয়না বেচতে হবে। এই তো সংসারের অবস্থা। উনি পুরুষ–পরম-পুরুষ সেজে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছেন। চিরকাল নিজে মহৎ হলেন, সংসারকে তাকিয়ে দেখলেন না। তাই অমন গুণনিধি ছেলে, তাই অমন বেলেল্লা বউ। হচ্ছে–আরও একটি মুগুর তৈরি হচ্ছে তোমার জন্যে, ওই তোমার ছোট কন্যেটিই তোমার মান সম্ভ্রম চ্যাপটা করে দেবেন, দেখতে পাচ্ছি দিব্যচক্ষে। দি দি না, তাই চাই আমি। সমাজে তোমার মুখটা ভাল করে পড়ুক। উচ্চলোকে বসে নিম্নলোককে ঘেন্না করার ফল ফলুক। মেয়ে যখন হাড়ি-ডোমের গলায় মালা দেবে, তখন আমার নাম কেউ তুলতে আসবে না, তোমার নামেই টি-টি পড়বে।
চিন্তা বাতাসের চেয়েও দ্রুতগামী।
সরোজাক্ষর ওই মরমে মরে-যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে হিংস্রপুলকে মুহূর্তে এতগুলো কথা ভেবে নিলেন বিজয়া।
হয়তো এমনিই হয়। যে ঘরটা ভালবাসার বাসা হবার কথা, সে ঘরটা শূন্য পড়ে থাকে না। ঘরটা দখল করে নেয় ঘৃণা, দখল করে নেয় হিংস্র আক্রোশ। তাই ভাইয়ে-ভাইয়ে পিতা-পুত্রে স্বামী-স্ত্রীতে যদি ভালবাসার ঘাটতি ঘটে, তো বহিঃশত্রুর চাইতে অনেক বেশি তীব্র হয়ে ওঠে পরস্পরের হিংসা আক্রোশ ঘৃণা।
কিন্তু কথাগুলো মনে মনে বলেছেন বিজয়া, তাই তৎক্ষণাৎ মুখে বলে উঠতে পারেন, যাক ওসব কথা। ঘরের কেলেঙ্কারি বলবার নয়, তবে তুমিও ঘরেরই লোক তাই বললাম গো খুড়ি! যাক দেখো যেন পাঁচ কান না হয়।
পাঁচ কান!
হৈমবতী হেসে বলেন, নাঃ, সে ভয়টা অন্তত কোরো না।
সরোজাক্ষ আরও মরমে মরেন।
সরোজাক্ষ অনুভব করেন বিজয়া সেজেগুজে লড়াইয়ে নেমেছে, ওকে এখন বকে দমানো যাবে না। সরোজাক্ষ কিছু বলতে গেলে বিজয়া আরও অপদস্থ করে ছাড়বেন স্বামীকে। অনেক সময় জ্বালাতুনে ছোট ছেলেমেয়েদের মধ্যে দেখতে পাওয়া যায় এই প্রবৃত্তি। বাইরের লোকের সামনে বাড়ির লোককে অপদস্থ করতে পারলে আর কিছু চায় না তারা।
কিন্তু বিজয়া কি ছোট বাচ্চা?
বিজয়ার হিংস্রতাটা কি কেবলমাত্র জ্বালাতন বলে স্নেহের কোপ দেখিয়ে উড়িয়ে দেওয়া যায়?
হৈমবতী সরোজাক্ষর মনের ভাব পাঠ করতে পারেন। তাই সহাস্য-সপ্রতিভতায় বলে ওঠেন, তা কী হল বউমা; তোমার ঠাকুরের প্রসাদ-টসাদ কই? বার করো? আর একটু চা খাওয়াও। তর্ক করে গলা শুকিয়ে গেছে।
সরোজাক্ষ কৃতজ্ঞচিত্তে এই করুণাময়ীর দিকে তাকান, সরোজাক্ষর বুঝতে বাকি থাকে না বিজয়াকে অন্য কাজে অন্যমনস্ক করার তাল হৈমবতীর।
বিজয়া কিন্তু এ ফাঁদে পা দেন না। বিজয়া অম্লান গলায় বলেন,ঠাকুরের প্রসাদ? সে আর তোমার মতন মেম-শাশুড়ির জন্যে কি আর আনতে সাহস করি? চাকরকে দোকানে পাঠিয়েছি খাবার আনতে। তোমার তো আর বামুনের ঘরের বিধবার মতন অত শুচিবাই নেই, ওদের দিকের চা-ই করে দিতে বলেছি। এই আনল বলে।
হৈমবতী স্তব্ধ হয়ে যান
হৈমবতী স্বখাত সলিলের চেহারা দেখতে পান। এরপর আর তাঁর বলার উপায় রইল না, খাব না, খিদে নেই।
এরপর বসে বসে শুনতেই হবে, বেশ আছো বাবা ছোট খুড়ি, বিচার-আচারের বালাই নেই, চাকরবাকর যা দিল খেলে। আমার মতন মরণদশা নেই বাবা তোমাদের।
শুনতেই হচ্ছে, কারণ বিজয়া যেখানে উপস্থিত, সেখানে সকলেরই শ্রোতার ভূমিকা হতে বাধ্য। বিজয়া যেন অন্য সকলের সমস্ত সূক্ষ্ম কোণ আর মিহি ধার ভোঁতা পাথরে শান দিয়ে ক্ষইয়ে দিতে চান।
সরোজাক্ষ কি প্রার্থনা করছিলেন একটা দুর্বিপাকও ঘটুক, যাতে বিজয়ার কথা থামে? আর সরোজাক্ষর বিধাতা শুনতে পান সে প্রার্থনা এবং মঞ্জুরও করেন?
তাই কথার মাঝখানে দুগ্রহের আবির্ভাব ঘটে।
নীচতলায় কী যেন একটা হইচই ওঠে, তারপর সিঁড়িতে জুতোর শব্দ। সেই শব্দছন্দের শেষ যতিতে এসে দাঁড়ায় সরোজাক্ষর ছোট ছেলে।
হাতে ছোট সুটকেস।
কপালে চওড়া ব্যান্ডেজ।
.
গোলমাল শুনে সারদাপ্রসাদ তেল মাখতে মাখতে চলে এসেছেন। ব্যান্ডেজ দেখে সকলেই শিউরে ওঠে, তবে বিজয়ার মাতৃহৃদয়, তাই বিজয়া চেঁচিয়ে ওঠেন, এ কী কাণ্ড বাবা কমল? কোথায় কী সর্বনাশ ঘটিয়ে এলি?
কমলাক্ষ অগ্রাহ্যভরে উত্তর দেয়, কিছু না বাবা, কিছু না। এমন কিছু মহা মারাত্মক কাণ্ড ঘটেনি। গোটা চার-পাঁচ মাত্র স্টিচ দিতে হয়েছে।
স্টিচ দিতে হয়েছে! হৈমবতী কাছে এসে বলেন, তা হলে তো নেহাত কম লাগেনি। কী হল, পড়ে মাথা ফাটিয়েছ, না মারামারি করেছ?
নাতি সম্পর্কের কৌতুকের ভঙ্গিমাতেই বলেন।
