হৈমবতী ওই অবোধ মানুষটার উত্তেজনায় লাল মুখটার দিকে তাকিয়ে কোমল অথচ ব্যস্ত গলায় বলেন, এসব কথা তোমার মতো এমন করে তলিয়ে তো দেখি না বাপুকখনও, শুনলে মনটা খুব চঞ্চল হয়, কিন্তু তুমি এখন সারাদিন ঘুরে এলে, স্নান করবে, খাবে
আমার স্নানাহার? এর জন্যে কিছু ভাববেন না সারদাপ্রসাদ অধিকতর উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে এবং আরও বেশ কিছুক্ষণ প্রবল বিক্রমে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রাচীন যোগবল সম্পর্কে তুলনামূলক সমালোচনা করে হঠাৎই একসময় বলে ওঠে, নাঃ স্নানটাই সেরে আসি, মাথাটা কেমন ঝাঁ ঝাঁ করছে।
সারদাপ্রসাদ চলে গেলে হৈমবতী করুণার গলায় বলেন, সত্যি সরোজ, কোনওমতে ওর ওই লেখা ছাপিয়ে ফেলা যায় না?
সরোজাক্ষ মৃদু বিষণ্ণ হাসি হেসে বলেন, হাজার কয়েক টাকা খরচ করতে পারলে যায়।
আমার যদি অনেক টাকা থাকত, হৈমবতী বলেন, আমি একজন পাবলিশার হতাম।
সরোজা বলেন, কিন্তু তাতেই কি ওকে আঘাত থেকে বাঁচানো যেত ছোট কাকি? সে আরও বড় আঘাত। এ তো তবু বেচারা জানছে এতবড় একটা কাণ্ড আর কাজ ও কাউকে দেখাতে পাচ্ছে না। তাতে ব্যাকুলতা আছে, আকুলতা আছে, উত্তেজনা আছে, আশাও আছে। অগাধ আশা। যার জোরে ওর এত অ্যাকটিভিটি। কিন্তু তখন? তখন ওই আশাটাই যে ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে। যখন দেখবে ওর গবেষণাগ্রন্থ পড়ে পড়ে পোকার খাদ্য হচ্ছে, তখন ওর ভিতরটাও ঘুণ ধরে ঝরে পড়বে।
সত্যি, কী অবাস্তব একটা নেশার পিছনে ছুটে মানুষটা
সরোজাক্ষ মৃদু গলায় বলেন, পৃথিবীতে কোন্ নেশাটাই বা অবাস্তব নয় বলো? ক্ষমতার নেশা, জয়ের নেশা, একচ্ছত্র নায়কত্বের নেশা, স্বর্ণের নেশা, ধর্মের নেশা, সংসারের নেশাযা কিছুই ছুটিয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে মানুষকে, তার কোন্টাই বা অবাস্তব আশার নয়? মানুষ থাকলেই অন্ধ নেশাও থাকবে। হয়তো ওটাই গতির শক্তি। যেদিন সে টের পায় এতদিন যা নিয়ে বিশ্বজগৎ ভুলে ছুটছিলাম, সেটা স্রেফ শূন্য, তখনই ভেঙে গুঁড়ো হয়ে যায়।
হৈমবতী প্রতিবাদের সুরে বলেন, কিন্তু কখনও কি কারুর সাকসেস হয় না?
আমার তো মনে হয়, না। শ্রীরামচন্দ্র রামরাজ্য গড়েও সুখী হননি।
তবুও বেচারার ওই দুর্দান্ত আশা দেখে মনে হচ্ছিল, একটা বইও ওর অন্তত ছাপা হলে–
নাঃ। তার পরবর্তী যে ভয়ংকর বাস্তব, ও সেটা সহ্য করতে পারবে না।
হৈমবতী ঈষৎ অন্যমনা গলায় বলেন, কিন্তু এদের জন্যে বড্ড মায়া হয়।
সরোজাক্ষ একটু হেসে ফেলে বলেন, সকলের হয় না। যেমন এ বাড়ির গিন্নির!
হৈমবতী সচমকে বলেন, এই সেরেছে! এতক্ষণ যে কথাটা মনেই পড়েনি। কোথায় এ বাড়ির গিন্নি? ইস এতক্ষণ এসেছি, খোঁজ করিনি।
সেটা কোন পক্ষের করণীয় তাই ভাবছি
বাঃ, আমারই। আমি এলাম, যাই দেখি গে—
হৈমবতী উঠে দাঁড়ান।
আর সেই দাঁড়ানোয় বিজয়া বিপদগ্রস্ত হন। ঘরে ঢুকতে এসেও দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন তিনি নিজস্ব নিয়মে। আড়ি পেতে অপরের কথা শোনা তাঁর একটি প্রিয় কাজ, কিন্তু সেটা প্রকাশ হয়ে পড়াটা বাঞ্ছনীয় নয়। তাই তিনি সহসা একটুকু সরে গিয়ে সিঁড়িতে গলা বাড়িয়ে অদৃশ্য কাউকে উদ্দেশ করে বলে ওঠেন,আচ্ছা আমি যাচ্ছি, তুমি ততক্ষণ ওটা সেরে ফেলল।
তারপর সাহস করে ঘরে এসে ঢোকেন।
আর যেন এইমাত্র জানলেন, এমন ভঙ্গিতে বলে ওঠেন,ছোট খুড়ি যে? কতক্ষণ?
বিজয়ার বাপের বাড়িতে কাকিকে খুড়ি বলা রেওয়াজ, তিনি সেটাই চালান।
হৈমবতী অপ্রতিভ গলায় বলেন, এই তো খানিকক্ষণ। তুমি বুঝি পুজো করছিলে?
পুজো? বিজয়া একটি উচ্চাঙ্গের হাসি হেসে বলেন,পুজো আর কী, পুজো-পুজো খেলা। তবু এই জঞ্জালের জগৎ থেকে খানিকটা সরে যাওয়া।
একথার আর উত্তর কী?
হৈমবতী চুপ করে থাকেন।
বিজয়া নিজেই আবার পূর্বকথা ভুলে গিয়ে বলেন, এসেছ, তা জেনেছি অনেকক্ষণ। মীনা গিয়ে খবর দিয়ে এসেছে। তবে ভাবলাম, আমি আর সাততাড়াতাড়ি নেমে কী করব? বিদুষী খুড়ি, বিদ্বান ভাশুরপো, তাদের বড় বড় কথার মধ্যে আমি গিয়ে বসব, হংস মধ্যে বক! তার চেয়ে থাক। আগে তোমরা প্রাণভরে গপো করে নাও, তারপর যাব। বিজয়ার মুখে একটুকরো কুটিল হাসি।
হৈমবতীর কিছু অজানা নয়, বিজয়াকে তিনি যথেষ্ট চেনেন। তবু সরোজাক্ষ হৈমবতীর উপস্থিতিতে বিজয়ার স্বরূপের এই নির্লজ্জ উদঘাটনে একেবারে অবিচলিত থাকতে পারেন না।
সরোজাক্ষ বলে ওঠেন, বড় বড় কথা না জানলেই যে ছোট কথা কইতে হবে, এমন কোনও আইন আছে কি?
বিজয়া মূর্খ হলেও বোকা নয়। বিজয়া এ ধরনের কথার উত্তর জানেন, এবং তা প্রয়োগও করেন। বলেন, ছোট মনের মানুষ, ছোট কথা ছাড়া আর কোথায় কী পাব বলো? তা হলে বোবা হয়ে থাকতে হয়। তা তাই তো আছি। তোমাদের এই বড় মনের বাড়িতে বোবা হয়েই বসে আছি। ছেলে তার বউকে নিয়ে গিয়ে সভার মধ্যে বাইজি নাচ নাচাচ্ছে, বউ মদ খেয়ে বেহুঁশ হয়ে বাড়ি ফিরছে, মেয়ে একটা শূদুরের ছেলের সঙ্গে মাখামাখি করে আখের খোওয়াতে বসেছে, আর কর্তা বিজয়া গলার সব বিষটুকু নিঃশেষে ঢেলে বলেন, আর কর্তা ঘরে ভাঁড়ে মা ভবানী জেনেও, তেজ করে চাকরি ছেড়ে দিয়ে ভোলানাথ হয়ে বসে থেকে বড় বড় কথার চাষ করছেন, বড় বড় বই পড়ছেন, আর এই ছোটলোক মেয়েমানুষটা টাকার কথা বলতে এলেই তাকে ঘেন্না করছেন। তবু তো কথাটি কইছি না–বোবা হয়ে বসে আছি!
