কিন্তু তুমিই তো বলো সারদা, ছাপাখানা ছিল না বলেই আমাদের অনেক কিছু চিরতরে খোয়া গেছে। সরোজাক্ষ বলেন, ছাপা জিনিসের একটা আধটা কপিও কোথাও পড়ে থাকে।
সারদা উত্তেজিত থেকে উত্তেজিততর হয়। বলে, বলেছিলাম, বলেও থাকি। কিন্তু এইসব অসভ্য লোকেদের ব্যবহারে মেজাজ খাপ্পা হয়ে যায়, বুঝলেন? বলে কিনা, বুঝলাম না একদা আমাদের এই মহান ভারতবর্ষে বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষ হয়েছিল এবং আপনি তা প্রমাণ করেও ছেড়েছেন, কিন্তু সে প্রমাণে এখন কী ঘণ্টা হবে বলতে পারেন? এখন তো পরের দরজায় হাত পেতে বসে আছি, কতবড় মুখর মতো কথা বলুন? হাত পেতে বসে আছি বুদ্ধির দোষে আর কপাল-দোষে। তা বলে চির ভিখিরি যে ছিলাম না, সেটুকুও বোঝাতে হবে না পৃথিবীকে?
সরোজাক্ষ ওই উত্তেজিত মুখের দিকে তাকিয়ে ব্যথিত হন, তবু সে ভাব গোপন রেখে উৎসাহের গলায় বলেন, তা তোমার সেই থিসিস কি শেষ হয়ে গেছে নাকি?
শেষ!
সারদাপ্রসাদ যেন একটা অর্বাচীনের কথা শুনল, এইভাবে মুরুব্বির ভঙ্গিতে বলে ওঠে, শেষ কি দাদা? ওটা তো ফার্স্ট ভলম! এখনও ওইরকম নটা ভল্যুম হবে। অবশ্য হয়েই আছে একরকম। মানে খুচরো খুচরো কাগজে নোট করা আছে, সেগুলোই একবার গুছিয়ে
হৈমবতী সারদাপ্রসাদের গবেষণার বিষয়বস্তু জানেন। হৈমবতী এও বোঝেন, সরোজাক্ষর এখন ওই অবোধ লোকটার সঙ্গে মনের ভাব গোপন করে কথা চালাতে কষ্ট হচ্ছে, তাই হৈমবতীই হাল ধরেন, বলেন, তা একেবারে দশখণ্ডই শেষ করে ছাপালে হত না সারদাপ্রসাদ?না হলে এতে জিনিসটা সম্পর্কে ওদের ধারণা স্পষ্ট হবে না।
হ্যাঁ আমিও ভেবেছিলাম তাই সারদাপ্রসাদ হঠাৎ কেমন অন্যমনস্ক গলায় বলে, কিন্তু ভেবে দেখছি, এখন থেকেই চেষ্টা করা দরকার যাতে তখন চট করে মার্কেটটা ক্রিয়েট করা যায়। তা যাক–
সহসাই আবার সারদাপ্রসাদ নিজস্ব উত্তেজিত ভঙ্গিতে ফিরে আসে। বলে, ওর জন্যে ভাবি না। একবারেই হাল ছাড়বে এমন পাত্তর সারদাপ্রসাদ নয়। আমি বলে যেই মনে হল ঠিক লেখা হচ্ছে না, অমনি খাতাকে খাতা ছিঁড়ে কুচিকুচি করে আবার নতুন করে লিখতে বসি।সব পাবলিশারই কিছু আর গোলা লোক নয়, বিদ্বান বুদ্ধিমান কালচার্ড লোকও আছে এই লাইনে। যাব তাদের সন্ধান জেনে। তখন বুঝলেন কাকিমা, পড়তে পাবে না। বিষয়টা যে ভয়ানক দামি। মনে করুন না কেন– আজ আমরা ও-দেশে হৃদবদল-এর খবর শুনে উধ্ববাহু হয়ে নাচছি, অথচ ওটা ছিল আমাদের এই দেশে। রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ, উপপুরাণ দেখুন হাঁটকে, সব পাবেন। মৃতদেহে প্রাণসঞ্চার, একের দেহ থেকে অন্য দেহে প্রাণ ট্রান্সফার, ইচ্ছেমতো যে কোনও মানুষের বা যে কোনও প্রাণীর দেহ ধারণ, চির-যৌবন, অন্যের যৌবন আকর্ষণ করে নিজের শরীরে স্থাপন, কী নয়? বললে ফুরোবে না কাকিমা। এখানে এসে দুমাস থাকুন, একে একে নজির ধরে ধরে দেখিয়ে দেব।
দুমাস? হৈমবতী হেসে ফেলেন।
সারদাপ্রসাদ উদ্দীপ্ত কণ্ঠে বলে, দুমাস বলে আপনি ঘাবড়াচ্ছেন কাকিমা, ওটা তবু আমি কম করেই বললাম। দু মাসেও কুলোয় কিনা সন্দেহ। কত আছে, যা আপনার এ যুগের বিজ্ঞান এখনও স্বপ্নও দেখছে না। হৈমবতী হেসে বলেন, তা কবিকল্পনাও তো ছিল কিছু? যেমন সত্যযুগের মানুষ একুশ হাত লম্বা ছিল।
সারদাপ্রসাদ হঠাৎ যেন ধসে পড়ে! ছি ছি, আপনি এই কথা বললেন কাকিমা? অথচ আমি আপনাকে না–এটা আপনি বলবেন না। একুশ হাত মানুষ ছিল না কী বলছেন? তা হলে বলুন পৃথিবীতে অতিকায় হাতি, অতিকায় জিরাফ, অতিকায় কুমির কিছুই ছিল না? অবিশ্বাসের কী আছে বলুন। তাদের সঙ্গে খাপ খাইয়ে থাকত। প্রকৃতির কাজই তো হচ্ছে অ্যাডজাস্ট করে চলা। পৃথিবীতে যখন দেদার জায়গা ছিল, তখন বৃহৎ প্রাণী ছিল, মানুষ তাই বৃহৎ ছিল। ক্রমশ পৃথিবীতে জায়গা কমতে শুরু করল, মানুষের সংখ্যা বেড়ে যেতে শুরু করল, ব্যস, প্রকৃতি অমনি মানুষের মাপ কমাতে শুরু করল। এখন আপনাদের সংখ্যাতত্ত্ববিদরা বলছেন–এরপর আর পৃথিবীতে মানুষ ধরবে না। দেখবেন ঠিকই ধরে যাবে। তখন মানুষ লিলিপুট বা বুড়ো আঙুল হয়ে যাবে। তা এখন থেকেই তার কাজ শুরু হয়ে গেছে। প্রথমে মন নিয়ে শুরু হয় কিনা। দিনের পর দিন তাই মানুষের মন ছোট হয়ে যাচ্ছে। আরও ছোট হয়ে যাবে, তারপর দেহগুলোই ছোট হতে থাকবে। তা হলেই বলুন একুশ হাতে অবিশ্বাস কীসের?
হৈমবতী এই অভিনব মতবাদের বহরে কষ্টে হাসি গোপন করে বলেন, তা হয়তো সত্যি। তবে গুজব বলেও তো একটা জিনিস আছে? মনে করো সেই সত্য থেকে কলি, এই চার যুগ ধরে সেই গুজবের বাড় বৃদ্ধি হয়ে চলেছে
সারাদাপ্রসাদ এবার গম্ভীর হয়।
বলে,আপনিও যদি একথা বলেন তো নাচার। তবে সাহেবরা যখন গবেষণা করে ওইসব দেখিয়ে দেবে, তখন আমরা বাহবা দিয়ে বলব। কী আশ্চয্যি। কি অদ্ভুত, কী মজা! তখন আর অবিশ্বাস করব না।
হৈমবতীর অবশ্য মুখে আসছিল, চোখে দেখলে আর অবিশ্বাস করা যায় কী করে? কিন্তু বললেন না। হৈমবতী অনুপ্তের ভূমিকা নিলেন। বললেন, তা যা বলেছ। ভেবে দেখলে তাই। একসময় যে এই প্রাচ্যভূমি জ্ঞানে-বিজ্ঞানে পৃথিবীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ ছিল, তার প্রমাণ নেই তাও নয়।
সেই তো, সেই কথাই তো বলে মরছি জীবনভর– সারদাপ্রসাদ হৃষ্টচিত্তে বলে, আপনি একটা কথাতেই বুঝলেন, স্বীকারও করলেন, কিন্তু আর কেউ কানই দিতে চায় না। অরণ্যে রোদন করে মরি বেনাবনে মুক্তো ছড়াই। অথচ তলিয়ে দেখতে পারলেই বোঝা যায়। এই যে, শ্রীকৃষ্ণ একমুঠো বেনাঘাস তুলে ছুঁড়ে মারলেন, আর সেগুলো লোহার মুষল হয়ে গিয়ে যদুবংশ ধ্বংস করল, কী এটা? আমি তো বলব স্রেফ আণবিক বোমার ব্যাপার, একবার নিক্ষেপেই বংশকে বংশ লোপাট।অথচ যেহেতু আমাদের নিজেদের দেশের ইতিহাসে রয়েছে সেই হেতুই ধরে নিতে হবে ওসব রূপক, গুজব, কবিকল্পনা।না না এটা ঠিক নয়।–এই যে সেদিন মীনাক্ষীকে বোঝাতে গেলাম, বল জিনিসটা আর কিছুই নয় বাপু, স্রেফ গাছের অংশ থেকে তৈরি আর্ট সিল্ক বা রেয়ন সিল্ক। তা শুনে মেয়ে একেবারে হেসেই অস্থির। একই জিনিসের নাম যেমন ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় বিভিন্ন, তেমনি ভিন্ন ভিন্ন কালেও অনেক সময় বিভিন্ন হয়ে যেতে পারে, একথা মানে না। যাক গে ওর জন্যে ভাবি না। সত্য কখনও চিরদিন আবৃত থাকে না, এই সারদাপ্রসাদের গবেষণার ফল একদিন ভারতকে পৃথিবীর দরবারে শ্রেষ্ঠ আসন দেবে কিনা দেখবেন। আধুনিক বিজ্ঞান যতই অগ্রসর হোক, তাকে মাথা হেঁট করে বলতেই হবে, প্রাচীন ভারতবর্ষের যোগবলের কাছে এখনও আমরা অ আ ক খর ছাত্র, আর ওই যোগবলটিই হচ্ছে বিজ্ঞানশক্তি।
