আমরা হয়তো একটা নির্বিচার পূজার মন্ত্রেই দীক্ষিত ছিলাম তাই! এ-যুগ ওই নির্বিচার পূজায় বিশ্বাসী নয়। গুরুজন বলেই তিনি শ্রদ্ধাভাজন একথা এ-যুগ মানে না।
বিচার করতে বসলে বিচারের শেষ কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, সেটা আমাদের মতো মুখ মানুষের চেয়ে পণ্ডিত মানুষ তোমরাই ভাল বুঝবে। আর সেটা চিরকালই আছে। ঠগ বাছতে গাঁ উজাড়–এটা নেহাত এ-যুগের কথা নয়। বুঝলাম নির্বিচারে মানবে না, কিন্তু বিচার করবারও একটা অধিকার থাকা দরকার নয় কি? বিচারবুদ্ধিটা না জন্মাতেই যদি বিচারকের ভূমিকা নিয়ে বসে
সরোজাক্ষ একটা নিশ্বাস ফেলেন।
কারণ সরোজাক্ষ নিজেও একথা বেশ কয়েকদিন ধরে ভেবেছেন। ভেবেছেন ওরা অর্বাচীন। ভেবেছেন ওরা উত্তপ্ত মস্তিষ্ক হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। তবু বিবেক সুস্থির হতে দেয়নি। তবু মনে হয়েছে, এ সমস্তই আমাদের ত্রুটির ফল। আমাদের গলতি। আমাদের অক্ষমতার নিদর্শন।
অনেক ভেবে ভেবে তবেই না
সরোজাক্ষ নিশ্বাস ফেলে বলেন, নাঃ ছোট কাকি, তবু বলব এ-যুগের চোখ কান অনেক খোলা।
হৈমবতী তর্ক করেন না। প্রতিবাদও না।
হৈমবতীও একটা নিশ্বাস ফেলে বলেন, কী জানি, খোলা, না অন্য এক মোহ-আবরণে ঢাকা। আমি তো দেখি মস্ত এক খেলার আড্ডায় ও বেচারিরা নেহাতই দাবার খুঁটি, রঙের তাস। ওদের নিয়ে চলছে বিরাট জুয়াখেলা। আর ওরা হতভাগারা ভাবছে–আমরাই হারছি জিতছি, দান পাচ্ছি! বেচারিরা জানেও না–নাইকো পাশার ইচ্ছা স্বাধীন যেই নিয়েছে খেলার ভার, ডাইনে বাঁয়ে ফেলছে তারে যখন যেমন ইচ্ছা তার। আর এও বোঝে না বাক্সবন্দি সব পুনরায় সাঙ্গ হলে খেলার জের। রাজা যুধিষ্ঠির খেলার নেশায় উন্মত্ত হয়ে সর্বস্ব খুইয়ে শেষে আপন স্ত্রী-পুত্রকে বাজি ধরেছিলেন, এ-নেশা এমনই সর্বনেশে!–এ-যুগের দাবায় যুধিষ্ঠিররা মানব সভ্যতার ভবিষ্যৎকে বাজি ধরছে।
সরোজাক্ষ একটু চুপ করে থেকে অন্যমনস্কের গলায় বলেন, কে জানে এ থেকে অন্য এক নতুন সভ্যতার জন্ম হবে কি না। যা নির্ভুল, যা নিখুঁত।
নির্ভুল! হৈমবতী মৃদু হাসেন। বলেন, প্রকৃতির সৃষ্টিতেই ভুলের শেষ নেই, খুঁতের শেষ নেই, আর মানুষের সৃষ্টি নির্ভুল হবে? হয়তো হবে একটা ভুলের বদলে আর একটা ভুল। হয়তো একটা খুঁতের বদলে আর একটা খুঁত!
প্রকৃতি তো অন্ধ।
মানুষই বুঝি চক্ষুম্মান?
মানুষের চিন্তাশক্তি আছে।
মানুষ তাই ভাবে বটে–হৈমবতী সহজ সুরে হেসে ওঠেন, সত্যি সে শক্তি থাকলে ভাবত না পৃথিবীতে শুধু একা আমিই থাকব, আর কেউ থাকবে না।
মানুষ সম্পর্কে অনেক ভাবো তো দেখছি
ভাবতে হবে কেন? চোখের উপর জাজ্বল্যমান তো। ওই ভাবনাতেই মানুষ প্রতিজ্ঞা করে বসে নিঃক্ষত্রিয় করিব পৃঙ্খী–ওই ভাবনাতেই যুগে যুগে কুরুক্ষেত্র কাণ্ড ঘটায়, ওই ভাবনাতেই সমস্ত কল্যাণবোধ বিসর্জন দিয়ে দাবার ছক পেতে বসে। কিন্তু থাক বাবা এসব দার্শনিক আলোচনা, এখনই তর্ক বেধে যাবে। আর পণ্ডিতেমূর্থে তর্ক বাধলে ব্যাপার সুবিধের হবে না। তার চাইতে যা বলতে এসেছি বলি–আমায় যে সেই বই দুটো দেবে বলেছিলে, কই দিলে না?
হৈমবতীর ডিগ্রী-টিগ্রীর বালাই নেই, তবু হৈমবতী সরোজাক্ষর পাঠোপযোগী শক্ত শক্ত ইংরিজি বইয়ের গাদা পার করেন। এটা একটা বিরক্তিকর ব্যাপার বইকী! অন্তত বিজয়ার কাছে তো বটেই।
বিজয়া অবশ্য ওই পার করাটায় তেমন বিশ্বাসী নয়। বলেন, পড়ে না, হাতি! তোমার কাছে কায়দা দেখায়।
সরোজাক্ষ এধরনের কথার উত্তর বড় দেন না, একদিন বলেছিলেন, তাতে ওঁর লাভ?
আহা, তুমি অবাক হবে, তুমি বাহবা দেবে, সেইটাই পরম লাভ।
সরোজাক্ষ আর কথা বলেননি! চুপ করে গিয়েছিলেন। আজও হৈমবতীর কাছে একটু চুপ করে গেলেন। তারপর আস্তে বললেন, ওটা কলেজ লাইব্রেরি থেকে এনে দেব ভেবেছিলাম। আচ্ছা আমি ব্রিটিশ কাউন্সিল থেকে এনে দেব।
আরে বাবা তাড়ার কিছু নেই– হৈমবতী লজ্জিত গলায় বলেন, বিদুষী নই যে বইয়ের জন্যে কাতর হব। বেকারের দিন,কাটতেই চায় না, তাই বই বই করে মরি। তবে আপাতত ব্যস্ততা নেই, নতুন করে আবার কালী সিংহীর মহাভারত পড়ছি—
এই সেরেছে! সরোজাক্ষ ঈষৎ কৌতুকে বলেন, সারদার কানে গেলে আর রক্ষে নেই–
হৈমবতী কী একটা বলতে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ ঘরের বাইরে সারদাপ্রসাদের উদাত্ত স্বর শোনা গেল, সারদার কথা কী হচ্ছে দাদা? আরে ছোট কাকি যে? কতক্ষণ? খুড়ি ভাশুরপোয় মিলে সারদাবাবুর নিন্দে হচ্ছে তো খুব? বলে হা-হা করে হেসে ওঠে। খুড় শাশুড়িকে অবশ্য প্রণাম করতে আসে না। হৈমবতী হেসে ফেলে বলেন,কেন বাপু, নিন্দে কেন? তুমি কি আমাদের নিন্দের ছেলে?
ঘরে চেয়ার থাকতেও বিছানার একপ্রান্তে বসে পড়ে সারদাপ্রসাদ কোঁচার খুটটা তুলে কপালের ঘাম মুছে বলে, সে আপনারা স্নেহ করে না বললেও, লোকে তো পাগল ছাগল ছাড়া কিছু ভাবে না।
সারদাপ্রসাদ যে বাইরে কোনওখান থেকে ঘুরে এসেছে, তা তার সাজসজ্জায় মালুম হচ্ছে। পরনে ধুতি আর শার্ট হলেও, জিনিস দুটো ধোপদুরস্ত। যেটা দৈবাতের ঘটনা।
সরোজাক্ষর চোখেও ধরা পড়ে দৃশ্যটা। সরোজাক্ষ মৃদু হেসে বলেন,কে আবার ওকথা বলতে গেল তোমায়?
আপনি বাদে সবাই বলে, সারদাপ্রসাদ বেশ উদাত্ত গলায় বলে, বলবে, এখন বলবে। দেশটি যে আমাদের চিতায় মঠ দেবার। এই তো গিয়েছিলাম এক পাবলিশার মহাপ্রভুর কাছে। এমন একটা ভ্যালুয়েবল ম্যানাস্ক্রিপট নিয়ে গেছি, একবার দেখলও না। যেন দেখলেও পয়সা খরচ হয়ে যাবে। সাবজেক্ট ম্যাটার বোঝাতে গেলাম, তা এমন উপহাস্যি করে কথা বলল, যেন একটা সত্যি পাগল গেছি আমি। বলে কী জানেন? আমরা মশাই ক্ষুদ্র প্রাণী, দুটো গল্প উপন্যাস বেচে খাই, আমাদের কী সাধ্য যে এই মূল্যবান গ্রন্থ প্রকাশ করি। আপনি বরং আপনার ওই মহার্ঘ পাণ্ডুলিপিটি রাশিয়ায় পাঠিয়ে দিন, ওরা দরের জিনিসের কদর বুঝবে। শুনুন! শুনলে কী মনে হয়? যত সব ভুষিমাল এসে বইয়ের ব্যবসা ফেঁদে বসেছে, ধান চাল লোহা-লক্কড়ের থেকে অধিক মূল্য দিতে জানে না। আমি বলব, বরং যখন ছাপাখানা ছিল না, তখন ছিল ভাল। দামি জিনিসের দাম ছিল। সারদার স্বর উত্তেজিত।
