খুড়-শাশুড়ির উপর যেন তাঁর একটা জাতক্রোধ।
এখন না হয় বিধবা হয়েও বিধবার আচরণ সম্যক পালন করেন না বলে রাগ, কিন্তু যখন মহিলাটি সধবা ছিলেন? তখনও তো রাগের কমতি ছিল না।
কাকি- দিদা এসেছেন।
ঠাকুরঘরে গিয়ে জানিয়ে এল মীনাক্ষী।
বিজয়া মুখটা বাঁকিয়ে জোরে জোরে মালা ঘোরাতে লাগলেন।
মীনাক্ষী আবার বলল, শুনতে পেলে? কাকি-দিদা এসেছেন।
এসেছেন তো কী? নাচতে হবে?
বিজয়া নিমপাতা খাওয়া মুখে মালাটা কপালে ছোঁয়ালেন।
নাচবে কি কাঁদবে, তা তুমিই জানো মীনাক্ষী বলে, খবর না দিলেও তো বলবে, নীচে কত ঘটনা ঘটে যায়, কত লোক আসে যায়, আমি টেরও পাইনা। দাসীর মতন এক পাশে পড়ে আছি, ছো করে একটু খবরও দিতে আসে না। বলে গেলাম, এখন তোমার ফুরসত হয় নেমো, না হয় নেমো না।
চলে যায় মীনাক্ষী।
বিজয়া জ্বলন্ত চোখে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলেন, কথা দেখো মেয়ের! যেন মিলিটারি! মার সঙ্গে কথা বলছে, না বাড়ির ঝিয়ের সঙ্গে কথা বলছে বোঝবার জো নেই। আছে, কপালে তোমার অশেষ দুর্গতি আছে। একটা দজ্জাল শাশুড়ির হাতে পড়বে তুমি, এ আমি দিব্যচক্ষে দেখতে পাচ্ছি। তখন ওই খরখরানি বেরিয়ে যাবে। উঠতে বসতে কাঁদতে হবে।
বিজয়া এখনও দুই মেয়ের দজ্জাল শাশুড়ির হাতে পড়ে উঠতে বসতে কাঁদবার স্বপ্ন দেখেন। বিজয়ার এখনও মুখস্থ আছে–
হলুদ জব্দ শিলে,
চোর জব্দ কিলে,
দুষ্ট মেয়ে জব্দ হয়
শ্বশুরবাড়ি গেলে।
ওই প্রবাদের ছড়াটা যে সমাজ অনেকদিন হল ভুলে গেছে এটা খেয়াল করেন না বিজয়া। আর খেয়াল করেন না এই অভিশাপ বাণীটি যার উদ্দেশ্যে বর্ষিত হল সে তাঁরই সন্তান।
তা খেয়াল বস্তুটা সংসারে দুর্লভ বইকী! কজনেরই বা যথাযথ থাকে ওটা? খাম-খেয়ালেরই
সেই খামখেয়ালের একটি নমুনাসরোজাক্ষর চাকরি ছাড়ার সংকল্প, আর তার কারণ।
অপমান সয়ে থাকতে পারলাম না–এর পিছনে তবু একটা যুক্তি আছে। একটা বলিষ্ঠ পৌরুষের প্রকাশ আছে। কিন্তু সরোজাক্ষর ভাষ্যটা যে উদ্ভট!
ওই অপমানের ধাক্কায় হঠাৎ তিনি নাকি অনুভব করলেন, এতদিন ছাত্রদের ঠকিয়ে পয়সা নিয়ে এসেছেন! অতএব অনুভব করে ফেলে আর সেটা চালিয়ে যেতে বিবেকে বাধছে।
খাম-খেয়ালের নজির ছাড়া আর কী?
প্রকৃষ্ট নজির।
আরে বাবা, এ-যুগের ছেলেগুলি যে এক-একখানি বিষ্ণুর অবতার, সেটা দেখতে পাচ্ছ না? দেখতে পাচ্ছ না শুধু তোমার পাড়াটি নয়, তোমার দেশটি নয়, দেশে-বিদেশে, সমগ্র পৃথিবীতে ওই ছেলেগুলোই আগুন জ্বালিয়ে বেড়াচ্ছে?
রাবণের অনাচারে খেপে উঠে লঙ্কা দহনের সংকল্পে ওরা ল্যাজে আগুন বেঁধেছে।
তাতে রাবণের লঙ্কা ধ্বংস হচ্ছে কিনা রাবণই জানে, তবে তাদের নিজেদের ল্যাজগুলো যে পুড়ছে তাতে সন্দেহ নেই, সেই পোড়া ল্যাজের দহনে মুখও পুড়ছে বাছাদের।
মুখ তারা নিজেদের তো পোড়াচ্ছেই, পোড়াচ্ছে আরও অনেক কিছুই। পোড়াচ্ছে সভ্যতা, সংযম, আদর্শ, চক্ষুলজ্জা, লোকলজ্জা, মায়া-মমতা, শালীনতা, সৌকুমার্য। কে জানে এই ধ্বংসস্তৃপের উপর কোন স্বর্গ রচনার স্বপ্ন দেখছে ওরা?
না কি স্বপ্ন-টপ্ন কিছু নেই ওদের। শুধু হঠাৎ হাওয়ার সুযোগ নিয়ে নিজেদের সমস্ত ক্রটি, নিজেদের সমস্ত দৈন্য ঢাকা দিতে চাইছে দাবির লড়াইয়ের ছদ্মবেশ দিয়ে।
তা নইলে ক্ষেত্ৰ-অক্ষেত্র মানছে না কেন ওরা? প্রয়োজন-অপ্রয়োজন মানছে না কেন? কারণে-অকারণে যেখানে-সেখানে আর যখন-তখন আগুন জ্বেলে তুলছে কেন? অর্থাৎ আসল লক্ষ্য ওই জ্বালাটাই।
নাঃ, লঙ্কা দহনে মন নেই বাপু ওদের, আপন আপন হৃদয়ের দাহ নিবৃত্ত করতেই ছটফটিয়ে বেড়াচ্ছে। যা-তা করছে।
তা নইলে সরোজাক্ষর মতো চিরশান্ত চিরসৌম্য অধ্যাপককে ঘেরাও করে বসে অপমান করে?
কিন্তু মহৎ প্রাণ সরোজা ওদের দোষ দেখছেন না, দোষ দেখছেন নিজের। তবে কেন বলা যাবে না জগৎ সংসারে খেয়ালের চেয়ে খাম-খেয়াল বেশি?
হৈমবতীও মৃদু হেসে বলেন, লোকে কিন্তু তোমাকে খামখেয়ালি বলে বদনাম দিচ্ছে।
হৈমবতী এ প্রসঙ্গ তুলতে আসেননি।
হৈমবতী এসেছিলেন সরোজাক্ষর কাছে কয়েকটা বই নিতে। তবু উঠে পড়ল প্রসঙ্গটা।
বলতে কী সরোজাক্ষই উঠিয়ে ফেললেন।
হৈমবতী এসে ঘরে ঢুকতেই সরোজাক্ষর মুখটা খুশিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিল, সেই খুশি-খুশি মুখেই হেসে বলে উঠলেন, কী, তুমিও কি এক-পালা উপদেশ বর্ষণ করতে এলে? কিন্তু দোহাই তোমার, আর যে করে করুক তুমি কোরো না।
হৈমবতী প্রথমটা বিস্মিত হলেন, কারণ হৈমবতীর স্মরণে ছিল না সরোজাক্ষর উপর একহাত নেওয়ার একটি সুযোগ এসেছে।
তবু একটু থতমত খেয়েই বুঝে নিলেন ব্যাপারটা। আর সঙ্গে সঙ্গে হেসে বললেন, কেন, আমি নয় কেন? আমি তোমার গুরুজন না? উপদেশ বর্ষণের রাইট অবশ্যই আছে আমার।
সব সময় সব রাইট প্রয়োগ করতে নেই।
বাঃ সুযোগ পেলে কে ছাড়ে? লোকে তোমায় খাম-খেয়ালি বলে বদনাম দিচ্ছে তা জানো?
লোকে দিচ্ছে! তুমি তো দিচ্ছ না? মৃদু হেসে বলেন সরোজাক্ষ।
বা রে, আমিই বা নয় কেন? আমি কি তোক ছাড়া?
খুব শান্ত গলাতেই বলেন, তবু হৈমবতীর মুখে একটি সরসতার উজ্জ্বল দীপ্তি ফুটে ওঠে।
সরোজাক্ষ হেসে বলেন, আমার তো তাই ধারণা।
ভুল ধারণা! আমি ওই লোকেদেরই দলে। আমিও তো বলছি এটা তোমার খাম-খেয়াল! আমি ওদের ঠকিয়ে খাচ্ছিলাম হঠাৎ এমন একটা দৃঢ় ধারণা করে বসবার মানে হয় না। তোমরাও একদা ছাত্র ছিলে এবং তোমাদের যাঁরা শিক্ষক ছিলেন তাঁরা সকলেই কিছু মহাপুরুষ ছিলেন না, খুঁজলে তাঁদের বিরুদ্ধেও অনেক তথ্য বেরোতে পারে, তবু তোমরা এখনও তাঁদের নামে সশ্রদ্ধ হও, এখনও কারও সঙ্গে দেখা হয়ে গেলে স্যার!বলে বিগলিত চিত্তে আভূমি প্রণিপাত করো। করো না কি?
