দিবাকরের ভিতরটা জ্বলে-পুড়ে যাচ্ছিল।
দিবাকরের ইচ্ছে হচ্ছিল ওই নাক-উঁচু মেয়েটাকে ধরে একেবারে ছিঁড়েখুঁড়ে শেষ করে দেয়। মেয়েমানুষ মেয়েমানুষের মতন থাক, তা নয়, নিজে তেড়ে এসেছেন বিয়ের ফয়সালা করতে! এতদিন ধরে এত কষ্ট করে নিজেকে লোকসমাজে চরে বেড়াবার মতো একটা পরিচয় বানিয়েছিলাম, উনি এসে তাকে তছনছ করে নিলেন। …উঃ! ভাবলে আমার জ্ঞান থাকছে না। আমার যে কী পোজিশান, তা সবাইকে বলে বেড়াবে নিশ্চয়। আমাকে বিয়ে করার বাসনাটা তো উপে গেল, বলে বেড়াতে আর আপত্তি কী?
…গরিব আমি চিরদিন থাকব না, তোদর মতো বড়লোকের নাকে ঝামা আমি ঘষব, এই আমার প্রতিজ্ঞা, তা সে যে কোনও পথেই হোক।… টাকা তো পৃথিবীর ধুলোয় পড়ে আছে, সেই ধুলো কুড়োতে পারলেই হল। শুধু একটু বিদ্যে করে নেওয়া দরকার। ভেক না হলে হয় না। তোদের ওই পণ্ডিত সমাজে, সভ্য সমাজে চরে বেড়াতে না পারলে তো প্রতিষ্ঠা নেই, তাই এমনি করে কুকুরের মতো পড়ে আছি প্রকাশ মণ্ডলের বেয়াদপ চাকরের ঘরে। গিন্নির আদুরে চাকর, তাই তার এত দাপট! সেই হতভাগাই বোধ হয় আমার নামে যা-তা বলেছে। আচ্ছা, এইসা দিন নেহি রহেঙ্গা।
মনের কথা কেউ টের পায় না, তাই মানুষের পৃথিবীটা আজও চালু আছে। নচেৎ কবেই ধ্বংস হয়ে যেত।
কিন্তু মন বস্তুটা বায়ুশূন্য কৌটোয় রক্ষিত, ওর থেকে আওয়াজ বেরিয়ে ছড়ায় না। তাই ওই কটুক্তিগুলোর মানসিক উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে দিবাকর মুখে নভঙ্গিতে উচ্চারণ করে, মীনাক্ষী, আসবে তো আমাদের কুঁড়েঘরে?
মীনাক্ষী দ্বিধাগ্রস্ত হয়, কিন্তু গিয়ে কী হবে বলতে পারো?
দিবাকরের বিস্ফারিত ধরনের চোখদুটো মলিন হয়, কিছু না মীনাক্ষী, শুধু আমার মাকে একবার তোমায় দেখাব। আমার মতো হতভাগারও যে একটা ঐশ্বর্য থাকতে পারে শুধু সেইটুকুই
কিন্তু কী বলব বাড়িতে?
যা হোক। যা তোক একটা কিছু বোলো। একটা রাত, লোকে তো বন্ধু বান্ধবের বিয়েতেও বাইরে কাটাতে পারে।
রাত। মীনাক্ষীর চমকে ওঠাটা অস্পষ্ট থাকে না। রাত কেন?
তা ছাড়া তো সুবিধেমতো আর কোনও ট্রেন নেই।…মেদিনীপুর স্টেশনে নেমে তেরো মাইল গোরর গাড়িতে যেতে হয়। চলো মীনাক্ষী, শুধু আমার মাকেই নয়, এই বাংলাদেশটার সত্যিকার চেহারাও একবার দেখবে চলো।
দিবাকরের কণ্ঠে তার স্বভাববিরুদ্ধ আবেগ ফোটে।
আর সেই তার সর্বদা প্রজ্বলিত ভঙ্গির জায়গায় এই নম্র বিষণ্ণ আবেগকম্পিত ভঙ্গিটা নতুন একটা আকর্ষণ এনে দেয়।
মীনাক্ষী রাজি হয়।
মীনাক্ষী এবার এগিয়ে গিয়ে বাস-এ চড়ে। দেখতে পায় না পেছন থেকে দুটো জ্বলন্ত গোলক তাকে ভস্ম করবার ভঙ্গিতে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
.
যদি মীনাক্ষী আজ এই দুঃসাহসিক অভিযানে পা না বাড়াত, হয়তো মীনাক্ষীর জীবন সম্পূর্ণ অন্যরকম হত।
যদি আজ ফেরবার সময় তার জীবনের রাহুর সঙ্গে দেখা হয়ে না যেত, হয়তো মীনাক্ষীর জীবন অন্য মোড় নিত না। কিন্তু মীনাক্ষী দুঃসাহসের পথে পা বাড়িয়েছিল, মীনাক্ষী নির্বুদ্ধিতার ফাঁদে গলা দিতে রাজি হয়েছিল।
আর মীনাক্ষী চলতে চলতে পিছন ফিরে তাকাতে ভুলে গিয়েছিল।
তাকালে হয়তো ওই জ্বলন্ত গোলকদুটোই ওকে সাবধান করে দিত।
.
সরোজাক্ষর বেশি অসুখের সময় পর পর কদিন তাঁকে দেখতে এসেছিলেন কাকিমা হৈমবতী দেবী। কতদিন যেন পরে আজ আবার এলেন এবাড়িতে।
প্রায় সমবয়েসী এই ভাসুরপোটির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক একাধারে স্নেহের, শ্রদ্ধার, বন্ধুত্বের, তথাপি এ-বাড়িতে তিনি কদাচই আসেন।
হৈমবতী সুন্দরী নন, কিন্তু সুশ্রী।
এই শ্রী তাঁর সর্বাঙ্গে দীপ্যমান।
সুষমা শব্দটির যে অর্থ, সেটা নতুন করে উপলব্ধি হয় হৈমবতাঁকে দেখলে। এই প্রৌঢ় বয়েসেও তাঁর আপাদমস্তক একটি ছন্দোময় সুষমায় মন্ডিত। দেখলে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে, দেখলে সম্ভ্রম জাগে।
হালকা-পাতলা ছোটখাটো চেহারা, কিন্তু তাতে তারল্য নেই, আছে একটি মার্জিত গাম্ভীর্য। অথচ ব্যবহারিক অর্থে গম্ভীর তিনি আদৌ নন। কথায় ধার আছে, কৌতুক আছে, সৌন্দর্য আছে।
হৈমবতী এসে বসলে, তাঁকে ঘিরে যেন আপনিই একটি উজ্জ্বল পরিমণ্ডল গড়ে ওঠে। হৈমবতী এসে বসলে মনে হয় একটি নির্মল পরিচ্ছন্নতা প্রতীক হয়ে দেখা দিল।
হৈমবতীর প্রতি এ বাড়ির সকলেই আকৃষ্ট, বাদে বিজয়া।
বিজয়া হৈমবতীর আচার-আচরণ সব কিছুকেই নিচু চোখে দেখেন।
হৈমবতী যে বিধবা হয়েও বডিস-ব্লাউজ পরেন, হৈমবতী যে বিধবা হবার পর চুল কেটে ফেলেও সেই চুলে স্যাম্পু করে মুখে তরুণীর শ্রী ফোঁটান, হৈমবতীর চশমা চটি ভ্যানিটি ব্যাগ সব কিছুতেই যে শৌখিন রুচির ছাপ, এটা বিজয়া একেবারে বরদাস্ত করতে পারেন না। আর সেই না-পারাটা চাপতেও চেষ্টা করেন না।
হয়তো সেইটাই হৈমবতীর এবাড়িতে বেশি না আসার কারণ। নচেৎ স্বামীর সম্পর্কের আত্মীয় তো তাঁর আর বেশি নেই। দূর-সম্পর্কিত একটি বেকার ভাগ্নে আছে, সেইটিই হৈমবতীর কর্ণধার।
কিন্তু সে যাক–আজ হৈমবতী তাঁর স্বামীর সম্পর্কিত আত্মীয়-ভবনে বেড়াতে এলেন।
সরোজাক্ষর ছেলেমেয়েরা কেউ হৈমবতাঁকে ঠাকুমা বলে না, বলে কাকি দিদা। এই অদ্ভুত ডাকটি সরোজাক্ষই তাঁর বড় ছেলের শৈশবকালে আমদানি করেছিলেন, পর পর আর নিজনও তাই শিখে গেছে।
বিজয়া এতেও ন্যাকামি দেখেন। ঠোঁট উলটে বলেন,আদিখ্যেতা!ছোট ঠাকুমা বলবে, ফুরিয়ে গেল ন্যাঠা! তা নয় সৃষ্টিছাড়া এক ডাক কাকি-দিদা! ঠাকুমা ডাকলে বুড়ি হয়ে যাবেন যে! চিরযুবতী থাকবেন উনি।
