থামো। নাটক রাখো- মীনাক্ষী রূঢ় গলায় বলে, যে দারিদ্রটা প্রকাশ হয়ে পড়েছে দিবাকর, সেটা তোমার চরিত্রের। অবস্থার দারিদ্র্য লজ্জার নয়, চরিত্রের দারিদ্রই লজ্জার।
অবস্থাই চরিত্রকে মুচড়ে দুমড়ে বিকৃত করে ফেলে মীনাক্ষী! ওই যে আমি মামার বাড়িতে থাকি, প্রতিক্ষণ কি মনে হয় না এই গ্লানি থেকে মুক্ত হই, কিন্তু কী করব? যতদিন কলেজে পড়তে হবে, ততদিন এইভাবে কুকুরের মতো পড়ে থাকতে হবে।
মীনাক্ষী মলিন হয়। বলে, বুঝতে পারছি তোমার দেশের জমিদারির গল্পও আরব্য উপন্যাসের গল্প। কিন্তু এ আমি কোনও যুক্তিতেই বরদাস্ত করতে পারি না দিবাকর! এরপর আর তোমার কোন কথাটা বিশ্বাস করতে পারব আমি?
দিবাকর মাথা হেঁট করে।
দিবাকর আস্তে বলে, তোমার সঙ্গে আমার সামাজিক অবস্থার আকাশ-পাতাল তফাত, অথচ তোমার কাছে পৌঁছবার দুর্দমনীয় বাসনা, তাই মিথ্যের সিঁড়ি দিয়ে আকাশে উঠতে চেয়েছিলাম। যাক, শিক্ষা হয়ে গেল। হয়তো জীবনে আর দেখা হবে না, এই শেষ। আচ্ছা চলি।
মীনাক্ষী ক্রুদ্ধ গলায় বলে, এই শেষ, জীবনে দেখা হবে না, এসব কথার মানে কী? বিষ খাবে? না গলায় দড়ি দেবে?
ভাবছি।
ন্যাকামি রাখো। তোমার ওই অদ্ভুত মামার বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করো। জোচ্চুরি ধাপ্পাবাজি ছেড়ে মানুষের মতো মানুষ হবার সাধনা করো।
ততদিন কি তুমি আমার জন্যে বসে থাকবে মীনাক্ষী?
দিবাকরের স্বর করুণ।
এ যেন আর এক দিবাকর।
মীনাক্ষীর মমতা আসে উদ্বেল হয়ে।
মীনাক্ষীর বুকের মধ্যেকার সেই চিরন্তন নারী অপরাধীকে ক্ষমা করে বসে। মীনাক্ষী ওর ওই ম্লান কণ্ঠ, বিষণ্ণ মুখ, আর অপরাধী দৃষ্টিকে বিশ্বাস করে বসে। তাই বলে,আচ্ছা, সে দেখা যাবে। তুমি ওখানটা ছাড়বার চেষ্টা করো তো।
মীনাক্ষী ভাবে ওখানটা ছাড়লেই বুঝি দিবাকর সুন্দর হয়ে উঠবে, সত্যের মর্যাদা দিতে শিখবে।
মীনাক্ষী, তা হলে একবার তোমাকে আমার মার সঙ্গে দেখা করতে হবে। আমি আমার মাকে তোমায় দেখাব।
তোমার মা? তিনি তো দেশে থাকেন শুনলাম। অথচ তুমি দিনের পর দিন
আমি হাতজোড় করে ক্ষমা চাইছি মীনাক্ষী, আমি কান মলছি—
থাক, থাক, রাস্তার মাঝখানে আর সিন করতে হবে না। তবে তোমার সঙ্গে দেখা হল তাই। দেখা না হলে হয়তো জীবনে আর তোমায় ক্ষমা করতে পারতাম না।
দিবাকরও সেটা বুঝতে পারে।
দিবাকর কিছুক্ষণ আগে যে দেখা হওয়াটায় আড়ষ্ট হচ্ছিল, এখন সেটাকে ভাগ্যের দান মনে করে। নিজের অভিনয় ক্ষমতার উপর ওর অগাধ আস্থা। যখন যেমন দরকার, চালিয়ে নিতে পারবে। এতদিন মীনাক্ষীকে ডাউনকরে এসেছে, এখন অবস্থা বুঝে সম্পূর্ণ উলটোপথ ধরছে।
এখন দেখছে ওকে আয়ত্ত করবার অন্য পথ আবিষ্কার করতে হবে। মোটকথা, একবার জব্দ করে ফেলতে পারলেই এইসব সতী প্যাটার্নের মেয়েদের কজায় আনা যায়।
রাস্তায় দাঁড়িয়ে এতক্ষণ কথা চালিয়ে যাওয়া এ পাড়ায় দৃষ্টিকটু। এ দক্ষিণ কলকাতা নয় যে, বিকেল থেকে রাত দুপুর পর্যন্ত পথে শুধু যুগল মূর্তি দেখতে পাওয়া যায়। যাদের ভঙ্গিতে থাকে–এই দাঁড়িয়ে দুটো কথা বলছি, এখুনি ছাড়াছাড়ি হবে। কিন্তু ঘণ্টা, দু ঘণ্টা সেই অবস্থাই চলতে থাকে।
এখানে পথচারীরা বারবার তাকাচ্ছিল।
তবু দিবাকর হেস্তনেস্তটা করে নিতে চায়। তার সেই দীনহীন গ্রামে, ততোধিক দীনহীন কুটিরে তার দীনদুঃখী মা-টিকে একবার দেখাতে চায় মীনাক্ষীকে।
মীনাক্ষী শুধু তার বড়লোক আত্মীয়দেরই দেখল, যাদের মধ্যে শুধু অহংকার, শুধু নীচতা। কিন্তু দিবাকরের সেই পর্ণকুটিরবাসিনী মা?
না, নিজমুখে তার কথা আর বলবে না দিবাকর।
বলেছে, অনেক বলেছে। মায়ের গল্প কেন করত তা বলেছে
কিন্তু কেন জানো মীনাক্ষী দিবাকর উদার উদাস স্বপ্নালু গলায় বলে, আমি যে মায়ের কাছ থেকে অনেক দূরে পড়ে আছি, আমার যে মনের কথা বলবার কেউ নেই, এটা ভাবতে ইচ্ছে করে না। তাই–দিবাকর চুপ করে যায়।
এবং শেষ পর্যন্ত মীনাক্ষীকে বাক্যদত্ত করিয়ে নেয়, কোনওমতে একটা দিনের জন্যে সুযোগ সৃষ্টি করে দিবাকরের সঙ্গে দিবাকরের গ্রামে যাবে।
বাংলাদেশের হতভাগ্য গ্রামকে একবার চোখে দেখাও দরকার মীনাক্ষী দিবাকর জোরালো গলায় বলে,দেখতে পাবে আসলে আমরা কী! আসলে আমরা কোথায় পড়ে আছি। যে শহরটাকে দেখে গর্বে পুলকিত হয়ে ভাবি আমরা কত এগিয়ে গেছি, সেই শহরটা এই বিরাট দেশের কতটুকু অংশ? বললে বিশ্বাস করবে, এখনও আমাদের গ্রাম এবং তার মতো হাজার গ্রাম মোটরগাড়ি কেমন তা চোখে দেখেনি? ইলেকট্রিক আলো তাদের কাছে রূপকথার গল্প। লক্ষ লক্ষ লোক রেলগাড়ি চড়ার স্বপ্ন দেখতে দেখতে বুড়ো হয়ে মরে যায়। স্নানের জন্যে যে আলাদা একটা দরজা বন্ধ ঘর থাকতে পারে, এ তারা কেউ জানে না। জানে না–অসুখ করলেই তখুনি ডাক্তার পাওয়া যায়।…
দিবাকর একটু দম নেয়।
কিছুদিন আগে রাস্তায় দাঁড়িয়ে শোনা কোনও এক সমাজসেবীর মেঠো বক্তৃতার খানিকটা ঝাড়া মুখস্থ বলে ফেলতে পেরে রীতিমত পুলকিত হয় দিবাকর।…এ ধরনের কথাগুলো যে তার পূর্বমতের বিরোধী তা খেয়াল করে না।
খেয়াল মীনাক্ষী করে।
ওর দম নেওয়ার অবসরে বলে, সেকথা তো আমিও বলি। তুমিও তো কেবল আমাদের সমাজের অন্ধতা আর কুসংস্কার নিয়ে সমালোচনা করো। আর ও-দেশ দেখাও। আমিই বলি ও-দেশের সঙ্গে পাল্লা দিতে আমাদের যতকিছু পুরনো সংস্কার ভেঙে ফেলার লড়াইয়ে যদি জিতেই যাও তোমরা, তোমাদের সেই প্রগতির রাজ্যটা ভোগ করবে কাদের নিয়ে? ওই তোমার লক্ষ লক্ষ অবোধ অজ্ঞান হতদরিদ্র দেশবাসীই তো তোমার সম্বল? সংস্কারমুক্তির সংগ্রাম নিয়ে কত মাথাব্যথা হবে তাদের, যাদের পেটের ভাতের সংস্থান নেই? তুমিই লম্বা লম্বা কথা বলে আমায় ডাউন করে ফেলতে চাও। তুমিই বলো সতীত্ব, পবিত্রতা এইসব শব্দগুলো পুরুষের অধিকার রক্ষার সুবিধেয় তৈরি। আসলে একেবারে মানেহীন। মেয়ে-পুরুষের সমান অধিকার থাকা উচিত। নিজের সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অধিকার। কিন্তু নিজেই দেখাচ্ছ দেশের এই অন্ধকার ছবি। অধিকার শুধু দিলেই হয় না। অধিকার বোধটা জন্মাবার শিক্ষাও দিতে হয়। না হলে সেটা অস্ত্রশিক্ষা না দিয়ে অস্ত্রের অধিকার দেওয়ার মতোই হবে। কিন্তু থাক, রাস্তায় দাঁড়িয়ে অনেক লেকচার দেওয়া হল। তবে একটা কথা বলে যাচ্ছি, যেটা সব কথার শেষ কথা। ব্লাফ দিয়ে শেষরক্ষা হয় না।
