কথা বলতে বলতে নেমে এসেছে দুজনেই।
মীনাক্ষী নীচের উঠোনে নেমে বলে, আচ্ছা নমস্কার! অনেক উপকার করলেন আমার, তার জন্যে ধন্যবাদ।
বেরিয়ে যায়।
এগোতে থাকে।
সমস্ত শরীর যেন শিথিল হয়ে ধসে পড়তে চায় তার।
পৃথিবীতে যেন বাতাস নেই। আকাশে যেন আলো নেই।
আর কোথাও কোনও আশ্বাস নেই।
দিবাকরকে খুব একটা মহৎ অবশ্য কোনওদিনই ভাবে না সে, তাই বলে এত জোচ্চোর দিবাকর?
এ কী আপনি?
রাস্তার মোড়ে যেন ভূত দেখল দিবাকর। এখানে মীনাক্ষী! তার মানে তাদের বাড়িতেই এসেছিল। তার মানে যা বলেছিল, তাই করে ছেড়েছে। বলেছিল,ঠিক আছে, নিয়ে না যাও, নিজেই যাব।
তা হলেও দিবাকর মীনাক্ষীর সেই সংকল্পটাকে আমল দেয়নি। ভাবেনি সত্যি আসবে।
কিন্তু এখানে ঠিক ওদের বাড়ির মোড়ে আর কোন মহৎ কাজে আসবে মীনাক্ষী?
রাগে সমস্ত শরীর জ্বালা করে ওঠে দিবাকরের। মেয়েমানুষের এত মর্দানি? উঃ! ঠিকানাই বা পেল কোথায়? আর এসে দেখলটা কী?
নির্ঘাত দিবাকরের থাকার জায়গাটা দেখিয়েছে কেউ। নির্ঘাত নবনে বদমাইশ অনেক কিছু গল্প করেছে।… নির্ঘাত মামি আর ব্রজবালা যা-তা প্রশ্ন করেছে।
তার মানে সর্বস্ব ঘুচিয়েছে দিবাকরের।
এখন কোন বালুকণায় এই সমুদ্র বাঁধবে দিবাকর? কোন ছুঁচে রিপু করবে এই প্রচণ্ড গহ্বর?
তা ছাড়া জানাও তো নেই, কতটা কী জেনেছে মীনাক্ষী।
দিবাকরের কতখানি উদঘাটিত হয়েছে।
তুমি এখানে?
এ প্রশ্নের মধ্যে বিস্ময়ের চেয়ে অনেক বেশি ফোটে বিপদে পড়ার সুর।
মীনাক্ষী সেই সুর ধরতে পারবে এটা আশ্চর্যের নয়। মীনাক্ষী তাই দাঁড়িয়ে পড়ে তীব্র ব্যঙ্গের গলায় বলে, বড্ড অসুবিধেয় ফেলে দিলাম, তাই না?
না না, আমার অসুবিধে কী? তোমারই
আমার কথা থাক।মীনাক্ষী ঠিকরে ওঠে,আমার কোনও অসুবিধেই নেই। অসুবিধেটা তোমারই। এতদিন ধরে এত কৌশল করে ধাপ্পার সুতো বুনে বুনে যে মিথ্যের জালটি রচনা করেছিলে, সেটি ছিঁড়ে গেল, তোমার স্বরূপ বেরিয়ে পড়ল, অসুবিধে নয়?
দিবাকর প্রথমটা জাল দিয়ে জল ধরতে যায়, নুন দিয়ে নদী বাঁধতে যায়, দিবাকর তার মিথ্যের জালে নতুন ধাপ্পার সুতো লাগায়, কী হল কী? ব্যাপারটি কী? কার সঙ্গে দেখা হল? বেজায় পাজি একটা চাকর আছে আমাদের বাড়িতে, ইয়ারের রাজা! সে বুঝি কিছু
দিবাকর! মিথ্যের জালে আর নতুন মিথ্যে জুড়ো না। বড় ঘৃণা হচ্ছে। শুধু তোমার উপরই নয়, নিজের উপর, পৃথিবীর উপর।
মীনাক্ষী চলে যেতে উদ্যত হয়।
কিন্তু দিবাকর পথ আগলায়।
দিবাকর কোনওমতে মুখে হাসি টেনে এনে বলে, কিন্তু কী হল সেটা তো বলবে? মামির প্রকৃতিটা অবশ্য ভাল নয়, দুর্বাসার মহিলা সংস্করণ। কিন্তু গালমন্দ খেয়ে এলে বুঝি?
দিবাকর, আর কষ্ট দিও না–মীনাক্ষীর চোখে জল আসছিল, সে জলকে আগুনে পরিণত করে মীনাক্ষী বলে, খড় দিয়ে আগুন ঢাকতে যেও না দিবাকর! হিমালয় পাহাড় ফুয়ে ওড়ানো যায় না। তুমি যে কী, তা ভালই জেনে গেছি আমি।
মীনাক্ষী!
হঠাৎ দিবাকরের মুখের চেহারার অদ্ভুত একটা পরিবর্তন ঘটে। দিবাকরের সেই কাঠ কাঠ আঁট-আঁট মুখটা যেন ঝুলে পড়ে। দিবাকরের পুরু পুরু ঠোঁট দুটো যেন নেতিয়ে পড়ে, দিবাকরের ছোট ছোট করে ছাঁটা চুলগুলোও এলিয়ে যায়।
দিবাকর কাঁপা কাঁপা থরথরে গলায় বলে, জানতাম! আমার এই তাসের অট্টালিকা টিকবে না। কিন্তু কী করব মীনাক্ষী, এ ছাড়া কোনও উপায় ছিল না আমার! জানি আমি ঠগ-জোচ্চোর, মিথ্যেবাদী, কিন্তু এসব কেন জানো মীনাক্ষী? আমি বড় গরিব! রাস্তার ভিখিরিরও অধম। আমার সেই দারিদ্র্যের লজ্জা তোমার কাছে উদঘাটন করতে পারিনি। আমার মনে হয়েছে, এ দিনকে একদিন না একদিন আমি জয় করবই, একদিন আমি মানুষ নামের যোগ্য হব, সেই কদিন শুধু এই পাতার ছাউনিতে মাথা ঢেকে–
মীনাক্ষীর ওই বেদনাকাতর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে, মীনাক্ষীর সেই লোহা হয়ে ওঠা মনটা ঈষৎ নরম হয়, মীনাক্ষী স্থির গলায় বলে, গরিব হওয়াটা অপরাধ নয় দিবাকর!
আমি মনে করি অপরাধ–দিবাকরের ঝুলেপড়া চেহারাটা আবার যেন একটু সতেজ হয়, যেন পায়ের নীচে আবার একটু মাটি পেয়েছে দিবাকর, যে মাটিতে দাঁড়িয়ে আবার বড় বড় কথা বলতে পারবে। বলতে পারবে জোরালো গলায়, আমি মনে করি অপরাধ। কারণ অক্ষমতাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় অপরাধ মীনাক্ষী! আর দারিদ্র্য তো অক্ষমতারই সন্তান।
মীনাক্ষী তবু প্রতিবাদ করে ওঠে, তা হোক দিবাকর, মিথ্যের মতো অপরাধ আর কিছু নেই। আমি ভাবতে পারছি না যে, তুমি দিনের পর দিন এইভাবে মিথ্যের প্রাসাদ বানিয়ে বানিয়ে আমাকে ঠকিয়েছ। মামার বাড়ির চাকর নবীনের সঙ্গে এক ঘরে থাকো তুমি। তোমার মা জীবনে কলকাতায় আসেননি। আর তোমার আত্মীয়রা–
চুপ করে যায় মীনাক্ষী।
গলাটা বন্ধ হয়ে যায় বলেই চুপ করে যায়।
দিবাকরের চোখের তারায় অলক্ষ্যে আগুন জ্বলে। দিবাকরের মুখের পেশিতে যেন একটা মতলবের ভাঁজ পড়ে। কিন্তু দিবাকর রুদ্ধকণ্ঠে বলে, মীনাক্ষী, তুমি যদি একটা সুযোগ আমায় দাও, আমার সমস্ত কথা বলার জন্যে একটুখানি সময়
মীনাক্ষী আবার ক্রুদ্ধ ব্যঙ্গের গলায় বলে, সময়? যাতে আরও একবস্তা ধাপ্পা তৈরি করে ফেলতে পারো?
দিবাকরের মুখের চেহারা আবার দপ করে নিভে যায়। দিবাকর পাকা অভিনেতার মতো সেই নিভে যাওয়া মুখের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখা বিষণ্ণ গলায় বলে, আচ্ছা ঠিক আছে, থাক, জানতাম আমার দারিদ্র্য প্রকাশ হয়ে পড়লেই তুমি আমায় পরিচিতের মর্যাদা দিতে অস্বীকার করবে–
