মীনাক্ষী ইতস্তত করে বলে, খুঁজতে ঠিক নয়, মানে একটু দরকার ছিল। একটা বই দেবার কথা ছিল।
কার কাকে দেবার ছিল, তা অবশ্য বোঝা গেল না।
কুসুমকামিনী কিন্তু বুঝলেন। মুচকি হেসে বললেন, ও সে একই কথা, যার নাম ভাজা চাল তার নামই মুড়ি! খুঁজতে আসোনি, দরকার ছিল! তা ওর কলেজে পড়ো বুঝি?
হ্যাঁ।
কতদিন ভাব?
ভাব।
কতদিনের চেনা নয়, আলাপ নয়, পরিচয় নয়, ভাব।
মীনাক্ষীর মাথা থেকে পা অবধি একটা বিদ্যুৎপ্রবাহ বয়ে যায়। কিন্তু ভাব নেই–এ কথা তো বলা চলে না। কী করতে তবে এসেছে সে?
মীনাক্ষী রুক্ষ গলায় বলে, যতদিন একসঙ্গে পড়ছি।
অ। তা ভাল। তা কোনওদিন তো আসতে দেখিনি। আজ হঠাৎ
বললাম তো একটা বইয়ের দরকার ছিল।
তবে যে নবনে বলছিল, মামাকে চেয়েছ, মামিকে চেয়েছ—
বিপন্ন বোধ করে মীনাক্ষী, বুঝতে পারে, ফাঁদটা নিজেই পেতেছে। অতএব সোজা হতে হবে, শক্ত হতে হবে। ফাঁদে জড়িয়ে পড়া চলে না। অতএব মাথা তুলে বলে, আমার ধারণা ছিল ওঁর মাও এখানে থাকেন, মামার বাড়ি যখন। শুনলাম থাকেন না। কোথায় থাকেন, ঠিকানাটা কী, জানতে চাই।
কুসুমকামিনী এবার শিথিল ভঙ্গি ত্যাগ করে নড়েচড়ে বসেন। তীক্ষ্ণ গলায় বলেন,কেন বলো তো? হঠাৎ ওর মাকে কী দরকার?
আছে দরকার।
কেন? ছোঁড়া কোনও বিপদে-আপদে পড়েনি তো?
না, বিপদ হবে কেন?
তবে বুঝি বে?
ব্রজবালা মুচকি হেসে বলে ওঠে, ও মা, বোধহয় দিবুদার বের ঘটকালি করতে এসেছেন ইনি৷
কুসুমকামিনী নকল ধমকে বলেন, তুই থাম তো বেজো।
বেজো।
তার মানে ব্রজ।
তার মানে ব্রজবালা।
তার মানে ভুল বাড়ি নয়।
অতএব আশার ক্ষীণ শিখাটুকুও নিভে গেল।
মীনাক্ষী বলল, আচ্ছা আমি যাই।
ওমা সে কী! বাড়িতে এয়েছে ভদ্রলোকের মেয়ে, অমনি ছাড়ব? একটু চা-জলখাবার খেয়ে যেতে হবে।
কুসুমকামিনী যে বাস্তবিকই এত অতিথিবৎসলা তা নয়, তবে মেয়েটাকে এক্ষুনি উঠতে দিতে ইচ্ছে নেই। তাই ওই চা-জলখাবারের ফাঁদ।
মীনাক্ষী অবশ্য-এ ফাঁদে পা দেয় না।
নিজের পাতা ফাঁদ থেকে উদ্ধার পেতে পারলে বাঁচে এখন সে।
তাই বলে, না, এখন কাজ আছে। দিবাকরবাবু এলে বলবেন মীনাক্ষী মৈত্র এসেছিল।
আহা তা তো বলবই। তবে কী উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছিলে তা তো কই বললে না?
কতবার বলব? বললাম তো একটা বইয়ের জন্যে
অ! আমার আবার ভুলো মন, ভুলে যাই। তা দিবার মার কাছেও তা হলে ওই বইয়ের জন্যেই দরকার? মাগী আবার এত বিদ্যেবতী হল কবে লো? অ বেজো।
কুসুমকামিনী হি হি করে হাসতে থাকেন।
কুসুমকামিনী যদি অন্য কোথাও মীনাক্ষীর মতো মেয়েকে দেখতেন, অবশ্যই রীতিমত সমীহর দৃষ্টিতে দেখতেন। কলেজে পড়া মেয়েদের প্রতি ভয় সমীহ সবই আছে তাঁর। তবে এক্ষেত্রে আলাদা। এ হচ্ছে দিবাকরের লভ-এর মেয়ে। অতএব এর সম্পর্কে এর চাইতে সভ্য ব্যবহার করার প্রশ্ন ওঠে না। যে মেয়ে দিবাকরকে পুজি করতে পারে, তার আবার মান-সম্মান।
তার ওপর আবার জাতে বামুন।
বামুনের মেয়ে হয়ে সদগোপের ছেলেকে! ছি! অবিশ্যি যার সঙ্গে যার মজে মন–এ হচ্ছে শাস্ত্রের কথা। কিন্তু হাতের কাছে এমন একটা মজার বস্তু পেলে কে না মজা করে ছাড়ে?
মীনাক্ষী আরক্ত মুখে উঠে দাঁড়ায়, বলে, আমার ভুল হয়েছিল। আচ্ছা—
মীনাক্ষী বেরিয়ে আসে।
কিন্তু ব্রজবালা হঠাৎ খাট থেকে নেমে ওর পিছু পিছু আসে। যদিও ওই আসাটা মোটেই দৃষ্টিসুখকর হয় না। একেই তো শরীরটা তার ভারী হয়ে গেছে, তার উপর জামাকাপড় যেন এলিয়ে পড়া। যেন দেহটাকে না ঢেকে উপায় নেই, তাই কোনওরকমে ঢেকে রেখেছে।
তবু আসে তাড়াতাড়ি।
চুপি চুপি বলে, মায়ের কথাবার্তার ধরনই অমনি৷ ছিরিছাঁদ নেই। রাগ করবেন না। আপনার সঙ্গে বুঝি দিবুদার ভালবাসা আছে?
মীনাক্ষী ফিরে দাঁড়ায়।
মীনাক্ষী তীব্র গলায় বলে, হঠাৎ আপনাদের এমন একটা অদ্ভুত ধারণার হেতু কী? ভালবাসা ছাড়া কেউ কাউকে খোঁজে না? কারুর সঙ্গে কারুর দরকার থাকতে পারে না?
ব্রজবালা এই তীব্রতায় থতমত খায়।
ব্রজবালা ভেবেছিল, এ মেয়ে দিবুদা বর্ণিত সেইসব মেয়ের একজন। যে মেয়েরা নাকি নীতিধর্ম সতীধর্ম কোনও কিছুকেই কেয়ার করে না। যারা নাকি সহজেই এমন সব ভয়ংকর কাণ্ড করে বসে, যা শুনলে ব্রজবালার হৃদকম্প হয়।
কিন্তু সেসব মেয়ের কি কেবলমাত্র একটু ভালবাসার কথায় এমন প্রচণ্ড রাগ আসে? ব্রজবালা তাই মলিন গলায় বলে, না না, এমনি ভাবলাম–
ও রকম ভাবনা আর ভাববেন না।
রেগে আগুন হয়েই নামছিল, তবু সিঁড়ির পাশের ঘরটার সামনে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে মীনাক্ষী। বলে, এই ঘরটা বুঝি দিবাকরবাবুর? দেখতাম বইটা যদি থাকে।
বানিয়েই বলল অবশ্য।
ঘরটা এ বাড়ির পক্ষে ছিমছাম এবং সরু খাট, ছোট টেবিল, হালকা বুক শেলফ ইত্যাদিতে একটি একক ছাত্রের উপস্থিতির ছাপ। দেখে মনটা তবু একটু নরম হল।
হয়তো এ বাড়ির এই পরিবেশটা দিবাকরকেও পীড়িত করে, তাই তার মধ্যে থেকেই নিজের মতো একটু ছিমছাম হয়ে থাকে।
কিন্তু সে নরমটা মুহূর্তেই কঠিন হয়ে উঠল।
ব্রজবালা অবাক গলায় উত্তর দিল,দিবুদার? না তো? এ ঘরে আমার মামার ছেলে থাকে। পড়ে কিনা? আট নটা ক্লাস পড়া হয়ে গেছে তার। তিনতলায় গোলমাল, তাই এখানে খুব ইয়ে ছেলে। বলে–অনেক পড়ব, বিলেত যাব।…দিবুদা ব্রজবালা একটু ঢোক গিলে বলে, দিবুদা নীচতলায় থাকে। নবীনকে দেখলেন তো? ওই ওর ঘরে। আমি বলেছিলাম, ও লেখাপড়া করে, ওর একটা ভাল জায়গা, তা মা বলে কি, ধান সম্পর্কে পোয়াল মাসি। কোন ডালপালার ভাগ্নে আমার, ওর জন্যে আমি রাজ আদর করতে বসব নাকি?… আমার ওই মা-টি না মোটেই সুবিধের নয় বুঝলেন? আর কেপ্পনের জাসু৷
