তবে কেমন যেন ধারণা হয়, ভিতরে ঢুকলেও অভ্যর্থনাটা সুবিধের হবে না। কিন্তু কী করা? এসেছে যখন ভিতরে ঢুকে দেখে যাবেই।
ঠিক আছে। মীনাক্ষী গম্ভীর স্বরে বলে, মামা বাড়ি আছেন?
না তো! এখন আবার তিনি কোথায়? গদিতে গেছে।
মামি আছেন তো? না কি তিনিও গদিতে গেছেন?
মীনাক্ষীর বিরক্তি গোপন থাকে না।
কিন্তু নবীন ঘুঘু ছেলে, সে ভয় খায় না, এতক্ষণে নিজে একটু সরে মীনাক্ষীকে প্রবেশ পথ দিয়ে বলে, গিন্নিমাকে চান তো, উপরে চলুন। তবে নীচের ঘরে একটু বসতে হবে, আগে জানানো দরকার।
মীনাক্ষী আশান্বিত হয়ে ঢোকে।
ধড়িবাজ নবীন অমায়িক মোলায়েম গলায় বলে, দিবাকর দাদাবাবুর ঘরে বসবেন?
দিবাকর দাদাবাবুর ঘর!
মীনাক্ষীর মনটা পুলকে ভরে ওঠে। যে মানুষকে সর্বদা দেখি, অথচ জীবনে তার ঘর দেখিনি, তার ঘরটা দেখতে আগ্রহ হয় বইকী!
কিন্তু মীনাক্ষী তো জানে–দিবাকর দোতলায় মামার মেয়ে ব্রজবালার ঠিক পাশের ঘরে থাকে। তাই বলে,থাক, এখন নীচেই বসছি।
নবীন কী ভাবল বা বুঝল কে জানে। বলল,ঠিক আছে বসবার ঘরেই বসুন।
মীনাক্ষী ওর পিছু পিছু বাড়ির মধ্যে ঢুকে আসে, সঙ্গে সঙ্গে তার কানের পরদা ফুটো করে একটা বিষবাণ এসে মাথার মধ্যে বিধে যায়।
হ্যাঁ নবনে, গেট-এ দাঁড়িয়ে এত কথা হচ্ছিল কার সঙ্গে? ছুঁড়িটা কে?
নবীন উপরে উঠে গিয়েছিল।
বোধ করি ছুঁড়িটা কে, এবং এত কথাটা কীসের তাই জানাতে। মীনাক্ষী একা বসে ঘামছিল আব ভাবছিল, ভুল বাড়িতে ঢুকে পড়িনি তো!
এই বাড়ি দিবাকরের?
এই ভাষা দিবাকরের বাড়ির লোকের? যে দিবাকর মীনাক্ষীর বাড়ির সেকেলেপনা দেখে মুহূর্তে মুহূর্তে অজ্ঞান হয়ে যায়!
এটা কী সরল গ্রাম্যতা?
নাঃ! কণ্ঠস্বর কী কর্কশ!
ভঙ্গিতে কী অপরিচ্ছন্নতা!
না, না, এ বোধহয় ভুল বাড়িতে ঢুকে পড়েছে মীনাক্ষী।
উঃ! চাকরটাও যে গেল তো গেলই।
নেমে এসে তাকে বলে চলে যেতে পারে, এখন আর ওই গিন্নি-টিন্নির সঙ্গে দেখা করার উৎসাহ নেই মীনাক্ষীর।
নবীন এল অনেকক্ষণ পরে।
খুব সম্ভব সব কিছু গিন্নির কর্ণগোচর করে।
এসে সহাস্যে বেশ মাইডিয়ারি ভঙ্গিতে বলে ওঠে, হয়ে গেছে কুইন ভিক্টোরিয়ার হুকুম! আসুন উপরে।
মীনাক্ষীর আপাদমস্তক জ্বলে যায়, মীনাক্ষীর ইচ্ছে হয়, বলে,থাক এখন, হঠাৎ মনে পড়ল অন্য কাজ আছে।
কিন্তু মীনাক্ষীকে কৌতূহলে টানল।
যে কৌতূহল মেয়েমানুষের স্বভাবধর্ম। দেখাই যাক না কী ব্যাপার। কিন্তু নিশ্চিত হবার উপায়টা কী?
যে লোকটার সঙ্গে কথা কইতে হাড় জ্বলছে, তাকেই বলে,আচ্ছা ইনি দিবাকর দাস তো?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
মামার নাম?
আজ্ঞে, শ্রী প্রকাশচন্দ্র মণ্ডল।
নামটা যেন এইরকমই মনে হচ্ছে মীনাক্ষীর। কারণ প্রথম শুনে মণ্ডল শব্দটা যে হঠাৎ কানে একটা ধাক্কা মেরেছিল, সেই স্মৃতিটা স্মরণে এল।
অতএব উপরে ওঠা।
বসবার ঘরটাকে আর একবার তাকিয়ে দেখল মীনাক্ষী। প্রকাণ্ড একটা গোলটেবিল, তার ধার ঘিরে খানকয়েক কাঠের চেয়ার, ভারী ভারী হাতল দেওয়া। দেয়ালে নানা দেবদেবীর ছবি, তার সঙ্গে একটি মেমমার্কা ক্যালেন্ডার। ক্যালেন্ডারখানা বাদে সবই কেমন মলিন বিবর্ণ ধূসর।
পয়সা আছে, রুচি নেই।
কেমন একটা বিতৃষ্ণা মেশানো কৌতূহল নিয়ে নবীনের পিছু পিছু উপরে উঠল মীনাক্ষী। আর সেই সময় জিজ্ঞেস করল, তোমার নাম কী?
.
কুসুমকামিনীও সেই প্রশ্নই করেন, তোমার নাম কী?
কুসুমকামিনীর ঘরে বসবার জন্যে একটি সোফা আছে। ফুলপাতাসংবলিত সেকেলে গড়নের জোড়া পালঙ্কের পায়ের দিকে একধারে সেটি পাতা। সামনে ছোট টেবিল।
প্রকাণ্ড ঘর। জোড়া পালঙ্ক, সোফা টেবিল দেরাজ আলনা ইত্যাদি রেখেও জায়গা আছে।
কুসুমকামিনী অবশ্য সোফায় বসে নেই। তিনি সেই সোফা থেকে হাতখানেক উঁচু পালঙ্কে একটি তাকিয়া কোলে নিয়ে বসে আছেন। কাছে ডাবরে পান।
বয়সের তুলনায় চুল পাতলা, মুখে ভারিক্কি ছাপ। তাঁর পাশে ব্রজবালা গড়িয়ে শুয়ে ছিল, মীনাক্ষীকে দেখে কাপড়-চোপড় গুছিয়ে উঠে বসল।
মীনাক্ষী অবশ্য আন্দাজে ভাবল এই বোধহয় ব্রজবালা। কিন্তু এ মেয়ের মুখে কোনও দুদে ধরনের ছাপ দেখতে পেল না মীনাক্ষী। বরং যেন নেহাতই নিরেট নিরেট। এই মেয়ে সেইকথা বলতে পারে?
সে যাক, এদের একবার যাচাই করে যেতে হবে মীনাক্ষীকে। যাতে দিবাকর সম্পর্কে সঠিক জানতে পারে।
ভয়ানক একটা জ্বালা অনুভব করছে; প্রতারিত হবার জ্বালা, ঘৃণার জ্বালা।
কুসুমকামিনীর পরনে একখানি কল্কাপাড় মিহি শান্তিপুরে শাড়ি, গায়ে জামা-শেমিজের বালাই নেই। গায়ে জামা-শেমিজের বালাই মীনাক্ষীর নিজের মারও থাকে না। কিন্তু সে যেন আর একরকম। তার মধ্যে কতকটা যেন কৃচ্ছসাধনের পবিত্রতা। তা ছাড়া সর্বদাই তো গরদ-তসর পরে বেড়ান বিজয়া, একটু পুজো-পুজো ভাব থাকে, খালি গা এত দৃষ্টিকটু লাগে না।
কিন্তু এঁর সবটাই যেন একটা অশ্লীল স্থূলতা।
ডাবর থেকে একটা পান তুলে নিয়ে তার নীচের কোণটুকু দাঁতে কেটে থু করে ফেলে দিয়ে, সেটিকে মুখে পুরে কুসুমকামিনী রাশভারী গলায় বলেন, বোসো৷
মীনাক্ষী বসে।
গৃহকর্ত্রীর থেকে হাতখানেক নিচুতে।
কুসুমকামিনী তার আপাদমস্তক দেখে নিয়ে বলেন, নাম কী তোমার? মীনাক্ষী নাম বলে।
মীনাক্ষী? বেশ নতুন নামটা তো।কুসুমকামিনী তেমনি রাশভারী গলায় বলেন,দিবাকরকে খুঁজতে এসেছিলে?
