মনে হচ্ছে জীবনে বোধহয় আর কোনওদিন আমার এই অভ্যস্ত কাজে ফিরে যেতে পারব না। আমি বোধহয় পড়াতে ভুলে গেছি। ভুলে গেছি আমার অধীত বিদ্যাকে।
না, আমি এখন আর আমার ছাত্রদের ঔদ্ধত্যে মর্মাহত হচ্ছি না, বুঝতে পারছি এ ছাড়া আর কিছু করবার ক্ষমতা ছিল না তাদের। তাদের আমরা শুধু বিদ্যাই দিয়ে এসেছি, শিক্ষা দিতে পারিনি।
বিদ্যাটা তো একটা হাতিয়ার মাত্র। যেটা তাদের জীবনযাত্রার কাজে লাগবে, জীবন সাধনায় নয়।
ওদের সামনে অনেক আশার ছবি তুলে ধরছে জগৎ, তুলে ধরতে পারছেনা কোনও আদর্শের ছবি। চরিত্র বস্তুটা দেখতে পাচ্ছে না ওরা, চরিত্রবান হবে কোথা থেকে তবে? ওদের কাছে প্রত্যাশার পাত্র খালি পেতে ধরলে বিফল তো হবই।
না, আমার ছাত্রদের দোষ দিতে পারছি না আমি। আমার সন্তানদেরও নয়।
আমার অক্ষমতাই আমার সন্তানদের অসার করেছে, অবিনয়ী করেছে, অসভ্য করেছে। আমাদের প্রেমহীন বিকৃত দাম্পত্য জীবনের অসহায় বলি ওরা। ওদের জন্যে বেদনাবোধ করবার আছে। ওদের কাছে ক্ষমা চাইবার আছে।
৩. বিজনেসের গল্প
দিবাকর কোনওদিন মীনাক্ষীকে তার বাসস্থান দেখায়নি, তবু মীনাক্ষী সে বাড়ির দরজায় এসে হাজির হল।
মীনাক্ষী দিবাকরের মামার বিজনেসের গল্প শুনেছিল এবং শুনেছিল তাঁর দোকানের নাম। সেই সূত্র ধরে ঠিকানাটা জোগাড় করে নিয়েছিল এবং সাহসে ভর করে এসে দাঁড়িয়েছিল।
দাঁড়িয়েছিল। তবু সেই সেকেলে প্যাটার্নের টানা লম্বা জালটাকা বারান্দাওলা প্রচণ্ড তিনতলা বাড়িখানার গেট ঠেলে চট করে ঢুকে পড়তে বাধছিল, তাকিয়ে দেখতে লাগল।
তাকিয়ে তাকিয়ে ভাবল, দিবাকর এত আধুনিক, কিন্তু ওর বাড়িটা একেবারে সেকেলে। এই নিরেট নিরেট বাড়িটার মধ্যে কি প্রগতির হাওয়া খেলে? কিন্তু ঢুকব কী করে?
এ সময় একটা ঘটনা ঘটল, মীনাক্ষীর পিছন থেকে কেউ একজন বলে উঠল, কাকে চান?
মীনাক্ষী তাকিয়ে দেখল।
দেখল বাড়ির চাকরটাকর কেউ।
হাতে মিঠে পানের খিলি।
পান কিনতে বেরিয়েছিল বোধহয়, ফিরে এসে দরজায় এমন একটি অপরিচিতা তরুণীকে দেখে একটু অবাক হচ্ছে।
এ বাড়িতে আত্মীয়স্বজন ছাড়া কারও যাতায়াত নেই। আর অনেকদিনের পুরনো চাকরের সেই আত্মীয়জনদের চিনতেও বাকি নেই।
নবীন সবাইকে চেনে।
নবীন সবাইয়ের সঙ্গেই মুরুব্বিয়ানা চালে কথা কয়ে থাকে।
কিন্তু আজকের অতিথিটি নবীনের অচেনা, তাই মুরুব্বিয়ানার সুরটা গলার মধ্যেই মজুত রেখে নবীন ঈষৎ সমীহর গলায় বলল, কাকে চান?
মীনাক্ষী জানত এ-সময় দিবাকর বাইরে, মীনাক্ষী সেটা ভাল করে জেনেই তবে এসেছিল। তবু হঠাৎ ভেবে পেল না কাকে চাই বলবে? তাই থতমত খেয়ে বলে ফেলল, দিবাকরবাবু আছেন?
দিবাকরবাবু!
নবীনের সমীহর গলা উপে গেল। বেরিয়ে এল তাচ্ছিল্যের গলা।
যে মেয়েছেলে দিবাকরকে খুঁজতে এসেছে, তাকে সমীহ করবার প্রয়োজন বোধ করল না।
তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, না, নেই। দরকার থাকে সকালের দিকে আসবেন।
পান নিয়ে গেট ঠেলে ঢুকে ঘুরে দাঁড়াল নবীন, যেন আগলানোর ভঙ্গিতে।
মীনাক্ষীর ওই ভঙ্গিটা দেখে একবার মনে হল, ধ্যেতারি চলে যাই। মনে হচ্ছে এ বাড়ির মধ্যে ঢুকে আমি সুবিধে করতে পারব না।
কিন্তু বিনা বাক্যব্যয়ে চলে আসবে শুধু একটু ভাল না লাগার কারণে? যে আসা কত আয়োজন করে।
মীনাক্ষী সাহসে ভর করে বলে,আমি তাঁর মার সঙ্গে দেখা করতে চাই।
মা!
নবীন আকাশ থেকে পড়ে।
মা! দিবাকর দাদাবাবুর মা আবার এখানে কোথা?
নেই? সে কী? কোথাও গেছেন বুঝি?
নবীন ব্যঙ্গের গলায় বলে, যাবে কোথায়? কোনওকালেও ছিল না। দেশে থাকে।
কী আশ্চর্য!
দিবাকর তা হলে কী করে যখন তখন বলে, মা এই বলল, এই বোঝাল, মাকে এই শুনিয়ে দিলাম।
দিনের পর দিন তা হলে বাজে কথা বলেছে দিবাকর?
ধ্যেৎ। তাই কি সম্ভব? মাকে নিয়ে এমন অদ্ভুত বাজে কথা বলবে কেন? কোথাও একটা ভুল হচ্ছে।
মীনাক্ষী তাই সন্দিগ্ধ গলায় প্রশ্ন করে, এটা দিবাকরবাবুর মামার বাড়ি তো?
নবীন ইত্যবসরে ট্যারা দৃষ্টিতে মীনাক্ষীকে যাকে বলে পুঙ্খানুপুঙ্খ সেইভাবে দেখে নিচ্ছিল। তার তীক্ষ্ণ প্রখর বুদ্ধিতে ধরা পড়তে দেরি হল না মেয়েটা দিবাকর দাদাবাবুর লভ-এর মেয়ে। সিনেমা দেখে দেখে লিভ-এর হাড়হ তার নখদর্পণে!
আর সিনেমাও তো দেখতে বাকি থাকে না কিছু। নিজের চাহিদায় যায়, গিন্নিমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতেও যায়।
প্রকাশ মণ্ডলের এত সময় নেই যে গিন্নি নিয়ে সিনেমা যাবেন, গিন্নি কুসুমকামিনীর তাই একমাত্র গতি খাস চাকর নবীন। যান না অবশ্য একা, ব্রজবালা থাকলে ব্রজবালা যায়, ভাই বউ বীণা যায়, কিন্তু একটা বেটাছেলের ভরসা তো চাই?
দশটা মেয়েমানুষও একা, না ভ্যাকা! একটা বেটাছেলে হচ্ছে ভরসা। তা সে নাবালক হোক, অথবা গণ্ডমূর্খ চাকরই হোক।
অতএব নবীনের সিনেমা দেখাটা খুব ঘটে। সেই অভিজ্ঞতাতেই বুঝতে দেরি হয় না তার মেয়েটা কে!
তবু বুঝে ফেলেও উদাসীন গলায় বলে, হ্যাঁ, বাবুর ভাগ্নে বলেই তো জানি।
মীনাক্ষী চাকরটার কথার মধ্যে একটা স্পষ্ট অবজ্ঞা দেখতে পায়। মীনাক্ষীর রাগে হাড় জ্বলে যায়। বুঝতে বাকি থাকে না বড়লোকের আদুরে বেয়াদপ চাকর।
কিন্তু চোরের ওপর রাগ করে তো মাটিতে ভাত খেতে পারে না মীনাক্ষী? চাকরের ওপর রাগ করে দরজায় এসে ফিরে যেতে পারে না?
