বলছি–একটা উত্তর পেতে চাই বলে। এটা আমার জিজ্ঞাসা।
মীনাক্ষী ঘাড় নিচু করে বসে রইল।
সরোজাক্ষ মৃদু হেসে বললেন, প্রশ্নপত্রটা বড় শক্ত হয়ে গেছে, তাই না? এত তাড়াতাড়ি উত্তরপত্র তৈরি করা সম্ভব নয়। আচ্ছা থাক।
মীনাক্ষী বোকার মতো একটুক্ষণ বসে থেকে উঠে গেল। মীনাক্ষী তারপর নিজের ঘরে এসে চিঠি লিখতে বসল।
.
আজই দেখা হয়েছে।
তাতে কী?
আবার এখুনই তো কত কথা জমে উঠেছে। প্রেমের কথা না হোক, প্রয়োজনের কথা।
দিবাকর আজ বলেছিল, তোমার বাবার যা মতবাদ দেখছি, তাতে ওঁর প্রতি আর আস্থা নেই। এখনও এ যুগেও তিনি এতটুকু মান-অপমানে বিচলিত হন। এখনও আশা করেন ছেলেগুলি সুশীল সুবোধ হবে। এরপর আর কী করে তবে ভাবা যেতে পারে তিনি তাঁর মেয়ের এই স্বয়ংবরা হওয়াটা সুচক্ষে দেখবেন! নাঃ, আশা নেই।
আশা তো করছি না।
তবে আর আমায় ঝুলিয়ে রাখা কেন বাবা? ছেড়ে দাও, বাবার বাধ্য কন্যা হয়ে পিড়িতে বসো গে৷
মীনাক্ষী আজ ক্ষুব্ধ ছিল।
মীনাক্ষী উদ্ধত গলায় বলেছিল, বেশ, দরকার নেই বাবার প্রসন্ন অনুমতির, তোমাকেও আর ঝুলিয়ে রাখতে চাই নে। কালই চলো নোটিশ দিতে। এখন বলো, বিয়ে করে আমায় কোথায় নিয়ে গিয়ে তুলবে।
দিবাকর হো হো করে হেসে উঠল। একেই বলে মেয়ে! যে-কোনও বয়েসেই তোমরা ঘোরতর বিষয়ী!
বিষয়ী না হতে পারলে, কোনও বিষয়েই এগোনো যায় না দিবা! ডাঙার মাটি না দেখেই নৌকো থেকে পা তুলে নেওয়া নির্বুদ্ধিতা মাত্র।
উঃ, একেবারে টাকা-আনা-পাইয়ের হিসেব।
মীনাক্ষী বিরক্ত মুখে বসে ছিল, উত্তর দেয়নি।
দিবাকর তখন এক গল্প ফেঁদেছিল। বলেছিল, মেয়েরা যে কত হিসেবি হয় তা হলে বলি
তারপর দিবাকর তার মামার মেয়ে ব্রজবালার নাম দিয়ে সেই তার দেশের দিদির গল্পটা শুনিয়ে দিয়েছিল।
মীনাক্ষী রুদ্ধকণ্ঠে বলেছিল, এই কথা বলল সে তোমায়?
বলল তো! দিব্যি স্বচ্ছন্দেই বলল।
দিবাকর দিব্যি বানিয়ে বানিয়ে বলেছিল, দোতলায় ঠিক ওর ঘরের পাশেই হচ্ছে আমার ঘর, এ ঘরে চলে এসে হাসতে হাসতে বলল, তোমাদের ভগ্নীপতি আজ দশদিন হল আসছে না। তাই আজ্ঞা দিতে এলাম তোমার ঘরে।
আমি তো বিব্রত বিপন্ন।
বললাম, কিন্তু এত রাত্রে?
ও অনায়াসে ধূর্ত হাসি হেসে বলল,তাতে কী? বিধবা নই, কুমারী নই, ভয়টা কী? বাবা মা থিয়েটার দেখতে গেছে কিন্তু সাবধান করে দিচ্ছি দিবুদা, আমার সেই হতভাগা বরটা যখন আসবে, যেন দেখে না তোমার সঙ্গে আমার চেনা আছে। তুমি বাবার ভাগ্নে, এই পর্যন্ত।
বোঝো তা হলে? সাধে বলছি মেয়েরা হচ্ছে এক নম্বর হিসেবি। তারা সব সময় দু নৌকোয় পা রাখে, যাতে দুটোই দখলে থাকে। তারা মাটিতে পা না রাখা পর্যন্ত নৌকো ছাড়ে না। যেমন তুমি।
মীনাক্ষী রুদ্ধ গলায় বলেছিল, ছেলেরা আর আমাদের অবস্থা কী বুঝবে!
হুঁ, সেই চিরকেলে মেয়েলি প্যানপ্যানানি। এ দেশের আর উন্নতি হয়েছে।
মেয়েরা খুব বেপরোয়া হলেই বুঝি দেশের খুব উন্নতির চান্স?
বেপরোয়া মানেই সাহসী! দিবাকর বলেছিল, সাহসের অভাবই আমাদের দেশকে শেষ করেছে।
দিবাকরের সেই ঘোর কালো রঙের আঁটি সাঁটি ধরনের মুখটা যেন ঘৃণায় বেঁকে গিয়েছিল, এ দেশের সাহসের অভাবের কথা স্মরণ করে।
মীনাক্ষীর মুখে আর কথা জোগায়নি। কিন্তু বলবার কথা অনেক ছিল।
— সেই কথা লিখতেই কাগজ কলম নিয়ে বসল মীনাক্ষী। লিখল, তুমি কেবল আমার সাহসের অভাবই দেখছ, নিজের অভাবটা তোকই দেখছনা? এতবার বলছি তোমার মামার কাছে, তোমার মার কাছে আমাকে একবার নিয়ে চলো, কই যাচ্ছ না তো? তার মানে সাহস হচ্ছে না। ঠিক আছে, আমি একলাই যাব। দেখব কী তাঁরা বলেন আমায়।
.
মীনাক্ষী যখন তার হাতের কলমটা থামিয়ে ভাবনার গভীরে ডুবে গিয়ে ভাবছিল, আচ্ছা আমাদের দেশের সেই প্রথাটাই কি তবে ভাল ছিল? সুখের ছিল? বালিকা বয়েসেই বাপ-মা ধরে একজনের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিত, ব্যস নিজের দায়িত্ব বলে কিছু থাকত না।–আর জ্ঞান হওয়া ইস্তক যাকে একমাত্র অবলম্বন বলে জানত, তাকেই ভালবেসে ফেলত–মীনাক্ষী ভাবনা থামিয়ে হাসল। ভাবল, আমার মা বাপের দাম্পত্য জীবনই তো আমার প্রশ্নের উত্তর।
মীনাক্ষীর তার নিতান্ত শৈশবের কথা অস্পষ্ট মনে পড়ল। মনে পড়ল তার মায়ের সেই একটা ভয়ংকর হিংস্র মূর্তি। তার বাবার সেই নিবিড় ঘৃণা আর অবজ্ঞার মূর্তি।
অথছ ওঁরা একসঙ্গে কাটিয়েও এলেন এই দীর্ঘ জীবনটা। ওঁরা কোনওদিন বিবাহ-বিচ্ছেদের কথা চিন্তা করেননি, কোনওদিন পালিয়ে যাবার, আত্মহত্যা করবার, সমস্ত সংসারের কাছে নিজেদের এই ফাঁকির ঝুলিটা খুলে ধরবার সাহসও অর্জন করতে পারেননি।
মীনাক্ষীর বাবাও ঠিক সেই সময় সেই কথাই ভাবছিলেন।
অথচ এই জীবনের মধ্যে কাটিয়ে এলাম এতখানি বয়েস পর্যন্ত। কোনওদিন ভাবিনি, এই ফাঁকির জীবনটাকে ছিঁড়ে ছড়িয়ে ধুলোয় ফেলে দিয়ে, সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াই।
সরোজাক্ষ ভাবছিলেন–
আসলে আমি আমার এই পারিবারিক সত্তাটাকে গৌণ ভাবতে অভ্যস্ত হয়েছিলাম, আমার কাছে মুখ্য ছিল আমার কর্মময় সত্তাটি। তার উপরেই আমার আমিটাকে প্রতিষ্ঠিত রেখে চালিয়ে যাচ্ছিলাম। সেখানেই ছিল আমার ভালবাসা, আমার আশ্রয়।
এখন সহসা ধরা পড়ে গেছে, সেই আমার একান্ত ভালবাসার, একান্ত আশ্রয়ের জায়গাটা আরও বিরাট একটা ফাঁকির শূন্যতা সৃষ্টি করে রেখে বাতাসে মিলিয়ে গেছে।
