হিতোপদেশ! বরের সামনে এহেন অপমানে লাল হয়ে গিয়ে ময়ুরাক্ষী বলল, আপনাকে হিতোপদেশ দিতে আসব, এমন মুখ আমি নই বাবা। আর–কৈফিয়তই বা কীসের? আপনার চাকরি ছাড়ায় তো আমার সংসার অচল হয়ে যাবে না। এমনি কথার কথাই বলছিলাম। আপনি আমাদের সন্তানের মর্যাদা না দিলেও আমরা তো সম্পর্কটা ভুলতে পারি না।
বড় মেয়ের বাক্যের হুলে সরোজাক্ষ বিব্রত হয়েছিলেন। বিপন্ন গলায় বলেছিলেন, এ সব কথা বলছ কেন? চাকরি ছাড়াটা হয়তো সংসারের পক্ষে অসুবিধেকর, কিন্তু আমার বিবেকে বাধছে। মনে হচ্ছে এতকাল ওদের ঠকিয়ে মাইনে নিয়ে এসেছি। ওদের শিক্ষা দেবার ভান করেছি, অথচ দিইনি শিক্ষা। পিটুলি গোলা খাইয়ে দুধ খাওয়াচ্ছি বলে মিথ্যে আত্মপ্রসাদ লাভ করেছি। তারপর–মেজাজের ওজন হারিয়ে বসেছি ওরা শিক্ষিতহয়নি দেখে। এতদিন খেয়ালে আসেনি বলেই চালিয়ে আসছিলাম। এখন আর
সরোজাক্ষর জামাই শ্বশুরের সামনে মুখ খোলে কম। যা কিছু মন্তব্য করে, আড়ালেই করে। আজ কিন্তু মুখ খুলল। একটু চোরা-হাসি হেসে বলল, ছাত্ররাই তা হলে আপনার জ্ঞানচক্ষু খুলে দিয়েছে বলুন?
সরোজাক্ষ একবার ওই আহ্লাদে আহ্লাদে মুখটার দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট গলায় বলেন, তাই দিয়েছে বলতে হবে।
ময়ূরাক্ষীর নিজের মতবাদ যাই হোক, বরের কথার প্রতিবাদ করবেই। ওই প্রতিবাদটাই হয়তো ওর আসল মতবাদ।
ও তাই নিজের কথাই খণ্ডন করে বলে, তুমি থামো তো! এ যুগের ছেলেগুলো হচ্ছে পাজি নম্বর ওয়ান! সভ্যতা নেই ভব্যতা নেই, কোনও কিছুতেই শ্রদ্ধা নেই
হয়তো ওদের সামনে–সরোজাক্ষ একটু থেমে বলেন,ওদের শ্রদ্ধার যোগ্য কিছু নেই।
ঠিক বলেছেন। সরোজাক্ষর জামাই উৎসাহিত গলায় বলে, নেই কিছু। দেখছে তো চারদিক তাকিয়ে। বুদ্ধি তো হয়েছে। দেখছে–যেমন অপদার্থ দেশের সরকার, তেমনি অপদার্থ কর্পোরেশন, তেমনি অপদার্থ ইউনিভার্সিটিগুলো, আর–
থাক জয়ন্ত, বৃথা কষ্ট কোরো না, সরোজাক্ষ আস্তে বলেন, এ দেশের অপদার্থতার লিস্ট করতে বসলে কাগজে কুলোবে না। তোমরা বরং চা-টা খাও গে…
খাও গে!
অর্থাৎ অন্যত্র সরে পড়ো গে।
জয়ন্ত মুচকি হেসে বলে, তাই ভাল। কী বলো মক্ষী? বাবাকে অনর্থক ডিস্টার্ব করার কোনও মানে হয় না।
না না– ডিস্টার্ব কেন? সরোজাক্ষ কুণ্ঠিত গলায় বলেন, অনেকক্ষণ এসেছ, চা-টা খাবে তো একটু?
ময়ূরাক্ষীর বাবাকে হিতকথা শোনানোর প্রচেষ্টা ওই চা খাওয়াতেই ইতি হল। তার ভাগ্যক্রমে সেদিন তখনও নীলাক্ষ বাড়ি ছিল, ছিল সুনন্দা।
সুনন্দাই নিজের ঘরের শৌখিন সরঞ্জাম বার করে চা খাওয়াল, খুব প্রশংসার গলায় বলল, মক্ষী তো খুব চমৎকার সেজেছ? শাড়িটা নতুন কিনেছ তাই না?
ওই নিরীহ প্রশ্নটার মধ্যে ময়ূরাক্ষী যে অপমানের কী পেল! ক্রুদ্ধ হল সে। আজেবাজে করে বলতে লাগল, নতুন শাড়ি দেখাবার জন্যেই সে এসেছে, এমন নিচু কথা সুনন্দা ভাবতে পারল কী করে। নেহাত নাকি বাবার মাথাটা খারাপ হয়ে গেছে কিনা দেখতে-বলল, হয় এরকম। হঠাৎ হঠাৎ অপমানে মানী লোকেদের ব্রেনের মধ্যে এদিক ওদিক হয়ে যায়।
সুনন্দা এতক্ষণ এদের কথায় যোগ দেয়নি। সুনন্দা লীলায়িত ভঙ্গিতে চা বিস্কুট কাজু সরবরাহ করছিল, এখন একটু হেসে বলল, হঠাৎ বুঝি?
ময়ূরাক্ষী ভুরু কোঁচকাল, কী বলছ?
কিছু না। অপমানটা হঠাৎ হলে, একটা এদিক ওদিক হয়ে যায় বলছিলে কিনা, তাই জিজ্ঞেস করছিলাম হঠাৎ কি না।
ময়ূরাক্ষী লাল লাল মুখে বলে, তা সে অপমান তোমরাই করে চলেছ। মেয়েদের থেকে বাবা কোনও আঘাতই পাননি।
কোথা থেকে কী সে কথা তো বলিনি ভাই মক্ষী, চটে উঠছ কেন?সুনন্দা হাতের প্লেটটা বাড়িয়ে ধরে বলে,আর দুটো কাজু খাও।
নীলাক্ষ বলে ওঠে, এটা হচ্ছে আমার প্রতি শ্লেষ, বুঝলি মক্ষী? শ্রীমতী সুনন্দার ধারণা আমার বাবাকে উনি আমার থেকে বেশি ভালবাসেন।
ভালবাসা!
সুনন্দা হঠাৎ বেয়াড়া ভঙ্গিতে হেসে ওঠে, সে আবার কী বস্তু? ভালবাসা! হি হি হি! তোমাদের দাদা বেশ মজার মজার কথা বলেন মক্ষী! কী জয়ন্তবাবু, শুনে আপনার মজা লাগছে না?
মীনাক্ষী বাবাকে দোষারোপ করেনি, শুধু বলেছিল, কলেজটা ছাড়া যখন আপনার পক্ষে অনিবার্যই হল বাবা, তখন আমায় একটু কিছু করবার অনুমতি দিন, যাতে নিজের দরকারটাও অন্তত
সরোজাক্ষ একটা অপ্রত্যাশিত কথা বললেন। বললেন,আমি তো তোমাকে কোনও কিছু করতে কোনওদিন নিষেধ করিনি, হঠাৎ এখন অনুমতির কথা কেন?
মীনাক্ষী একথা আশা করেনি। মীনাক্ষী ভেবেছিল বাবা আহত হবেন, ক্ষুব্ধ হবেন। তাই ঈষৎ বিচলিত হল মীনাক্ষী। বলল,এতদিন এদিকটা ভেবে দেখিনি। বেশ, আপনার যখন অমত নেই–
মীনাক্ষীকে থামতে হল।
মীনাক্ষীর বাবা তাঁর চোখের থেকে চশমাটা খুলে মুছতে মুছতে সেই চশমাহীন গভীর ছাপপড়া। চোখ দুটো মেয়ের চোখে ফেলে বললেন, আমার অমত, আমার অনুমতি, এগুলোর সত্যিই কোনও প্রয়োজন আছে তোমাদের জীবনে?
মীনাক্ষী চমকে উঠল।
মীনাক্ষী কেঁপে উঠল।
মীনাক্ষীর মনে হল, সব প্রকাশ হয়ে পড়েছে। বাবার কাছে আর কিছুই অবিদিত নেই। তবু মীনাক্ষী ভাবল–এই সুযোগ। এখনই তার নিজের কথা বলে ফেললে ভাল হত।
কিন্তু মীনাক্ষীর স্বরযন্ত্রটাকে কে যেন আটকে ধরল।
মীনাক্ষী আজও অন্যদিনের মতোই ব্যর্থ হল।
মীনাক্ষীর মাথা নিচু করে বলল, এ কথা কেন বলছেন?
