বিজয়া আবার চিমটিকাটা স্বর ব্যবহার করলেন, কই, জবাব দিলে না?
সরোজাক্ষ গম্ভীর গলায় বললেন, অনেক টাকা।
বিজয়া সহজের রাস্তা ধরলেন।
বললেন, হ্যাঁ, সেকথা তো আমার অবিদিত নেই। তবে বলি ভাঁড়ে যখন মা ভবানী, তখন এত তেজ দেখাবার কী দরকার ছিল?
সরোজাক্ষর উত্তর দিতে ইচ্ছে হয় না, তবু সরোজা জানেন, কোনও একটা উত্তর না নিয়ে ছাড়বেন না বিজয়া। তাই তেমনি গম্ভীর কণ্ঠেই বলেন, যদি বলি ছিল দরকার?
বিজয়া তাঁর সেই কাঠ কাঠ হলুদরঙা মুখটা বাঁকিয়ে কুদর্শন করে বলে ওঠেন, তা তুমি আর বলবে না কেন? নিজের কাজকে কি আর অদরকারি বলবে? তা সেই দরকারটা বোধ হয় স্ত্রী-পুত্রের পেটের ভাতের থেকেও বড়?
সরোজাক্ষ অন্যদিকে তাকিয়ে ছিলেন। সরোজাক্ষ অন্যমনস্কর মতো বলে ফেললেন, হয়তো বড়।
কিন্তু বিজয়া কি রাগ করে উঠে যাবেন? বিজয়া বলে উঠবেন না, তা তোমার কাছে তাই হতে পারে, কিন্তু মুশকিল হচ্ছে ত্রিজগৎ তা বলবে না। আমি বলছি ওসব তেজ-মান রেখে আবার জয়েন করতে হবে তোমায়।
তা হয় না।
হয় না তো, যেমন করে পারো রোজগার করে আনন। আর নয়তো আমায় অনুমতি দাও, ঝুলি হাতে করে ভিক্ষেয় বেরোই।
সরোজাক্ষ হঠাৎ হাতজোড় করে বলে ওঠেন, তুমি একটু এ ঘর থেকে যাবে?
এই, এইটিই অস্ত্র সরোজাক্ষর।
এরপর আর থাকেন না বিজয়া।
চোখে আগুন ঝরিয়ে চলে যান। কিন্তু সেদিন চলে যাননি। সেদিন তীক্ষ্ণ ধারালো গলায় চিৎকার করে করে বলেছিলেন, তাড়িয়ে দিয়ে পার পাবে ভেবেছ? সে আর এখন হয় না। মাস মাস যতটি টাকা সংসারে লাগে, তা যে করে থোক আমায় এনে দেবে, এ দিব্যি গালো, তবে আমি নড়ছি।
সে চিৎকারে সারদাপ্রসাদ ছুটে এসেছিলেন, বলেছিলেন, কী হচ্ছে কি বউদি? মানুষটা এই সেদিন মরণ বাঁচন রোগ থেকে উঠেছে, আবার এইসবে যদি একটা স্ট্রোক-টো হয়ে যায়? যান, যান, আপনার পুজোর ঘরে চলে যান।
বিজয়া এ সুযোগ ছাড়েননি।
বিজয়া হাত-মুখ নেড়ে বলে উঠেছিলেন, মুখে হিতৈষী হতে সবাই পারে গো ঠাকুরজামাই। বলি এতগুলি লোকের পেট তাতে মানবে?
সেদিন একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছিল। যে সারদাপ্রসাদ ব্যঙ্গবিক্রপ কাকে বলে জীবনে জানে না, সে হঠাৎ সেই গলায় বলে উঠেছিল, কেন, আপনার ঠাকুর কী করছেন? শুধু নিজে বসে বসে ছানা-মাখনের ভোগ লাগাবেন? তিনি পারবেন না এই পেটগুলোর ভার নিতে?
বিজয়া সহসা একথার উত্তর দিয়ে উঠতে পারেননি। তাই ন্যাকামি বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। সিঁড়িতেই উঠে গিয়েছিলেন।
সারদাপ্রসাদ সুউচ্চ কণ্ঠে বলেছিল, হ্যাঁ, তাই যান। তাঁকেই জ্বালাতন করুন গে। চিরটাকাল তাঁকে নিয়েই পড়ে থাকলেন, এখন বিপদকালে মানুষের ভরসা কেন?
এত ঝামেলার মধ্যেও হঠাৎ সরোজাক্ষর মুখে একটু কৌতুকের হাসি ফুটে উঠেছিল যেন। বলেছিলেন,তোমার তো আজকাল খুব সাহস বেড়েছে দেখছি।
সারদাপ্রসাদ লজ্জিত গলায় বলেছিল, কী করব দাদা, হঠাৎ রাগটা কেমন চড়ে গেল! বুনো গোঁয়ার তো।
তারপর নিজেই বলেছিল, তারপর? এখন কী ঠিক করছেন? কিছু তো একটা করতেই হবে?
তা তো হবে।
সারদা ক্ষুণ্ণ গলায় বলেছিল, আমার বইটা শেষ হয়ে গেলে, এত ভাবতাম না। কী করব, হয়ে তো ওঠেনি। তবে গোটা কয়েক দিন চালিয়ে নিন, ও বই ছাপা হলে–একেবারে হট কেক হবে। অথচ এদিকে দামটা ভাল হবে। টাকা কুড়ির কম তো নয়ই। ধরুন যদি ফার্স্ট এডিশানে দু হাজারও ছাপায়–এসব গবেষণার বইটই অবশ্য তা ছাপে না। একেবারে চার-পাঁচ হাজার ছাপে। যাক আমি না হয় দুহাজারই ধরছি। তা হলেও–আপনার গিয়ে চল্লিশটি হাজার ঘরে আসছে। পরের পার্টটাও তো লেখা হতে থাকবে ততদিনে।
সারদাপ্রসাদের মুখটা আহ্লাদে ভরে ওঠে। সারদাপ্রসাদ সেই ভাবনাশূন্য দিনটির কল্পনায় বিভোর হয়ে তাড়াতাড়ি শেষ করতে যায় তার লেখা।
সরোজাক্ষ সেদিকে তাকিয়ে থাকেন। একটি শ্রদ্ধামিশ্রিত স্নেহের সঙ্গে।
তা সরোজাক্ষর অনেক কিছুই উলটোপালটা বইকী! নইলে সারদাপ্রসাদের জন্যে শ্রদ্ধা! স্নেহ করুণা কৃপা দয়া মায়া এগুলো না হয় ক্ষ্যামাঘেন্নার ব্যাপার। কিন্তু শ্ৰদ্ধা? সরোজাক্ষর ছেলেমেয়েরা শুনলে হেসে কুটিকুটি হত।
এখন অবশ্য সরোজাক্ষর ছেলেমেয়েদের হাসবার মুড ছিল না। বাবার ওই চাকরি ছাড়ার গোঁয়ার্তুমিতে সকলেই আহত।
বড় ছেলে বলে গেছে, যা করেছেন নিজের দায়িত্বেই করেছেন, আমার কিছু বলার নেই। তবে আমার কাছে সংসার যেন কিছু প্রত্যাশা না করে, এই হচ্ছে আমার সাফ কথা। তবে হ্যাঁ। বলতে পারেন, আমার ফ্যামিলির দায়িত্বটা আমারই। বেশ বলে দিন স্পষ্ট করে, চলে যাব নিজের ফ্যামিলি নিয়ে।
এমনভাবে দাঁড়িয়ে থাকল একটুক্ষণ, যেন অর্ডারটা পেলেই চলে যায়। নেহাত যখন কোনও শব্দ উঠল না ঘরে, নীলাক্ষ শরীরে একটা মোচড় খেয়ে বলে চলে গেল,ঠিক আছে। যখনই অসুবিধে বোধ করবেন, বলে দেবেন।
ময়ূরাক্ষী এল বিকেলে।
বউদিকে টেক্কা দেওয়া সাজ সেজে। এসেই পাখার স্পিডটা বাড়াল। তারপর বলল, আপনি হঠাৎ এমন একটা তিলকে তাল করা কাণ্ড করবেন বাবা, এটা আমাদের ধারণার বাইরে ছিল। আশ্চর্য! ঘেরাও আজকাল কে না হচ্ছে? প্রাইম মিনিস্টার থেকে হাইকোর্টের জজ পর্যন্ত বাকি আছে কেউ? সবাই কাজকর্ম ছেড়ে দিচ্ছে?
সরোজাক্ষ একটু হেসে বললেন, তুমি আমায় হিতোপদেশ দিতে এসেছ, না কৈফিয়ত তলব করতে এসেছ?
