সে বাড়িটা বিজয়া যে বাড়িটায় বিয়ে হয়ে এসেছিল, সেটা ছিল ভাড়াটে বাড়ি। পুরনো ধরনের বাড়িটা, তিনতলাটা পুরো ছাদ। ঘর মাত্র একখানাই।
বিয়ের আগে থেকেই ঘরটার অধীশ্বর ছিল সরোজা নামের সেই পড়ুয়া ছেলেটা। বিজয়া এল তারপর। অধীশ্বরী হয়ে বসল।
কিন্তু শুধু ঘরের অধীশ্বরী হয়ে কী লাভ বিজয়ার?
চাবি সংগ্রহে হতাশ হয়ে নিজের চাবির রিংটা নিয়ে যে কটা চাবি দিয়ে চেষ্টা করা সম্ভব, তা করে বিফল হয়ে মরিয়া বিজয়া করে বসল–এক কাণ্ড। বাক্সটার ডালার খাঁজে একটা ছুরি ঢুকিয়ে চাড় দিতে বসল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে সরোজা এসে ঢুকলেন জ্বরে টলতে টলতে।
ঢুকে থমকে দাঁড়ালেন এবং দেখতে পেলেন, সুন্দর কারুকাজ করা সেই মহীশূরী চন্দনকাঠের বাক্সর ডালার খানিকটা অংশ উপড়ে বেরিয়ে এল ছুরির সঙ্গে, ডালাটা খুলে গেল চাবির কজা আলগা হয়ে।
সরোজাক্ষ খাটের উপর বসে পড়ে ঘরটাকে দেখে নিলেন, দেখে নিলেন বিজয়াকে। রুক্ষ গলায় বললেন, এসব কী?
এতখানি ভয়ংকর মুহূর্তে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করতে সাহস করল না বিজয়া, তাই খুব তাড়াতাড়ি বলে উঠল,ও মা তুমি এমন অসময়ে যে? ঘরটর সব এলোমেলো করে ঝাড়াঝুড়ি করছিলাম—
সরোজাক্ষর মাথা ছিঁড়ে পড়ছিল, সরোজাক্ষ তবু শুয়ে পড়েননি, আরও রুক্ষ গলায় বলেছিলেন, ওই বাক্সটার ভিতরের ঝুল ঝাড়ছিলে?
বাক্সটা!
এর কী জবাব দেওয়া যায় ভেবে না পেয়ে বিজয়া চুপ করে গিয়েছিল। আর বোধ করি মনে মনে শক্তি সংগ্রহ করছিল। সরোজাক্ষ খাট থেকে নেমে বাক্সটাকে হাতে নিয়ে তার দুর্দশা দেখলেন, তারপর তার ভিতর থেকে একগোছা কাগজপত্র বার করে বাড়িয়ে ধরে ঘৃণা আর ব্যঙ্গে তিক্ত গলায় বলে উঠলেন, প্রেমপত্র খুঁজছিলে? নাও! পড়ে দেখো। যদি অবশ্য পড়বার ক্ষমতা থাকে।
কাগজপত্রগুলো সরোজাক্ষর ইউনিভার্সিটির সার্টিফিকেট, চশমার প্রেসক্রিপশন, ক্যামেরার গ্যারান্টিপত্র ইত্যাদি। হয়তো উপহার পাওয়া শৌখিন আধারটায় ওই সার্টিফিকেটগুলোই রাখতে ইচ্ছে হয়েছিল সরোজাক্ষর, তারপর এটা ওটা ঢুকে পড়েছে। চাবিটা পাছে হারিয়ে যায় বলে মায়ের কাছে রেখে দিয়েছিলেন সরোজাক্ষ।
বিজয়ার হৃতশক্তি ফিরে আসছিল, যে শক্তিটা নাকি ধৃষ্টতার গর্ভজাত। ধৃষ্টের গলাতেই বলে উঠেছিল বিজয়া, বাব্বা। এইসব জিনিস আবার মানুষে এত বাহারি করে রাখে তা কী করে জানব?
সরোজাক্ষ আর কথা বলেননি।
শুধু সরোজাক্ষর চোখমুখ দিয়ে ঘৃণা উপচে উঠেছিল। ঘৃণার সেই প্রথম প্রকাশ। তারপর সারাজীবনই প্রতিনিয়ত ধরা পড়ে যায় সেই ঘৃণা, সেই ব্যঙ্গ।
সরোজাক্ষর বাবা মারা যেতে বিজয়া যখন ডুকরে-ডুকরে কেঁদেছিল, ওগো আমার রাজা শ্বশুর ছিল যে গো! ওগো–আমি যে রাজকন্যের আদরে ছিলাম গো–ইত্যাদি আখর দিয়ে দিয়ে, সরোজাক্ষ মৃতের বিছানা থেকে উঠে এসে বলেছিলেন, তোমার এই শোকটা যদি চালাতেই হয়, তো তিনতলায় নিজের ঘরে যাও।
সরোজাক্ষর মা মারা গিয়েছিলেন তার আগে। বিজয়া তখন সধবা শাশুড়ির হাতের লোহা আর পায়ের আলতার প্রসাদ নেবার জন্যে কাড়াকাড়ি করেছিল। সরোজাক্ষ তীব্র গলায় বলেছিলেন, তোমার এই ভক্তি নাটকটা বড় বেশি ওভার অ্যাকটিং হয়ে যাচ্ছে বিজয়া, অসহ্য লাগছে।
এমন অনেক উদাহরণ আছে বিজয়ার দাম্পত্যজীবনে, যা নাকি অপরের চোখেও ধরিয়ে দিয়েছে সেই জীবনের ফাঁকি। সেই আক্রোশ বিজয়াকে উগ্র করেছে, নির্লজ্জ করেছে। এবং শেষ পর্যন্ত বিজয়াই বিজয়িনী হয়েছে।
বিজয়িনী তো হবেই।
মোক্ষম হাতিয়ার যে এসে গেছে তখন তার হাতে। ঝুপঝাঁপ করে চার চারটে ছেলেমেয়ে এসে গেছে।
হয়তো সবগুলোই সরোজাক্ষর দুর্বলতার সাক্ষী নয়, বিজয়ার বেহায়ামির কারণ, কিন্তু সে ইতিহাসের তো সাক্ষী নেই। সরোজাক্ষ তো বিজয়ার মতো অপরের কান বাঁচাবার চেষ্টামাত্র না করে সরবে প্রশ্ন করবেন না, তখন মনে পড়েনি? সরোজাক্ষ তো ঘোষণা করবেন না, বড় যে ঘেন্না আমার ওপর, বলি এগুলো এল কোথা থেকে? রাস্তা থেকে কুড়িয়ে এনেছি? সরোজাক্ষ তো হেসে হেসে বলবেন না, এদিকে তো তেজে মটমট, বলি সে তেজ থাকে? তেজ ভেঙে মাথা মুড়োতে আসতে হয় না? মনে ভাবো সাক্ষী থাকে না, কেমন? বলি আগুন কি ছাইচাপা থাকে?
হ্যাঁ, বিজয়া এসব কথা অনায়াসে উচ্চারণ করতে পারত, আর সরোজাক্ষর নিরুপায়তায় মনে মনে হাসত। আবার সেই বিজয়াই কোনও এক সাক্ষীহীন শান্ত অন্ধকারকে নখে আঁচড়ে আঁচড়ে কেঁদে কেঁদে বলত, না হয় রাগের মাথায় একটা অন্যায় কথা বলেই ফেলেছি, তাই বলে তুমি আমায় ত্যাগ করবে? তা হলে খানিকটা বিষ এনে দাও আমায়, খেয়ে মরি। বেহায়া উদ্ধত, আর আত্মসম্মানজ্ঞানহীন স্ত্রীর কাছে স্বামী নামক জীবটা যে কত অহায় সেকথা হয়তো কেবলমাত্র তার সৃষ্টিকর্তাই জানেন।
.
অবশ্য এখন নাটক অন্য দৃশ্যে পৌঁছেছে। এখন বিজয়া আত্মস্থ গলায় বলতে পারছেন, ব্যাঙ্কে তোমার কত টাকা আছে?
হঠাৎ কথাটা সরোজাক্ষর অবান্তর বলে মনে হয়েছিল।
তারপর ভাবলেন, বিজয়া কোনও মোটা খরচের ধাক্কায় ফেলতে চাইছেন তাঁকে। হয়তো কোনও ব্যয়সাপেক্ষ ব্রত, হয়তো কোনও সুদূর তীর্থযাত্রার সংকল্প।
কিন্তু সে মুহূর্তের জন্যেই।
বিজয়ার বিদ্রূপ কুঞ্চিত মুখে বিজয়ার প্রশ্নের আসল মানেটি লেখা ছিল। অতএব সরোজাক্ষ উত্তর দিলেন না, অন্যদিকে তাকিয়ে থাকলেন।
