এখন এই বৃষ্টি থামা না-থামা নিয়ে বাজি ফেলতে একবার ইচ্ছে করল নীলেন্দুর। যদি পনেরো মিনিটের মধ্যে থামে তবে সে দেবীদির কথামতন একবার পরিতোষের কাছে যাবে। যদি না থামে, কোনও দিনই যাবে না।
বাজিটা অবশ্য ফেলল না নীলেন্দু।
.
আধঘণ্টার মাথায় বৃষ্টি অনেকটা কমে এলে নীলে নীচে বাথরুমে চলে গেল। ফিরে এসে মুখ মাথা হাত পা মুছল। পরনে পাজামা, গায়ে গেঞ্জি। খাওয়া-দাওয়া হতে এখনও অনেক দেরি।
বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়ল নীলেন্দু। ঘুমোতে ইচ্ছে করছিল যে তা নয়, অন্ধকারে চুপচাপ শুয়ে থাকতে ইচ্ছে হচ্ছিল, যদি শুয়ে থাকতে থাকতে ঘুমিয়েও পড়ে ক্ষতি নেই, মায়া এসে ডেকে নিয়ে যাবে খাবার ঘরে।
চুপচাপ শুয়ে থাকতে ভালই লাগছিল নীলেন্দুর। জানলা খুলে দিয়েছে। বৃষ্টিভেজা ঠাণ্ডা বাতাস আসছিল। বাতাসে হয়তো দু-চার ফোঁটা জলবিন্দু উড়ছে, আপাতত বৃষ্টি নেই, আকাশে বিদ্যুৎচমক রয়েছে, মেঘ ডাকছে এখনও।
শুয়ে থাকতে থাকতে থাকে নীলেন্দু কেমন করে যেন পিছু হটতে হটতে তার প্রথম যৌবনে চলে গেল। দেবীদির সঙ্গে তার প্রথম আলাপ-পরিচয়ের মধ্যে কোনও ঘটনা নেই। দেবীদির ছোড়দার কাছে। ও-বাড়িতে যেত, আসা-যাওয়া করতে করতে আলাপ। দেবীদির সঙ্গে আলাপ হবার পর নীলেন্দু একদিন দুটো টিকিট নিয়ে এল ম্যাজিকের, পাড়ার চ্যারিটি শো; ছোড়দা যাবে না, জ্বর হয়ে বিছানায় শুয়ে রয়েছে, দেবীদিকে নিয়ে নীলেন্দু ম্যাজিক দেখতে চলল একটা সিনেমা হাউসে। পাশাপাশি বসে ম্যাজিক দেখতে দেখতে দেবীদি হঠাৎ বলল, তোমার ভাল লাগছে? .নীলেন্দুর মোটামুটি লাগছিল, বলল, জমছে না। বড় বড় খেলা না হলে জমে না। দেবীদি বলল,ছেলেমানুষি খেলা। …চলো বাইরে যাই, চা কফি খেয়ে আসি। …খানিকটা পরে দুজনেই বাইরে এসে হাঁফ ফেলল। দেবীদি বলল, বাব্বা বাঁচলাম, চলো অন্য কোথাও যাই, বেড়িয়ে আসি। …সেটা শরৎকাল, তখনও তেমন রাত হয়নি; একটা দোকান থেকে চা খেয়ে দুজনে হাঁটতে হাঁটতে কাছাকাছি গড়ের মাঠের এক জায়গায় গিয়ে বসল। আকাশে তারা, আশেপাশে বড় বড় গাছ, কাছাকাছি ট্রাম লাইন, কিছু কিছু লোকজন সামনের পিচের রাস্তা দিয়ে হাঁটাচলা করছিল। দেবীদি হঠাৎ কেমন মনখোলা হয়ে গেল, কত গল্পই না করল, ছেলেবেলার, বাবার গল্প, মার গল্প, কথায় কথায় কী হাসি, কত রকম মজার মজার কথা। নীলেন্দুর খুবই ভাল লেগেছিল। মনে হয়েছিল, বাড়িতে দেবীদির কথা বলার মতন কেউ নেই, মন খুলে গল্প করার মতন কাউকে পায় না, সে যেন কেমন নিঃসঙ্গ। নীলেন্দুকে সঙ্গী হিসেবে বোধ হয় ভাল লেগেছে দেবীদির।
সত্যিই যে ভাল লেগেছিল তাতে কোনও সন্দেহ নেই। দেখতে দেখতে দুজনে খুব মেলামেশা ভাবসাব হয়ে গেল। নীলেন্দুকে ছাড়া যেন দেবীদির চলত না।
এই, কাল একটা শাড়ি কিনতে যাব, যাবি?
কোথায়?
নিউ মার্কেটে।
তারপর?
তোকে আইসক্রিম খাওয়াবে।
একটা টেরিফিক ছবি হচ্ছে, জেমস বন্ড। দেখাবে?
না।
কেন?
জেমস বন্ড আমার ভাল লাগে না। গাঁজাখুরি।
তুমি কিসসু বোঝ না। বন্ড দেখাও তোমার সঙ্গে শাড়ির দোকানে যেতে রাজি।
এই অন্তরঙ্গতা, বন্ধুত্ব এমন একটা সহজ সম্পর্কে দাঁড়াল ক্রমশ যে নীলেন্দু বা দেবযানী কেউই, স্বভাবতই যা হতে পারত, একটা সীমানার তলায় নেমে গেল না। নামলে ক্ষতি ছিল না, দুজনেই সাবালক, জীবনের চাহিদা এবং ঝোঁক তাদের অজানা নয়, সহজেই যুগল জীবনের অন্তর্গত হতে পারত। কিন্তু হয়নি। সম্ভবত দুজনেই বুঝত, সংসারের ধরাবাঁধা নিয়মের মধ্যে বাঁধা পড়ে গেলে তাদের এই সরল অথচ গভীর সম্পর্ক যেন কোথাও তার গৌরব হারাবে।
নীলেন্দু মাঝে মাঝেই ঠাট্টা করে বলত, দেবীদি,দড়ির ওপর দিয়ে কেমন হাঁটছি বলো তো? আমি কিন্তু ব্যালেন্স-মাস্টার।
দেবযানী আরও কৌতুকময়ী হয়ে বলত, দড়ি খুব নড়ছে; আমাকে ফেলে দেবার চেষ্টা..
নেভার। তোমায় কে ফেলে! তুমি ছাতা হাতে যা ব্যালেন্স করছ!
না করে উপায়, তুমি পড়লে আমিও পড়ব; আমি পড়লে তোমাকেও ফেলব।
পড়াপড়ির দরকার কী! সবাই তো পড়ে, আমরা পড়ব না। লোকের চোখ ছানাবড়া করে দেব।
হাসি-তামাশা ঠাট্টা এসবের মধ্যে মাঝে মাঝে আচমকা কোনও গাম্ভীর্য এসে যেত। তখন যেন মনের কোথাও কোনও অপ্রকাশ্য অনুভব দুজনকেই গম্ভীর, অন্যমনস্ক, বিষণ্ণ করে তুলত।
একদিন গঙ্গার ঘাটে বসে প্রায়ান্ধকারে দেবযানী বলেছিল, এক এক দিন আমার যে কী হয়…বড় ফাঁকা লাগে।
নীলেন্দু বলেছিল, আমারও লাগে।
কী হবে বলতে পারো?
পারি না। ….যেটা যেকোনও সময়ে হতে পারে–সেটা হলে আমার বা তোমার যে বরাবর ভাল লাগবে তাও যেন মনে হয় না, দেবীদি। তখন আফসোস করার চেয়ে এই মনখারাপটা ভাল। নয় কি?
দেবযানী কী মনে করে নীলেন্দুর হাত কোলে টেনে নিয়ে চুপ করে বসে থাকত।
এই অবস্থাতেই, যখন একে অন্যকে নিকটতম সঙ্গী, সবচেয়ে বড় বন্ধু, ঘনিষ্ঠতম করে অনুভব করত তখন মহীতোষের সঙ্গে দেবযানীর পরিচয়। অবশ্য একথা বলা ভাল, আরও কিছু আগে থেকে নীলেন্দু অন্য দিক থেকে জড়িয়ে পড়ছিল। দেবযানীর সঙ্গে যোগাযোগ না হারালেও দুজনের প্রায় নিত্য দেখাসাক্ষাৎ ঘটত না। দেবযানী রাগ করত, ঝগড়া করত, বকত, নীলেন্দু যখন লেখাপড়া ছেড়ে দিল তখন দেবীদির কী রাগ। প্রথম প্রথম নীলেন্দু সত্য কথাটা ভাঙতে চায়নি, আজেবাজে অজুহাত দিয়ে, মিথ্যে কথা বলে ভুলিয়েছে দেবযানীকে। পরে সত্যটা বলল।
