চিঠিতে তো সব কথা লেখা যায় না, লিখতেও লজ্জা করে। তুমি এসে আমাদের যা দেখে গেছ, জেনে গিয়েছ–তার পরও অনেক পরিবর্তন ঘটে গেল এই কমাসেই। আমি সেসব কথা লিখব না। একটা কথা শুধু বলি, যত দিন যাচ্ছে তোমার মহীদা ততই আমার কাছে দূরের জিনিস হয়ে যাচ্ছে। আজকাল মাঝে মাঝেই কথা কাটাকাটি হয়, আগেও হয়েছে কিন্তু আগে আমাদের মধ্যে যা ছিল এখন যেন তা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলে সামান্য মন কষাকষিতে যে অশান্তি হয় তার জের আর কাটতে চায় না।
যাকগে, আমার কথা থাক। তোমার মহীদার হয়তো মন ভেঙে যাচ্ছে। তার মন ভাঙুক আমি তা চাই না। কিন্তু টাকা পয়সা না পেলে কাজকর্ম কেমন করে হবে? তুমি একবার পরিতোষের সঙ্গে দেখা করে কিছু করতে পারলে বড় ভাল হয়। পরিতোষকে তুমি এখানকার ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিয়ো।
তোমার খবর-টবর কিছুই জানতে পারি না। যদি অনিচ্ছা না থাকে জানিয়ে। তোমাদের বাড়ির খবর লিখো। সবাই ভাল আছে তো? আমি নিজের গরজে চিঠি লিখলাম। তবু তোমার চিঠির আশায় থাকব।
ইতি তোমার দেবীদি।
চিঠিটা বার দুই পড়ল নীলেন্দু। ততক্ষণে বর্ষা নেমে গিয়েছে প্রবল ভাবে। বাতাস ঠাণ্ডা। জলের ঝাঁপটা এসে ঘর ভিজে যাচ্ছিল।
জানলাটা বন্ধ করে দিয়ে এল নীলেন্দু। দরজা দিয়ে জলের ছাট আসছে না। সমস্ত ছাদ জুড়ে বৃষ্টি পড়ছে, শব্দ হচ্ছে, কালো ছাদ সন্ধের অন্ধকার আর বর্ষার ঘটায় একেবারে যেন অন্ধকার।
নীলেন্দু দরজার কাছে কিছুক্ষণ অন্যমনস্কভাবে দাঁড়িয়ে থাকল। কোনও কিছুই তার মনে স্থিরভাবে বসছিল না, কোনও একটি ভাবনাতেই তার চিন্তা বাঁধা থাকছিল না–আজ পাঁচ-সাত বছরের নানা দৃশ্য যেন ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে বিক্ষিপ্তভাবে তার মনে আসছিল, আবার চলে যাচ্ছিল।
দরজার কাছে থেকে চলে এল নীলেন্দু। তার ঘরে আসবাবপত্রের বাহুল্য নেই। একটা সরু খাট, বইয়ের র্যাক আর টেবিল চেয়ার–সবই পুরনো আমলের, খাটের আলমারি–সেটাও বছর তিরিশের পুরনো।
নীলেন্দু যেন অবসাদ বোধ করে সিগারেট ধরাল, বিছানায় এসে বসল। খোলা দরজা দিয়ে এলোমলো বাতাস আসছে বাদলার। প্রথম বর্ষার এই বৃষ্টি অনেকক্ষণ হয়তো চলবে। গত এক সপ্তাহে একদিন মাত্র জোর বৃষ্টি হয়েছিল, বাকি দু-তিন দিন অল্পস্বল্প। পাখা চালাবার কোনও প্রয়োজন বোধ করল না নীলেন্দু, ঘর ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছে। হাই তুলে বিছানার ওপর শুয়ে পড়ল, কোমরের ওপর অংশটা বিছানায়, বাকিটা ধনুকের মতন বাঁকা হয়ে খাটের পাশে ঝুলছে, পা মাটিতে।
কড়িকাঠের দিকে শূন্য চোখে চেয়ে থাকতে থাকতে নীলেন্দু সিগারেটের অর্ধেকটা শেষ করে ফেলল, ছাই উড়ে বিছানায় পড়েছে তার খেয়াল নেই।
দেবযানীর এই চিঠি নীলেন্দুর প্রথমে পছন্দ হয়নি। বিতৃষ্ণা, নাকি একেবারেই অনুৎসাহ বোধ করেছিল। হয়তো এক ধরনের নিষ্ঠুর সুখও বেশ হয়েছে, খুব ভাল হয়েছে; এই রকমই হওয়া দরকার ছিল, মহীদা খানিকটা শিক্ষা পেয়েছে, আরও পাবে। নীলেন্দু পরিতোষের কাছে যাবে না, তার যাবার কোনও দরকার নেই। কেন যাবে? যখন তোমরা কলকাতা ছেড়ে পালিয়েছিলে তখন কি নীলেন্দুকে বলে গিয়েছিলে? পালিয়ে যাবার পর এতকাল তোমরা কি নীলেন্দুকে মনে করে একটা চিঠি লিখেছ? তখন নীলেন্দুকে তোমরা বিশ্বাস করতে পারোনি, ভয় ছিল পাছে কোনও গোলমালের মধ্যে জড়িয়ে পড়ো, অথচ আজ তোমরা দায়ে পড়ে আবার তার শরণাপন্ন হচ্ছ।
বিছানার ওপর অল্প উঠে বসে সিগারেটের টুকরোটা দরজার দিকে ছুঁড়ে দিল নীলেন্দু। আবার শুয়ে পড়ল।
দেবীদি যদি কাছে থাকত, বা এমন হত দেবদির সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলা যেত, নীলেন্দু এই মুহূর্তে স্পষ্টই বলত, নো নো, আমি কোথাও যেতে পারবনা। পরিতোষ-টরিতোষকে কিছু বলা আমার দ্বারা হবে না। তোমাদের ব্যাপার তোমরা বোঝো, আমায় জড়িয়ো না।
বলতে কী, দেবীদির এই অনুরোধের কোনও মানে হয় না। নীলেন্দু পরিতোষের কেউ নয়, মহীদার সুবাদে অবশ্য ভাল আলাপ আছে পরিতোষের সঙ্গে, খুব যে পছন্দও করে তাকে পরিতোষ তাও হয়তো নয়, কাজেই নীলেন্দু গিয়ে কিছু বললে যে পরিতোষ কথা শুনবে এমন মনে করার কারণ নেই কিছু। দুই ভাইয়ের ব্যাপারে বাইরের লোকের নাক গলানোও উচিত নয়।
নীলেন্দু পরিতোষের কাছে যাবে না–এটা স্থির করে নিয়ে নিজের মনেই মাথা নাড়ল। এবং ব্যাপারটা মাথা থেকে তাড়িয়ে দেবার চেষ্টা করে অন্য কিছু ভাববার চেষ্টা করল। বৃষ্টির শব্দ শোনার জন্যে কান পেতে থাকল কিছুক্ষণ, তারপর আজ সকালে ছোটকাকার এক দেড়মনী মক্কেলের রিকশা থেকে নামার হাস্যকর দৃশ্য ভাববার চেষ্টা করল। দুপুরে মেজোকাকিমার সঙ্গে মায়া-মেজোকাকিমার মেয়ের মজার ঝগড়া, খানিকটা আগে ট্রামে দুই ভদ্রলোকের হাতাহাতি–এই সব টুকরো টুকরো দৃশ্যে মন ধরে রাখার চেষ্টা করল।
নানা রকম চেষ্টা সত্ত্বেও সেই মহীদা আর দেবীদি, কানা মাছির মতন ঘুরে ঘুরে মনে এসে বসছে। নীলেন্দু বিরক্ত হয়ে উঠল। তার রাগই হচ্ছিল শেষ পর্যন্ত।
বৃষ্টির সেই ঝমঝমে ভাবটা কমে আসছে। থেমে যাবে? না কি থামবে না? একসময় দেবীদির সঙ্গে তার এই বৃষ্টি থামা না-থামা নিয়ে বাজি হত। যেমন দুজনে কোথাও যাবে বলে অপেক্ষা করছে, বৃষ্টি এল; দেবীদি বলল, মিনিট পনেরোর মধ্যেই থামবে–নীলেন্দু বলল, আধঘণ্টার আগে নয়, সঙ্গে সঙ্গে বাজি ধরে ফেলল দেবীদি, তোমায় একটাকার খাওয়াব; নীলেন্দু বলল, দু টাকার খাওয়াব তোমাকে, তোমায় সিনেমা দেখাব, তোমায় থিয়েটার দেখাব..এই চলত। কখনও দেবীদি জিতে যেত, কখনও নীলেন্দু।
