দেবাযানী বলল, তুমি ওদের সঙ্গে গিয়ে ভিড়েছ?
না।
না মানে? এই বলছ…
আমি তোমায় কিছু বলিনি এখন পর্যন্ত শুধু বলেছি–লেখাপড়া করে কী হবে, এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জে আরও একটা বাড়তি নাম লিখতে হবে। তা ছাড়া তোমায় সত্যি বলছি দেবীদি, লেখাপড়ায় আমি বরাবরের গবেট। কান ছুঁয়ে ছুঁয়ে তরে এসেছি। আমার কোনও ইন্টারেস্ট নেই লেখাপড়ায়…
তা হলে তোমার বাবার সঙ্গে ব্যবসাপত্র করতে বসো গে যাও।
অসম্ভব। ও আমার দ্বারা হবে না।
কী হবে তোমার দ্বারা?
সেটাই ভাবছি। বোধ হয় কিছু হবেনা। ওয়ার্থলেসদের কিছুই হয় না। দেখোনা, আমার ছেলেবেলা থেকে একটাই মাত্র অ্যামবিশান ছিল কলকাতার মাঠে নাম্বার ওয়ান প্লেয়ার হব ফুটবলের। সে অ্যামবিশান শালা কবেই ভেঙে গিয়েছে, এখন আমি ফুটবল খেলার মাঠেও যাই না।
চুলোয় যাক তোমার ফুটবল। শোনো, আমি তোমায় বলছি, তুমি আজকালকার এইসব হুজুগে মেহতা না। মাতলে নিজেই বুঝবে অবস্থা কী দাঁড়ায়।
তুমি একটা জিনিস ভুল করছ দেবীদি, আজকাল যা অবস্থা তাতে একেবারে সরে এসে দাঁড়িয়ে থাকা মুশকিল। তুমি মেয়ে, তোমার সরে থাকার উপায় আছে, আমাদের নেই, আমরা সামনাসামনি দাঁড়িয়ে আছি।
তোমার মাথায় কে এই পোকা ঢোকাল নীলু? তোমার কোন বন্ধু? আমি যদি তাকে দেখতে পেতাম বুঝিয়ে দিতাম…
নীলেন্দু হেসে বলল, তোমায় একদিন এক জায়গায় নিয়ে যাব, যাবে? তোমাদের আড্ডাখানায়?
না। চলো না একদিন, যাবে?
আমার দরকার নেই।
এরও বেশ কিছু পরে একদিন নীলেন্দু দেবযানীকে নিয়ে মহীতোষের কাছে গেল।
.
নীলেন্দু ঘুমোয়নি, ভাবছিল; আচমকা মায়ার ডাক শুনল, মেজদা, ও মেজদা…।
বিছানায় উঠে বসার আগেই নীলেন্দু দেখল, মায়া ঘরের বাতি জ্বেলে দিয়েছে।
.
০৯.
পরিতোষের কাছ থেকে উঠে পড়ার সময় নীলেন্দু বলল, তুমি নিজেই একবার ঘুরে এসো না!
মাথা নাড়ল পরিতোষ। তার অনিচ্ছা যে কত তীব্র মাথা নাড়ার ভঙ্গিতেই বোঝা যায়।
নীলেন্দুর হাসি পাচ্ছিল। কিছু বলল না, তাকিয়ে থাকল। মহীতোষের সঙ্গে পরিতোষের কোথাও কোনও মিল নেই, চেহারায় নয়, মুখের আদলেও নয়। স্বভাব সম্পূর্ণ আলাদাই। পরিতোষ এখনও বয়েসে নিশ্চয়ই ছেলেমানুষ–অন্তত মহীতোষের তুলনায়, কিন্তু তাকে অনেক বেশি সাবালক মনে হয়। জীবনের নানা অভিজ্ঞতা তাকে সক্ষম, সাবধানী, চতুর করেছে, তার চোখমুখ নির্বোধের নয়, উচ্ছ্বাসপূর্ণ কোনও রেখা সচরাচর তার মুখে ফোটে না। পরিতোষ কিন্তু ভদ্র, বিনীত, স্বাভাবিক। তার কথাবার্তা স্পষ্ট।
আপনি কি কিছু লিখবেন, না আমি লিখব? পরিতোষ জিজ্ঞেস করল।
তুমিই লিখে দিয়ো মহীদাকে; আমি দেবীদিকে লিখব।
পরিতোষ কমুহূর্ত নত চোখে যেন কী ভাবল, তারপর মুখ তুলে বলল, সমস্ত টাকাটাই জলে যাবে। আমি এতদিন ধরে গড়িমসি করছিলাম, ভাবছিলাম দাদার খেয়াল মিটে গেলে আবার বাড়িতে ফিরে আসবে। দু দুবার খদ্দের ঠিক করেও শেষ পর্যন্ত এড়িয়ে গিয়েছি। আপনিই বলুন নীলেন্দুদা, আজকাল যেরকম অবস্থা তাতে নিজের থেকে কিছু করা মুশকিল। বাপঠাকুরদা যা রেখে গেছে সেটা বেচে দিয়ে কী লাভ! দায়ে দরকারে পড়লে মানুষ নিশ্চয় বেচে দেয়। কিন্তু দাদার এই আহাম্মকির জন্যে বাড়ি বেচে দেবার কোনও মানে হয় না। যাক গে, যে বুঝবে না–তাকে আর বুঝিয়ে কী লাভ। চিঠির পর চিঠি আর তাগাদা। রানু আমায় বকে, বলে দাদা আমাকে কী ভাবছে। মেয়েরা এসব ব্যাপার বোঝে না। …তা বউদিকেও আমি দোষ দিই। এত টাকা এভাবে দাদার হাতে তুলে দেওয়া উচিত হয়নি। ঠিক কিনা বলুন।
নীলেন্দু বলল, আমি আর কী বলব ভাই। যার টাকা সে যদি দেয়…
দিয়েই ভুল করেছে। ..টাকা হাতে পেলে খেয়াল মেটাবার শখ অনেকেরই হয়।
নীলেন্দু উঠে পড়ল। রাত হয়ে যাচ্ছে।
পরিতোষ বলল, আপনি বউদিকে লিখে দিন, যা করার আমি করবার চেষ্টা করছি। দাদাকে আমি চিঠি দেব। …দেখি কিছু টাকার যদি ব্যবস্থা করতে পারি।
নীলেন্দু আর দাঁড়াল না, হাত তুলে বিদায় জানাবার ভঙ্গি করে বলল, চলি
পরিতোষ নীলেন্দুকে এগিয়ে দেবার জন্যে উঠে পড়ল।
বাড়ির বাইরে এসে পরিতোষ হঠাৎ বলল, আপনাদের ব্যাপারটা তা হলে শেষ পর্যন্ত ভেঙে গেল!
তাকাল নীলেন্দু। পরিতোষ কি তাকে ঠাট্টা করছে, নাকি সান্ত্বনা দিচ্ছে বোঝবার চেষ্টা করল। বলল, তুমি মহীদা আর আমাদের কথা বলছ? ..হ্যাঁ, তা ভেঙেই গিয়েছে বলতে পারো। বলে নীলেন্দু আর অপেক্ষা করল না, কেননা পরিতোষ অত বোকা নয়, সে আরও কিছু জিজ্ঞেস করে ফেলতে পারে, করলে নীলেন্দুর এই চালাকি ধরা পড়ে যাবে।
খানিকটা ব্যস্ত ভাবে নীলেন্দু গলিটুকু বেরিয়ে এল। সিগারেট ফুরিয়ে গিয়েছে। বড় রাস্তায় দাঁড়িয়ে এপাশ ওপাশ তাকাল। সামান্য এগিয়ে পানের দোকান।
দেবীদের জন্যে শেষ পর্যন্ত আসতেই হল তাকে। এসে কোনও কাজ হল কিনা সে জানে না। জানার দরকারও নেই। তবে পরিতোষের ব্যাপারটা বোঝা গেল। পরিতোষ অনেক হিসেবি ছেলে, তার দূরদৃষ্টি রয়েছে। যে পুরনো বাড়িটা বেচে দেবার জন্যে মহীদা এত ছটফট করছে–সেই পুরনো বাড়ির গায়ে বড় বস্তি, ভাঙা লোহালক্কড়ের আড়ত, পুরনো ময়লা কাগজ জমাবার গুদোম–এ সমস্তই ভেঙে চুরে মাঠ করে একটা নতুন রাস্তা বেরুচ্ছে। মানে নতুন রাস্তা তৈরির কথা। আশেপাশের কিছু বাড়িঘরও তাতে ভাঙাচোরা পড়বে। কাজেই মহীদাদের পুরনো বাড়ি আর দু-চার বছর পরে যথেষ্ট মূল্যবান হয়ে উঠবে। জমির দরই কত বেড়ে যাবে। এ সময় ওই বাড়ি বিক্রি করা লোকসান, কটা বছর অপেক্ষা করে বেচতে পারলে দারুণ লাভ। পরিতোষ এই ব্যাপারটা ফেলতে পারে না, দাদার মতন সে নির্বোধ নয়। যদি শেষ পর্যন্ত বেচতেই হয়–পরিতোষ কী করবে নীলেন্দু জানে না তবে যতটা পারে উঠিয়ে নেবার চেষ্টাই হয়তো সে করবে। যা করার করুক, মহীদাদের পারিবারিক ব্যাপারে তার গরজ নেই।
