কী আশ্চর্য, শুভেন্দু হাসপাতাল থেকে ফিরল, শীত তখন ফুরিয়ে গিয়েছে, একটা মানসিক স্বস্তি ফিরে এল, তার পরই দোলের সময় বাবা বাড়িতে সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে মাথা ঘুরে পড়ে গেল। ধরাধরি করে বিছানায় এনে শোয়ানোর পর পরই মনে হল, বাবা আর নেই। পাড়ার ডাক্তার ছুটে এল। বলল, হার্ট অ্যাটাক বলেই মনে হচ্ছে।
বাবাকে নিয়ে দেড়-দু মাস কাটল। সত্যিই হার্ট অ্যাটাক। দোকানপত্রে আসা-যাওয়া বন্ধ হল, খাওয়া-দাওয়ায় ধরা কাটা, পনেরো দিন অন্তর ব্লাড সুগার দেখানো, হাঁটা-চলাও নিষেধ।
গরমের মুখে বাবা মোটামুটি সুস্থ হলেও আর স্বাভাবিক হতে পারল না। দোকান যাওয়া স্থায়ী ভাবে বন্ধ হয়ে গেল।
গরমের শেষাশেষি, যখন বর্ষা নামব নামব করছে তখন একদিন নীলেন্দু একটা চিঠি পেল। দেবযানীর চিঠি।
চিঠি পেয়ে নীলেন্দু অবাক। এটা সে আশা করেনি। বলতে কী, মহীতোষদের আস্তানা থেকে ফিরে আসার পর নীলেন্দু ওই ব্যাপারটা নিয়ে মাথা ঘামাতে চায়নি, অবসরও পায়নি।
সাংসারিক নানা ঝঞ্জাট ঝামেলার মধ্যে মহীদাদের কথা যখনই মনে পড়েছে নীলেন্দু বিরক্তি বোধ করেছে, আর অধিকাংশ সময়ে জোর করে চিন্তাটা সরিয়ে দিয়েছে। মহীদাদের নিয়ে তার করার কিছু নেই, ওদের জীবনের সঙ্গে নীলের জীবনের কীই বা সম্পর্ক! এমনকী নীলেন্দু তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুবান্ধব–যারা মহীদার খোঁজখবর শুনতে উৎসাহী তাদেরও কিছু বলেনি–মহীদাদের সঙ্গে তার দেখাশোনার খবরটা গোপন রেখেছে।
দেবযানীর চিঠি পেয়ে নীলেন্দু অবাক হল। হঠাৎ চিঠি কেন?
সিঁড়ি দিয়ে নিজের তেতলার ঘরে উঠে আসার সময় নীলেন্দু দেখল, সন্ধের মুখে পাতলা বৃষ্টি নেমেছে। আকাশ কালো, বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে ভীষণ ভাবে। বাতাসের প্রবল দমকা থেকে অনুমান করা যাচ্ছিল, একটু পরেই জোর বৃষ্টি নামছে।
নিজের ঘরে এসে নীলেন্দু বাতি জ্বালল। তার ঘর ছোট। এই ঘরটা ঠিক তেতলাতেও নয়, আরও কয়েক সিঁড়ি ওপরে, অনেকটা চিলেকোঠার মতন ঘর। পাশেই বড় ছাদ, ছাদ জুড়ে কত রকম সাংসারিক আবর্জনা, কাপড় শুকোবার খুঁটি, রেডিয়োর এরিয়াল লাগানোর উঁচু উঁচু বাঁশ, কিছু ভাঙাচোরা প্যাকিং বাক্স, একটা মুরগি রাখার বড় খাঁচা, জলের ভাঙা ট্যাংক। ময়লা ছাদ, কালচে আলসের গায়ে কয়েকটা ফুলের টব, গাছ-টাছ নেই, দিনের পর দিন ওই ভাবে পড়ে আছে।
ঘরের জানলা খুলে দিতেই বাতাস এল দমকা। এখনও বৃষ্টি একই ভাবে চলেছে। শুকনো মাটির গন্ধ এবং কেমন একটা গরম ভাপ আসছে। এই বৃষ্টি এখন পর্যন্ত মাটি ভেজাতে পারেনি।
চেয়ারে নয়, একেবারে সরাসরি বিছানায় বসে নীলেন্দু দেবযানীর চিঠিটা আর একবার দেখল। দেবীদিরা কলকাতা ছেড়ে পালিয়ে যাবার পর কিন্তু একটা চিঠি দেয়নি। সেসময় নীলেন্দু কিন্তু আশা করত, কোনও না কোনও দিন সে অন্তত দেবীদি কিংবা মহীদার একটা চিঠি পাবে। অথচ পায়নি।
খাম ছিঁড়ে চিঠিটা বার করে নিল নীলেন্দু।
দেবীদির সেই গোটা গোটা স্পষ্ট মেয়েলি হাতের লেখা। খুবই চেনা। অনেক কাল পরে আবার সেই লেখা দেখতে পেল। হাতের লেখার সঙ্গে মানুষটাই যেন তার চোখের সামনে এসে দাঁড়াল।
দেবীদি লিখেছে:
নীলু,
অনেক লজ্জা নিয়ে তোমায় এই চিঠি লিখছি। তুমি ভাববে যখন আমার নিজের দরকার হল তখন তোমার কথাই আমার মনে পড়ল। কথাটা কিছু মিথ্যে নয়। তা হলেও বলছি, তুমি চলে যাবার পর কতবার ভেবেছি তোমার একটা চিঠি পাব; পাইনি। নিজেরও ইচ্ছে হত চিঠি লিখি তোমায়, নানা রকম ভেবে আর লেখা হত না। আমার চিঠি পেয়ে তুমি অবাক হবে, রাগ করবে, ভাববে আমি বড় স্বার্থপর। সব জেনেও তোমায় চিঠি লিখছি। প্রথমে কাজের কথা বলি।
তোমার মহীদা আজ কমাসেও বিশেষ কিছু করতে পারেনি। তাই সেই ধানের জমি আর কেনা হল না। বর্ষার মুখে আর হবেও না। এখন যার যার জমি তারা চাষের কাজে নেমেছে। তাঁতঘরের কাজকর্ম শুরু হয়েছে। ওদিকে জঙ্গলের দিকে সেই যে দশ বিঘে জমি কিনেছিল–সেই জমি নিয়ে দিনরাত্তির পড়ে আছে। টাকা পয়সার অভাব যাচ্ছে বলেই তোমার মহীদার কাজকর্ম আটকে পড়েছে। আমার যে টাকা ব্যাঙ্কে ছিল তার খানিকটা আবার বাধ্য হয়েই তাকে নিতে হয়েছে, এতে তার মনের শান্তি নষ্ট হচ্ছে। পরিতোষকে চিঠি দিয়ে দিয়ে তোমার মহীদা হয়রান। পরিতোষ বাড়ি বিক্রির কথায় গা দিচ্ছে কি না বুঝতে পারছি না। প্রতিবারই লেখে চেষ্টা করছি। তোমার মহীদা বলছিল কলকাতায় গিয়ে পরিতোষের সঙ্গে কথা বলবে। আমি বললুম, কথা বললেই কি বাড়ি বিক্রি হয়ে যাবে। আমি তাকে আটকে রেখেছি। পরিতোষ হয়তো খুব ঝামেলা ঝাটের মধ্যে ছিল। তার চিঠি থেকে বুঝতে পারলাম–ওর বউ রানুর বাচ্চা হবার সময় বড় বিপদ গিয়েছে। এই সব সাত ঝাটের মধ্যে ও হয়তো বাড়ি বিক্রির ব্যাপারে কিছু করতে পারছে না। আমি ভাবছিলাম, তুমি যদি একবার পরিতোষের কাছে যাও, গিয়ে বুঝিয়ে সব বলল। তুমি সবই দেখে গেছ। তোমার মুখ থেকে শুনলে পরিতোষ টাকার প্রয়োজনটা বুঝবে। ওকে তুমি বলাকওয়া করলে ওর হয়তো চাড়ও হবে। এতদিন ধরে যে কেন কিছুই করতে পারছে না–আমি বুঝতে পারছি না। তোমায় আর বেশি বলে কী করব, সবই বুঝতে পারছ।
তুমি চলে যাবার পর আমি একটা ব্যাপারে বড় ভয় পেয়ে গিয়েছি। এখন আমার প্রায়ই এই সন্দেহ হয়, তোমার মহীদা আমায় কী ভাবে নিয়েছে। আমি কি তার উপলক্ষ মাত্র? কখনও কখনও মনে হয়, তুমি ঠিকই ধরেছ। আমায় তার প্রয়োজন হয়েছিল। এসব কথা মনে এলে কী যে হয় তোমায় বোঝাতে পারব না। আমার সব যেন ফাঁকা হয়ে যা। কী জানি কেন এমন হল? তুমি আমার মনে ওই সন্দেহটা জাগিয়ে দিয়ে গিয়েছ একথা বললে তোমায় দোষ দেওয়া হবে। আমি তা দিতে চাই না। আমার মনের মধ্যেই কোথাও সন্দেহটা হয়তো ছিল, তুমি সেটা নষ্ট করে দিয়ে গেছ।
