নীলেন্দুর বাড়ির আবহাওয়া খানিকটা অদ্ভুত রকমের। আজকের দিনেও একটা পরিবার একান্নবর্তী সংসারের নিয়মকানুন মেনে চলছে এ যেন বড় দেখা যায় না। পুরনো আমলের বাড়ি, তার কড়িকাঠে ঘুণ ধরে যাবার অবস্থা; দালানের ফাঁকে ফোকরে পায়রার দল বাসা বেঁধে নিশ্চিন্তে পড়ে আছে বছরের পর বছর। নীলেন্দুর বাবারা তিন ভাই, তার বাবাই বড়। মেজো ভাই জন্ম থেকেই হাবাগোবা গোছের অথচ দেখতে খুবই সুপুরুষ। বড় ভাই, মেজো ভাইটিকে সেই কৈশোর থেকে নিজের পাশে নিয়ে হাত ধরে হেঁটে চলেছেন। ছোট ভাই দাদার ওপর অতটা নির্ভরশীল না হলেও দাদার অনুগত। তিন ভাই, তাদের স্ত্রী, পুত্রকন্যা এবং অন্যান্য আত্মীয়স্বজন মিলে প্রায় জনা তিরিশেকের সংসার। ভাইরা নিজেদের স্ত্রী কন্যা নিয়ে বাড়ির এক একটি অংশে স্থান পেলেও বড় বড় ছেলেদের থাকা-খাওয়াটা অনেকটা মেসবাড়ির মতন, সবই বারোয়ারি, নিজেদের জন্যে নির্দিষ্ট বলে কিছু নেই।
নীলেন্দু এ বাড়ির ছেলেদের মধ্যে সবচেয়ে বড় যে তা নয়। মেজোকাকার ছেলেই বড়। নীলেন্দুর এক দিদি ছিল, সেই দিদিই এই বংশের প্রথম সন্তান। দিদির পর, নীলের আগে একটি ছেলে এসেছিল, আঁতুড়েই মারা যায়। বাবা মেজোকাকার বিয়ে দেন ওই ঘটনার মাস কয়েক আগে। মেজোকাকার ছেলে বিশুদাই বাড়ির প্রথম পুত্রসন্তানের মর্যাদা পেল; তার পরের বছর বেচারি নীলেন্দু জগতে এল। নীলের পর মেজোকাকার মেয়ে জয়া। এই ভাবে সংসার বেড়ে চলল। ছেলেমেয়েরা আসতে লাগল, প্রায় পিঠোপিঠি। ছোটকাকার বিয়ের পর পুত্রকন্যাদের জন্মহার আরও বাড়ল। এখন হরেদরে হিসেব করলে তিন ভাইয়ের ছেলেমেয়ের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে জনা বারো। তার মধ্যে দু-একজন মারা গেছে। এর সঙ্গে পিসতুতো ভাইবোন জুটে সংখ্যা পনেরো-টনেরোতে দাঁড়িয়ে আছে এখন।
নীলেন্দুর বাবা ব্যবসায়ী মানুষ, বাড়ি তৈরির লোহালক্কড়ের কারবার করেন, মেজো ভাই বরাবরই দাদার সঙ্গে দোকানে বসে। ছোট ভাই অবশ্য ব্যবসায় ঢোকেনি, ওকালতি পাশ করে ব্যাঙ্কশাল কোর্টে প্র্যাকটিস করছে আজ এক যুগ। ভালই চালাচ্ছে।
মেজোকাকার ছেলে বিশুদা এ বাড়ির রীতিনীতিতে প্রথম ঘা দিল। নিজের খুশিমতন বিয়ে করল, স্বজাতের মেয়ে নয়, বিয়ে করে বাড়ি ছেড়ে চলে গেল। এখন দক্ষিণেশ্বরের দিকে থাকে, চাকরি করে ব্যাঙ্কে। বছরে এক-আধবার বউ ছেলেমেয়ে নিয়ে দেখা করতে আসে এই মাত্র, নয়তো বাড়ির সঙ্গে তার আর কোনও সম্পর্ক নেই।
নীলেন্দুর চেয়ে সামান্য ছোট মেজোকাকার মেয়ে জয়াও একসময়ে একটা গোলমেলে কাজ করতে যাচ্ছিল, বাবার চোখে পড়ায় সেটা বন্ধ হল। জয়ার বিয়ে দিল বাবা। ওরা এখন দুর্গাপুরে থাকে। সুখে আছে একথা হয়তো বলা যায়।
বাবার বয়েস হয়ে গেছে, জোকাকারও। বাবাকে বেশ বুড়ো দেখায়, মাথার সমস্ত চুল পাকা, মুখে সারা জীবনের ক্লান্তি, দায়িত্ব বোধের ছাপ পড়েছে গভীর ভাবে। মেজোকাকাও আর সুস্থ নয়, দাদার অবর্তমানে কী করবে সেই দুশ্চিন্তায় এখন থেকেই যেন গুটিয়ে যাচ্ছে। ছোটকাকা সেসব দিক থেকে ভালই রয়েছে। তবে দাদা না থাকলে যে তার ঘাড়েই এই এতগুলো মানুষের বাঁচামরা, আপদ বিপদ, সুখ দুঃখ নির্ভর করছে এ কথা ভেবে মাঝে মাঝে মুষড়ে পড়ে।
ছোটকাকা নীলেন্দুকে কিঞ্চিৎ বেশি স্নেহ করে, কারণ এক সময়ে নীলেন্দুর বাল্যকালে ছোটকাকা তার গুরুগিরি করে গেছে নির্বিবাদে। এখনও মাঝে মাঝে তার বোধহয় ইচ্ছে হয়, ভাইপোকে খানিকটা মানুষ করে তোলার। ক্ষমতায় কুলোয় না।
একদিন হাসপাতালে শুভেন্দুর সঙ্গে দেখা করে ফিরে আসার সময় ছোটকাকা বলল, তুই একটা চাকরি করবি?
চাকরি? কোথায়?
করবি তো বল; আমার এক মক্কেলের হাত আছে। বললেই হয়ে যায়।
নীলেন্দু মাথা নেড়ে বলল, চাকরি আমার দ্বারা হবে না।
হাজার হাজার লোক চাকরি করছে আর তোর দ্বারা হবে না মানে?
ওই দশটা পাঁচটা…
দশটা পাঁচটায় কী হয়েছে! চাকরির একটা সময় আছে। তোর খুশিমতন তো কেউ চাকরি দেবে না।
নীলেন্দু একটু চুপ করে থেকে বলল, আমি পারব না। তুমি অন্য কাউকে দাও। আমার এক বন্ধু তাকে দিতে পারো, বড্ড দরকার তার।
বন্ধু-টন্ধু থাক। এতকাল বন্ধুগিরি করে কেটেছে, এবার নিজের দিকে তাকা। বয়েসটা কমছে না বাড়ছে? গাধা কোথাকার! ছোটকাকা রাগ করে বলল।
নীলেন্দু হাসল। কথাটা তার নতুন শোনা নয়, কতকাল ধরে শুনছে। গুরুজনরা এই একই কথা বলে বলে হায়রান হয়ে থেমে গেছে শেষ পর্যন্ত।
হাসি দেখে ছোটকাকা আরও রেগে গিয়ে বলল, তোর হাসতে লজ্জা করে না। বড়দা আর বেশিদিন বেঁচে থাকবে না, ব্লাড সুগার কত বেড়েছে জানিস? সেবার যে শরীর খারাপ হল–সেটা হার্ট অ্যাটাক না হলেও এই বয়েসে যে-কোনও সময় হতে পারে। তখন কী করবি? চোখে অন্ধকার দেখতে হবে। মেজদা ওই ব্যবসা চালাতে পারবে না।
পরের কথা পরে। লোহালক্কড়ের ব্যবসায় আমার কোনও ইন্টারেস্ট নেই।
কীসে তোর ইন্টারেস্ট আছে? এম এটাও তো পড়লি না।
কী হত পড়ে! এত ছেলে পড়ছে, তাদের কী হচ্ছে।
ছোটকাকা অধৈর্য উত্তেজিত হয়ে বলল, তোর সঙ্গে কথা বলা যায় না। তুই জেগে জেগে ঘুমোস। …ঠিক আছে, পরে বুঝবি…, তখন আমার কথা তোর মগজে ঢুকবে।
নীলেন্দু কিছু বলল না।
