ইচ্ছে করেই করিনি।
তোমার মহীদা কী বলল?
মহীদার কাছে জানতে চাইনি। তোমায় জিজ্ঞেস করছি।
দেবযানী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, তোমার মহীদা এটা পছন্দ করে। তা ছাড়া এ বাড়িতে তিনটে ঘর, দুটো ঘর ফাঁকা রেখে লাভ কী!
নীলেন্দু অসঙ্কোচে দেবযানীর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বলল, ফাঁকা রাখার কথা বলছ, না ফাঁকি রাখার কথা বলছ?
মানে?
তোমরা কি সত্যিই স্বামী-স্ত্রী হয়েছ? না, স্বামী-স্ত্রী হিসেবে বসবাস করছ?
দেবযানী নীলেন্দুর চোখে চোখে তাকাল না, অন্য দিকে চোখ ফিরিয়ে বলল, না, স্বামী-স্ত্রী।
তুমি না বলেছিলেন কোনও অনুষ্ঠান হয়নি?
অনুষ্ঠান আচার বলতে যা বোঝায় তা হয়নি। ঝাড়গ্রামে থাকার সময় আমরা রেজিস্ট্রি করেছি।
তুমি সিঁদুর পরো কি পরো না–বোঝা যায় না।
দেবাযানী নীলেন্দুর ঠাট্টা করতে বুঝতে পারল। সিঁদুর সে পরে, তবে অনিয়মিত, একদিন যদি বা পরে পাঁচ-সাত দিন আর পরে না। মোটা করে সিঁদুর পরতে তার কোনও দিনই ইচ্ছে হয়নি, ওটা তার ভাল লাগে না, নিতান্তই যেন কোনও সংস্কারবশে বা নেহাত মন খুঁতখুঁত করবে বলে মাঝে মাঝে একটু ছোঁয়া দিয়ে রাখে সিদুরের। তা ছাড়া, সিঁদুর তার সয় না, মাথায় দিলে সিঁথির চারপাশে ঘামাচির দানার মতন ঘা ফুটে ওঠে, জ্বালা করে, চুলকোয়। এক একজন মানুষের শরীরে এক একটা জিনিস সয় না, কেন সয় না ভগবানই জানেন। দেবযানী সিদুরের ব্যাপারে তাই সাবধানী।
দেবযানী হালকা করে হেসে বলল, কলকাতা থেকে তুমি একটা ভাল সিঁদুর পাঠিয়ে দিয়ে, পরব।
আলতা লাগবে না? যদি বলল তাও এক শিশি পাঠাতে পারি।
দুজনেই একসঙ্গে হেসে উঠল।
হাসি থামল নীলেন্দু আবার বলল, আমার আগের কথাটার জবাব কিন্তু তুমি এখনও দাওনি, দেবীদি। তোমরা স্বামী-স্ত্রী কিন্তু এভাবে আলাদা ঘরে থাক কেন?
দেবযানী বিব্রত এবং অস্বস্তি বোধ করছিল। চোখের পাতা পড়ল বার কয়েক। মুখটাও কেমন স্নান হল; বলল,তাতে ক্ষতি কী?
মহীদা কি এ ব্যাপারেও সংযম অভ্যেস করছে?
দেবযানীর মুখ কেমন লালচে হয়ে গেল।
নীলেন্দু নির্লজ্জের মতন তাকিয়ে থাকল। অপেক্ষা করছিল, দেবীদি কী বলে শোনার জন্যে। দেবযানী কিছু বলছিল না।
নীলেন্দুই বলল, যে মানুষ বিয়ে করতে পারে তার এই ব্রহ্মচর্য পালনের ন্যাকামি আমার ভাল লাগে না। এটা যেন বাড়াবাড়ি।
দেবযানী নিচু গলায় বলল, কী জানি, আমি জানি না।
নীলেন্দু অপলকে দেবযানীর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মাথার তলা থেকে হাত উঠিয়ে নিল। তারপর হালকা করে হাত ধরল দেবযানীর, নিজের দিকে টেনে নিল। দেবীদির নরম হাত যেন সামান্য শক্ত হয়ে গিয়েছে। কীসের যেন মায়া ও সহানুভূতি বোধ করছিল নীলেন্দু।
অস্পষ্ট গলায় নীলেন্দু বলল, মহীদা তোমার কাছে আসে না?
মুখ নিচু করে বসে ছিল দেবযানী; বলল, কাছেই তো রয়েছে।
না, আমি সে কথা বলছিনা–বলে নীলেন্দু দেবযানীর হাতে সামান্য চাপ দিল। যেন তার প্রশ্নটা ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিল।
দেবাযানী নীলেন্দুর দিকে তাকাল। সামান্য মাথা হেলানো, মুখে কিছু বলল না, কিন্তু অল্প একটু ঘাড় নেড়ে এবং চোখের দৃষ্টিতে বুঝিয়ে দিল, মহীতোষ তার কাছে আসে।
নীলেন্দু বুঝতে পারল, মহীদা একেবারে স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবন যাপন করতে অনিচ্ছুক, আবার পুরোপুরি ব্রহ্মচর্য পালনও করছে না। প্রথম থেকেই এ ব্যাপারে তার সন্দেহ ছিল।
কিছু সময় চুপচাপ থাকার পর নীলেন্দু বলল, তোমায় একটা কথা বলব?
বলো।
তুমি হয়তো রাগ করবে। ভাববে, আমি পরের চরকায় তেল দিচ্ছি।
বলো, শুনি।
মহীদা তোমায় পুরোপুরি মনের শান্তি দিতে পারছে না।
দেবযানীর ছাঁদ করা সুশ্রী মুখ বিষণ্ণ হয়ে এল। চোখ যেন আধ বোজা। নীলের হাতের মধ্যে তার হাত সামান্য কেঁপে উঠল।
তুমি হয়তো এটা স্বীকার করতে চাইবে না…।
কেন, আমি তো ভালই আছি, দেবযানী মৃদু গলায় বলল।
ওটা তোমার মনের কথা নয় দেবীদি; আমি তোমায় জানি।
তুমি যা জানতে তারপর কত বদলে গিয়েছি…।
গিয়েছ। কিন্তু মানুষ কি পুরোপুরি বদলাতে পারে? …আমার কী মনে হয় জানো, মহীদার সঙ্গে চলে এসে তুমি ভুল করেছ।
ও কথা বোলো না।
তুমি বারণ করলেও আমি বলব। তোমার ভালবাসার আমি নিন্দে করছি না। তোমার মতন মেয়ের কপালে যা জুটেছে আমি তার নিন্দে করছি। আমার খুবই সন্দেহ হচ্ছে দেবীদি, মহীদার কাছে তুমি উপলক্ষ মাত্র। হয়তো মহীদা আমাদের কাছ থেকে পালিয়ে আসার একটা সুযোগ খুঁজছিল। তুমি সেই সুযোগ। সে নিজেও হয়তো জানে না, বোঝেনি। তোমার ভালবাসা তার কাছে ছুতো হয়ে দাঁড়াল। নিজের বিবেকের কাছে সে কৈফিয়ত খাড়া করবে তোমায় দেখিয়ে। কিন্তু তা বোধ হয় সত্যি নয়। মহীদা আমাদের কাছ থেকে পালিয়ে এসেছে। একদিন তোমার কাছ থেকেও পালাবে।
দেবযানী প্রবল আপত্তি জানিয়ে মাথা নাড়ল। পালাবে কেন! না না।
না পালাক, তোমার কাছেই থাকল; কিন্তু কাছে থাকলেই কি নিজের জিনিস হয় দেবীদি! মহীদাকে তুমি যেমন করে আঁকড়ে ধরেছ, সে তোমায় তেমন করে আঁকড়ে ধরবে না। তার স্বভাবই হল সরে থাকার। শান্তি তুমি পাবে না। …তোমার কপাল!
দেবযানী নীরব। গাঢ় বেদনায় তার মুখ থমথম করছিল।
.
০৮.
কলকাতায় ফিরে এসে নীলেন্দু একটা পারিবারিক ঝাটের মধ্যে জড়িয়ে পড়ল। ছোট ভাই স্কুটারে অ্যাকসিডেন্ট করে হাসপাতালে শয্যাশায়ী, কোমরের হাড় ভেঙে গিয়েছে, মাথায় চোট, দিন তিন-চার বাড়ির লোকের বড় উৎকণ্ঠায় কেটেছে। নীলেন্দুকে বাড়ি আর হাসপাতাল করতে হল কটা দিন। তারপর ভাইয়ের অবস্থা সামান্য ভালর দিকে ফেরার পরনীলেন্দু হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। অবশ্য হাসপাতাল আসা-যাওয়া বন্ধ হল না, কোমরের ভাঙা হাড় নিয়ে শুভেন্দুকে এখনও অনেকদিন পড়ে থাকতে হবে হাসপাতালে, তার খোঁজখবর করার দায়টা নীলেন্দুর থেকে গেল।
