মহীতোষ বলল, অন্য দেশের কথা থাক, অন্য দেশে কী হয়েছে তার বারো আনাই আমরা জানি না। হয়তো চার আনা জানি, তাও বই পড়ে, নিজেদের অভিজ্ঞতা দিয়ে নয়। যে মানুষ নিয়ে তোর এত দুঃখ সেই মানুষের জীবনকে মরা কুকুর বেড়ালের মতন অপ্রয়োজনীয় মনে করে অনেক নরককাণ্ডও যে অন্য দেশে করা হয়েছে তাও তো দেখা যায়। …তবু আমি তোর কথা মানি। আমি স্বীকার করি, এ দেশে যা চলছে তার বারো আনা অন্যায়; আমি এই শাসনের গুণগান করতে চাইছি না। কিন্তু ভোট করে কিংবা খুনোখুনি করে যে দেশের চেহারা পালটে দেওয়া যাবে–এ আমি আর বিশ্বাস করি না।
তুমি কী বিশ্বাস করো? তোমার কি ধারণা এই গেঁয়ো জায়গায় বসে বসে খানিকটা চাষবাস করলেই দেশের সব দুঃখ ঘুচে যাবে?
মহীতোষ রাগ করল না; বলল, দেশের দুঃখ ঘোচাবার কথা আমি আর ভাবি না। ওসব বৃহৎ কর্ম আমার জন্যে নয়। এক সময়ে মনে হয়েছিল, যারা ওই বৃহৎ কর্ম করার জন্যে দল বাঁধছে তাদের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে রাখি। পরে আমার সে ইচ্ছে নষ্ট হল। মহীতোষ থামল, মনে হল সে বলার কথা হঠাৎ সংক্ষেপ করে নিল। শেষে বলল, আমি খুব ছোট করে কিছু করতে চাইছি। এটা হয়তো আমার সাধ্যে কুলোবে। দশ-পনেরোটা পরিবারকেও যদি আমি খেয়ে পরে বেঁচে থাকার মতন সুযোগ করে দিতে পারি আমার কাছে তাই যথেষ্ট।
নীলেন্দু বেঁকা স্বরে বলল, তোমার যা যুক্তি তাতে তো মনে হয় কলকারখানার যত মালিক সবাই তোমার দলে। তারাও তো হাজার লোককে চাকরি দিয়ে রেখেছে, তাতে রাম শ্যামের পরিবার প্রতিপালনও হচ্ছে।
তা তো হচ্ছেই। তবে আমি তো কলকারখানার মালিক নই, আর আমার উদ্দেশ্যও টাকা খাঁটিয়ে লাভ তুলে নেওয়া নয়।
নীলেন্দুর আর ভাল লাগছিল না। বিরক্তি বোধ করছিল। মহীদার কথাবার্তাগুলো একেবারে ছেলেমানুষের মতন। অর্থহীন।
হাই তুলে নীলেন্দু বলল, আমি কালই চলে যাব ভাবছি। বেলা দশটার গাড়িতে।
মহীতোষ তাকিয়ে থাকল। কালকেই?
হ্যাঁ; কালই।
মহীতোষ আর কিছু বলল না। বিছানার ওপর থেকে নেমে পড়ল নীলেন্দু। দেবীদি কোথায় গেল?
আছে এদিকে কোথাও?
নীলেন্দু হেসে বলল, দেবীদির সঙ্গে একটু গল্প করি।
বাইরে এসে দেবযানীকে ডাকল নীলেন্দু।
মহীতোষের ঘর থেকে সাড়া দিল দেবাযানী।
নীলেন্দু বলল, একবার আমার ঘরে আসবে?
বাইরে এসে দাঁড়াল দেবযানী।
নীলেন্দু বলল, আমার ঘরে চলো, গল্প করব।
দেবযানী বলল, গল্প না ঝগড়া?
হাসল নীলেন্দু। না না ঝগড়া নয়। গল্প। তোমার দিব্যি।
তুমি যাও, আমি আসছি।
.
শীতের জন্যে নীলেন্দু কম্বল চাপা দিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। আজ সারাদিন শীতের বাতাসের সঙ্গে কেমন একটা বাদলার গন্ধ মেশানো ছিল। সকালের রোদ পরিষ্কার থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘোলাটে হয়ে গেল। আকাশ মাঝে মাঝে মেঘলা হয়ে বিকেল থেকে এই বাদলা বাতাস বইতে লাগল। শীতটাও অসহ্য হয়ে উঠল।
আজ নীলেন্দু কোথাও বেরোয়নি। বাড়ির আশেপাশে পায়চারি করেছে। দু-চার ফোঁটা বৃষ্টিও গায়ে পড়েছিল আচমকা। কে জানে রাত্রে বৃষ্টি নামবে কিনা!
দেবযানী ঘরে এসে দেখল, নীলেন্দু শুয়ে আছে। বলল, শুয়ে পড়লে যে?
এমনি। শীত লাগছে। …এখন কটা বাজল?
রাত হয়নি। আটটা হবে।
এসব জায়গায় সময়টা যেন বোঝাই যায় না…দেবীদি, তুমি আমার এখানে এসে বোসো, বলে নীলেন্দু তার পাশে বিছানার একটা জায়গা দেখাল।
দেবযানী নীলেন্দুর বিছানায় গিয়ে বসল। মুখোমুখি।
নীলেন্দু হেসে বলল, পা দুটো তুলে দাও না, এই ঠাণ্ডায় পা ঢেকে বসলে আরাম পাবে।
দেবযানী পা তুলে বসার জায়গা দেখল না। সরু তক্তপোশ, নীলেন্দু কম্বল চাপা দিয়ে শুয়ে আছে। বলল, ঠিক আছে, তুমি শোও…
নীলেন্দু যতটা সম্ভব সরে জায়গা দিতে দিতে বলল, তোমার পা আমি বুকেও রাখতে পারি দেবীদি; নাও, অনেক জায়গা করে দিয়েছি, পা দুটো কম্বলে ঢাকা দিয়ে বসো৷
দেবযানী আপত্তি করল। নীলেন্দু শুনল না। অগত্যা দেবযানীকে পা বিছানার ওপর তুলে কম্বল চাপা দিয়ে বসতে হল।
নীলেন্দু বলল, আমি কাল সকালে ফিরব। দশটার ট্রেনে।
কাল?
কালকেই ফিরব। কলকাতায় আমার একটা দরকারি কাজ রয়েছে।
দেবাযানী নীলেন্দুর চোখে চোখ রেখে দুপলক তাকিয়ে থাকল। তারপর বলল, তুমি সত্যি সত্যিই আর কখনও আসবে না?
না, মাথা নাড়ল নীলেন্দু। তারপর বলল, তখন যা বলেছি তার জন্যে রাগ কোরো না।
তানা হয় হল, কিন্তু তুমি আমাদের ওপর এত রাগ করছ কেন? আমরা তো কোনও অন্যায় করিনি ভাই।
নীলেন্দু সহজ স্বচ্ছ চোখে দেবযানীকে দেখতে দেখতে বলল, হয়তো করোনি। ওসব কথা আর তুলো না; ভাল লাগছে না।
দেবযানীর চোখ সামান্য বিষণ্ণ হল। তারও ভাল লাগছিল না একই কথা বার বার বলতে। চুপ করে থাকল।
নীলেন্দুই বলল, দেবীদি, আমার সঙ্গে একদিন তুমি খোলামেলা কথা বলতে, এমনকী সেসব কথাও যা মেয়েরা নিজেদের বন্ধুকেও বলে না। তুমি আজও কি আমার সঙ্গে সেইভাবে কথা বলতে পারবে?
দেবযানী ভুরু কুঁচকে আড়চোখে নীলেন্দুকে লক্ষ করল। বুঝতে পারল না, এ কথা বলার কী অর্থ। বলল, তোমার কী মনে হয়?
একটু সন্দেহ হচ্ছে।
সন্দেহের দরকার নেই, বলো।
নীলেন্দু হাত দুটো মাথার তলায় রাখল, বালিশের দুপাশে কনুই। বলল, তুমি আর মহীদা আলাদা ঘরে থাক কেন?
দেবযানী বুঝতে পারেনি নীলেন্দু এরকম একটা প্রশ্ন করবে। ইতস্তত করল। বলল, আমি ভেবেছিলাম, এটা তুমি প্রথম দিনেই জিজ্ঞেস করে বসবে।
