দেবযানী যেন আর সহ্য করতে পারল না, বলল, করতেও তো পারতে। …তা ছাড়া, আমরা আমাদের মন কোথাও যেতে পারব না, কিছু করতে পারব না, এমন দাবিও বা তোমাদের থাকবে কেন?
নীলেন্দু দেবযানীর দিকে প্রায় স্থির চোখে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ, তারপর আস্তে আস্তে ঘাড় নেড়ে বলল, না দেবীদি, আমাদের কোনও দাবি নেই।
দেবযানী চুপ করে গেল। নীলের দৃষ্টিতে, তার গলার স্বরে এমন কিছু ছিল যে–দেবযানী যেন বাধ্য হয়েই নিজের রাশ টেনে ধরল। তার মন শান্ত হল না, রাগও জুড়ল না, তবু আর কথা বলতে পারল না।
শেষে দেবযানী ঘর ছেড়ে চলে গেল।
মহীতোষ কিছুক্ষণ ধরে চুপচাপ ছিল। তার ভাল লাগছিল না। হয়তো কোনও দুঃখ বোধ করছিল। চুপচাপ আরও একটু বসে থেকে মহীতোষ বল, নীলু, একটা কথা বলব?
বলো।
মানুষ অনেক ভুল করে, নিজের জীবনেও করে আবার বহু লোকের জীবনের ব্যাপারেও করে। ছোটখাটো ভুল শুধরে নেওয়া যায়, তাতে মারাত্মক কোনও ক্ষতি হয়তো হয় না। বড় বড় ভুল, বিশেষ করে সেটা যদি বহু লোকের ভাগ্য নিয়ে হয়, তবে তার পরিণাম আর সামলানো যায় না…আমি যদি ভুল করি, তার বোঝা নিজেই বয়ে বেড়াতে চাই, সেটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার হবে। কিন্তু এমন ভুল আমি করতে চাই না যার সঙ্গে অনেকের ভাগ্য জড়ানো। অন্যদের জীবন নিয়ে খেলা করার অধিকার আমার নেই।
নীলেন্দু চুপচাপ কথা শুনছিল মহীতোষের। জবাব দিল না। এলোমেলো ভাবে তাকাল। দীর্ঘনিশ্বাস ফেলল, তারপর বলল, মহীদা, দু বছর আগে তোমার মুখের কথার সঙ্গে আজকের কথার কত তফাত।
মহীতোষ কথা বলল না। তার চোখ সামান্য ঝাপসা দেখাল, যেন দৃষ্টিতে উজ্জ্বলতা নেই। কোনও রকম অন্যমনস্কতার দরুনও এটা হতে পারে। প্রায় চোখে পড়ে না, পাতলা বিষণ্ণতাও যেন মণির গায়ে জড়িয়ে থাকল।
নীলেন্দু তার সিগারেটের প্যাকেট টানল আবার, বিছানার একপাশে ছুঁড়ে দিল। বলল, তখন তোমার কথা শুনে মনে হত, তোমার সঙ্গে নরেনবাবুদের কথার মিল আছে।
মহীতোষ যেন কোনও পাপকর্মের গ্লানি বোধ করছিল। নীলেন্দুর দিকে তাকাল, চোখ নামাল। বলল, আমার ভুল হয়েছিল!
একথা আজকে বলার কোনও মানে হয় না, মহীদা। সেদিন তুমি আমার মতন অনেক ছেলের মাথা চিবিয়ে খেয়েছ।
মহীতোষ প্রতিবাদ করল না, শুধু বলল, আমি চাইনি…
না চাইলেও যা ঘটেছে তা অস্বীকার করতে পারবে না।
মহীতোষ বলল, আমি কোনওদিন কোনও দলে থাকিনি। আমার কোনও অফিসিয়াল ফাংশান ছিল না। নরেনবাবুদের পার্টির আমি হয়তো সিমপ্যাথাইজার ছিলাম। তাঁদের ভাবনা চিন্তা যে আমার সব সময় ভাল লাগত তা নয়, তবু প্রথম দিকে নিশ্চয় লাগত। পরে আমি নানা ব্যাপারে নরেনবাবুর সঙ্গে তর্ক করেছি। তিনি আমায় গ্রাহ্য করতেন না। বিশ্বাসও করতেন না। আমায় কোনও দিনই ওঁদের দলের বড়দের কারুর কাছে নিয়ে যাননি, বা বলেননি তাঁদের পার্টির ভেতরে আসতে। আমি নরেনবাবুদের কথাবার্তা কিছু কিছু মানতাম কিন্তু পুরোটা নয়–শুধু এই কারণেই তিনি আমাকে খানিকটা তফাত রেখে আগাগোড়া লক্ষ করে গেছেন আমি কতটা তাঁদের কাজে আসব। যতটা এসেছি ততটা তাঁরা নিয়ে নিজেদের কাজে লাগিয়েছেন, বাকিটা নেননি।
নীলেন্দু অদ্ভুতভাবে হেসে উঠে বলল, তুমি নরেনবাবুদের বিপ্লবের ফড়ে ছিলে?
মহীতোষ আহত হল না, বলল, তাই ছিলাম। আমাকে দালালও বলতে পারিস। …কিন্তু আমার কাছে যারা আসত আমি তাদের কোনও দিনই বলিনি, তোমরা নরেনবাবুদের দলে ভিড়ে যাও। যারা গেছে তারা নিজের ইচ্ছেয় গেছে, আমার কথায় নয়।
নীলেন্দু সিগারেটের প্যাকেটটা আবার টেনে নিল। বলল, তুমি যতই অস্বীকার করো, তোমার তখনকার কথাবার্তা, চালচলন, ব্যবহার বলত, তুমি নরেনবাবুর সঙ্গে আছ।
মাথা নাড়ল মহীতোষ। কেন? আমার কাছে যারা আসত তাদের কাছে আমি নরেনবাবুদের অনেক কাজের সমালোচনাও করেছি আর দেখেছি, সেই সমালোচনাটা যথাসময়ে নরেনবাবুর কানে উঠেছে। এ কথাটা কী প্রমাণ করে নীলু? প্রমাণ করে, আমার কাছে যারা আসত তাদের কেউ কেউ নরেনবাবুদের দলে যাতায়াত করত। তাই কি নয়? আমায় এমন ভাব দেখাত যেন আমি বিশ্বাসের যোগ্য নই।
নীলেন্দু একটা সিগারেট ধরাল। বলল, তোমায় বিশ্বাস করা মুশকিল ছিল।
জানি।
তুমি নরেনবাবুদের কাজকর্ম অপছন্দ করতে।
করতাম। ..যদি কেউ আমাদের দেশের দুঃখদুর্দশা, বেকারি, দীন দশার কথা বলে আমি কেন মিছেমিছি তার প্রতিবাদ করব। কেউ যদি বলে, আমাদের মাথার ওপর বসে যারা রাজত্ব চালাচ্ছে তারা অপদার্থ অজ্ঞ তাতে আমার আপত্তি করার কিছু নেই। এ দেশে কেমন করে কালো টাকার পাহাড় জমছে, সুখসুবিধে মাত্র কজন ভোগ করছে, আর কোটি কোটি মানুষ কী অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে–তা বোঝার জন্যে ছুটে বেড়াবার দরকারও করে না। কিন্তু আমায় কেউ যদি বলে, এসো–এই দুঃখদুর্দশা দুর করার জন্যে আমরা নৃশংস হই, রক্তপাত করে আতঙ্ক ছড়িয়ে বেড়াই–তা হলে আমার আপত্তি আছে। আমি নৃশংসতা বিশ্বাস করি না।
নীলেন্দু বাধা দিয়ে বলল, তুমি একতরফা নৃশংসতা দেখছ! যারা আমাদের নৃশংস করে তুলেছে। তাদের ব্যাপারটা দেখছ না। তারা কি কম নৃশংস? ওই লোকগুলো আমাদের কী দিয়েছে মহীদা? খাবার দিয়েছে? মাথা গোঁজার জায়গা করে দিয়েছে? অসুখ করলে থাকবার হাসপাতাল দিয়েছে? চোরাই আর চোলাই শিক্ষা ছাড়া ভাল কিছু শিখিয়েছে? …তুমি ওদের কথা বোলো না। আমাদের দেশ বলে এটা আজও চলে যাচ্ছে, অন্য দেশ হলে চলত না।
