মহীতোষ বলল, তুই আবার একবার আসিস।
কেন?
সামান্য সংকুচিত হয়ে মহীতোষ ধীরে ধীরে বলল, এবারে এসে তুই কিছু দেখতে পেলি না। তোর ভালও লাগল না। চোখে কিছুনা দেখা পর্যন্ত কারও কোনও জিনিসই বিশ্বাস হয় না, তুই আমার চেষ্টার কিছু দেখতে পেলি না। বিশ্বাসও করলি না, আমি কিছু করার চেষ্টা করছি। পরে যদি আসিস তোর ভুল কিছুটা ভাঙবে।
নীলেন্দু সোজা হয়ে বসল। বলল, আমার আসবার আর কোনও ইচ্ছে নেই, মহীদা। এসে যা দেখব, আমি আগে থেকেই তা দেখতে পাচ্ছি।
মহীতোষ প্রথমে কথা বলল না, তারপর বলল, কী দেখতে পাচ্ছিস?
নীলেন্দু অনুভব করছিল, দেবীদি তার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সে দেবযানীর দিকে তাকাল না। মহীতোষকেই লক্ষ করে বলল, তোমার ধানের জমি, তোমার তাঁতকল, ওই দশ বিঘে তিসি কলাই আর শাকসবজির ক্ষেত হয় ফাঁকা পড়ে আছে, মাঠে গোরুছাগল চরছে; আর না হয় তুমি উদ্যোগী পুরুষের মতন ধান ফলিয়ে, কলাইফলাইয়ের চাষ করে, শাকসবজি চালান দিয়ে, গামছা চাদর বেচে দিব্যি গ্রাম্য ধনী হয়ে বসে আছ। তোমার কাছে সারাদিন ফড়ের ভিড়। …এই দুটোর বেশি আর কী হবে, হয় মন্দ না হয় ভাল। আমার কোনও ইন্টারেস্ট নেই তোমাদের ব্যবসায়িক ভালমন্দ দেখার। বলে নীলেন্দু থামল একটু। তার চোখমুখ বিরক্ত দেখাচ্ছিল। গলার স্বরও কেমন যেন কর্কশ শোনাল। সম্ভবত সামান্য উত্তেজিত হয়েই নীলেন্দু একটা সিগারেট ধরিয়ে নিল।
মহীতোষ বা দেবযানী কথা বলল না। নীলেন্দুর দিকে তাকিয়ে থাকল। আরও যেন কিছু বলবে নীলেন্দু, সেই রকম মনে হওয়ায় তারা অপেক্ষা করছিল।
নীলেন্দু আবার বলল, ছমাস এক বছর পরে তোমাদের কী হল জানবার কোনও উৎসাহ সত্যিই আমার নেই। হয়তো তোমরা খুব সুখেই থাকবে, দেবীদির কোলে শুয়ে তোমাদের ফুটফুটে বাচ্চা দুধ খাবে, বারান্দায় কাঁথা শুকোবে, কিন্তু এসব জেনে বা দেখে আমার কোন পরমার্থ লাভ হবে মহীদা? কী আমার যায় আসে তোমাদের সুখ দেখে?
দেবযানী কী বলতে যাচ্ছিল তার আগেই মহীতোষ বলল, দুঃখটাও দেখে যেতে পারিস। তার বলার মধ্যে কোনও বিদ্রূপ ছিল না।
জোরে মাথা নাড়ল নীলেন্দু। বলল, দুঃখ সওয়ার নমুনা তো আগে থেকেই দেখাচ্ছ। বাড়ি কিনেছ, জমি কিনেছ, আরও কিনবে। তার ওপর তাঁতকল বসাচ্ছ নিজের পয়সায়। এসব শখের দুঃখ আমায় দেখিয়ো না মহীদা। আমি দেখেছি। শুনেছি তোমাদের গান্ধী ট্রেনে থার্ড ক্লাসে যেতেন। কিন্তু তাঁর যাবার আগে যে সমস্ত প্ল্যাটফর্ম রাতারাতি ঝকঝকে তকতকে করে রাখা হত, ট্রেনের বগিতে দশবার ঝাড়মোছ হত এসব খবর কে রাখে! তুমি আমি কোন থার্ড ক্লাসে যাই?
মহীতোষ বলল, এখানে এই কথাটা কেমন করে আসে, নীলু?
কেন আসবে না? …এসব শখের দুঃখ দেখিয়ে কী লাভ? ।
মহীতোষ প্রতিবাদের মতন মাথা নেড়ে বলল, নীলু, আমি ধরে নিলাম, গান্ধীজির জন্যে যা করা হত সেটা সকলের জন্যে করা হত না। কিন্তু তুই বল, তোদের কোন ক্ষুদে নেতাও সাধারণ মানুষের চেয়ে সুখ সুবিধে বেশি আদায় না করে? কোন নেতাকে তুই রেশনের দোকানে লাইন দিতে দেখেছিস? একটা নেতার নাম বল যাকে তুই বাসস্ট্যান্ডে বাস ধরার জন্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিস? আমি অন্তত চোখে দেখিনি।
নীলেন্দু কী বলতে যাচ্ছিল, হঠাৎ থেমে গেল। সম্ভবত সে কোনও নেতার নাম মনে আনার চেষ্টা করছিল, পারছিল না। তার মনে পড়ছিল না।
মহীতোষ বলল, এটা তর্কের ব্যাপার নয়, নীলু। নেতা-টেতা হলে তোদের খাতিরের মাত্রাটা নিজের থেকেই বেড়ে যায়। একবার আমাদের কলেজের ব্যাপারে তোদের এক নামকরা বামপন্থী নেতাকে কলকাতা থেকে ছেলেরা নিয়ে গিয়েছিল। ভদ্রলোক নিজের গাড়িতে বর্ধমান গিয়েছিলেন, কিন্তু যাবার আগে ছেলেদের কাছ থেকে পেট্রলের টাকা আগাম নিয়ে নিয়েছিলেন…। এই রকমই হয়। নেতারা তো নেতা, জনতা নন।
নীলেন্দু বিদ্রূপ করে বলল, তোমার এই ব্যাপারটাও কি সেই রকম নয়? তুমি কোন স্বার্থে এই জনসেবা দেখাতে এসেছ?
মহীতোষ যেন সামান্য বিমূঢ় হল, বলল, আমি কিছু বলব না,নীলু। এখন নয়। আমার বলার মুখ নেই। ভবিষ্যতে যদি কিছু করতে পারি, তুই নিজের চোখে দেখে তার বিচার করবি।
মাথা নেড়ে নীলেন্দু বলল, আমি আর আসব না। তুমি ফকির হলে, নাকি রাজা হলে–সে বিচার করার জন্যে আমার আসার কোনও দরকার নেই।
এ তোর রাগের কথা।
হ্যাঁ, রাগের কথা। ঘৃণার কথা। …তোমাদের সম্পর্কে আমার ধারণা আর বদলাবে না।
দেবযানী অস্বস্তি বোধ করছিল। এই বচসা তার ভাল লাগছিল না। নীলের কথাবার্তাও পছন্দ করছিল না দেবাযানী। বরং বিরক্ত হয়ে উঠছিল।
দেবযানী বলল, তোমার ধারণাটা কেমন হল শুনতে পারি?
নীলেন্দু দেবযানীর দিকে তাকাল। সে তো আগেই বলেছি…
আগে বলেছ? কী বলেছ?
বলেছি যে, তোমরা সুবিধেবাদী, ভিতু, এসকেপিস্ট। তোমরা গা বাঁচাতে পালিয়ে এসেছ। সোজা বাংলা ভাষায় একে পালানো বলে।
দেবযানী বিরক্তির শব্দ করল।
ডান হাত উঠিয়ে নীলেন্দু যেন দেবযানীকে সামান্য অপেক্ষা করতে বলল। তারপর ব্যঙ্গের গলায় বলল, বিয়ে-থা ঘরসংসার করে ছেলেমেয়ে নিয়ে তোমরা সুখে থাকতে চাও। লক্ষ লক্ষ লোক যেমন থাকে। অবশ্য সুখে থাকে কি না আমি জানি না। তবে থাকে। …যাক গে, এটা তোমরা কলকাতায় থেকেও করতে পারতে। কেউ তোমাদের গলা কেটে নিত না। অনেকেই তো করেছে এরকম, গা বাঁচিয়ে চলে গেছে। তোমরা এত ভিতু যে তাতেও তোমাদের সাহস হল না। পালিয়ে এলে। ভাবলে আমরা তোমাদের ক্ষতি করব।
