দাদার সঙ্গে পরিতোষের সম্পর্ক ছিল পরিষ্কার। মহীতোষকে সে ভালবাসত, অনেক ব্যাপারে পছন্দ করত, কিন্তু দাদার বোধবুদ্ধি সম্পর্কে তার বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা ছিল না। পুরোপুরি বন্ধুত্বের পযায়ে না পড়লেও খানিকটা বন্ধুর মতন এক অন্তরঙ্গতা ছিল তার দাদার সঙ্গে। ঠাট্টা তামাশা করত, কিন্তু দুজনের সম্পর্কের ব্যবধানটা সে বজায় রাখত হিসেব করে।
অনেক মজার মজার ঘটনা দুই ভাইয়ের মধ্যে ঘটে গেছে। আবার এক আধবার মনোমালিন্যও যে না ঘটেছে এমন নয়। কিন্তু তাতে কিছু ক্ষতি হয়নি কারও পক্ষে।
মহীতোষ যখন নীলেন্দুদের সঙ্গে বাড়াবাড়ি ভাবে জড়িয়ে পড়েছে তখন একদিন দুই ভাইয়ে রীতিমতো বচসা হয়েছিল। পরিতোষ দাদার এই ব্যাপারটা মনে মনে কোনওদিন পছন্দ করেনি। শেষের দিকে তার ভয়ও হয়েছিল।
ভয় হবারই কথা। কলকাতায় তখন রোজই খুনোখুনি চলছে। কলকাতার বাইরেও। কাগজে যেসব খবর থাকে তার দিকে চোখ রাখলেই আতঙ্ক হয়, আর যেসব খবর থাকে নাযার সংখ্যা অনেক বেশি–সেসব খবরের কিছু কিছু কানে এলে মনে হয় গোটা পশ্চিম বাংলাতেই একটা নৈরাজ্য চলেছে। মানুষের জীবন কতটুকু নিরাপদ সে বিষয়ে সন্দেহ হয়। এমনকী একথাও মনে হয়, যা ঘটে যাচ্ছে তার সঙ্গে রাজনীতির কোনও সম্পর্কই নেই। মানুষকে আতঙ্কিত, সন্ত্রস্ত, বিহ্বল করা ছাড়া অন্য কোনও উদ্দেশ্য এই খুনোখুনির মধ্যে থাকতে পারে না।
মহীতোষ এসময় মাঝে মাঝেই বাড়িতে থাকত না। কোথায় থাকত তাও বোঝা যেত না। বর্ধমানের দিকে একটা কলেজে সে পড়াত। আসা-যাওয়ার অসুবিধের জন্যে কলেজের টিচার্স কোয়ার্টার্সে থাকত, কিন্তু ছুটিছাটায় কলকাতায় এসেও বাড়িতে সব সময় মুখ দেখাত না। অন্য কোথাও থেকে যেত। পরিতোষ এটা পছন্দ করত না। দাদার ব্যক্তিগত ব্যাপারে নাক গলাবার ইচ্ছে তার ছিল না। তা বলে নিরীহ, শান্তশিষ্ট, মার্জিত, সহৃদয়, নরম স্বভাবের মানুষ কতকগুলি নির্বোধ, উন্মত্ত, হিংস্র প্রকৃতির ছেলের পাল্লায় গিয়ে পড়বে, রাতারাতি বিপ্লবী হয়ে ছেলে খেপাবে, তার পারিবারিক সম্পর্ক নষ্ট করে গোপনে কলকাতায় আসা-যাওয়া করবে কেন? পরিতোষ ক্রমশই অসন্তুষ্ট, ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছিল। তখনই একদিন দুই ভাইয়ে বিশ্রী রকম বচসা হয়ে যায়।
পরিতোষ রাগ করে বলেছিল, তোমাদের পলিটিকস আমি বুঝি না। তোমাকে আমি চিনি। তুমি যদি এই ভাবে দিন কাটাও আমার সঙ্গে তোমার কোনও সম্পর্ক থাকবে না।
জবাবে মহীতোষ বলেছিল, না থাকলে থাকবে না। আমার সঙ্গে এ বাড়ির কারই বা সম্পর্ক ছিল যে তুমি আমায় ভয় দেখাচ্ছ।
পরিতোষ আর কিছু বলেনি। অত্যন্ত আহত হয়েছিল সন্দেহ নেই।
পরে অবশ্য মহীতোষ নিজের ব্যবহারের জন্যে লজ্জিত হয়েছে। এই রূঢ়তা তার নিজেরই খারাপ লেগেছে। পরিতোষকে এ ধরনের কথা বলা তার উচিত হয়নি। কেননা, কথাটা শুনতে যত ছোট তার অর্থ তত ছোট নয়।
পরের বার বর্ধমান থেকে ফিরে এসে মহীতোষ যেন ভাইকে খুশি করতে বাড়িতেই থেকে গেল দিন দুই। সোমবার আবার ফিরে গেল কাজের জায়গায়।
.
মহীতোষ বাইরে গাছতলায় এসে দাঁড়াল। শীতের আকাশ এই শেষ দুপুরে কেমন যেন স্তিমিত দেখাচ্ছে। সূর্য সামান্য ধোঁয়াটে। ছেঁড়া ছেঁড়া কিছু মেঘ জমেছে। দমকা বাতাসে ছোট ছোট ঘূর্ণি উড়ছে, শুকনো পাতা আর ধুলো উড়িয়ে। পরিতোষকে চিঠি লেখার জন্যে মহীতোেষ খুবই ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল।
.
০৭.
চার পাঁচটা দিন কেটে যাবার পর নীলেন্দু বলল, মহীদা, আমি কাল-পরশু কলকাতায় ফিরে যাব।
মহীতোষ বলল, থাক না আরও কয়েকটা দিন, কলকাতায় ফিরে তোর কাজটা কীসের!
নীলেন্দু সাধারণভাবে হাসল।
দেবযানী বলল, এই চুপচাপ ফাঁকা জায়গা ওর কতদিন আর ভাল লাগবে! তাই না নীলু?
মাথা নেড়ে নীলেন্দু বলল, তুমি ঠিকই বলেছ দেবীদি, এখানে আমার আর ভাল লাগছে না। তোমাদের দেখতে এসেছিলুম, দেখা হয়ে গেল, আবার কী! বলে নীলেন্দু সামান্য ব্যঙ্গ, খানিকটা বা অবজ্ঞার মুখ করে হাসল।
মহীতোষ লক্ষ করেছিল কিনা কে জানে দেবযানী হাসিটা লক্ষ করল। নীলেন্দু দেবযানীর বিছানায় আধ-শোয়া ভঙ্গিতে বসে, বিছানার মাথার দিকে দেবযানী। মহীতোষ পুরনো একটা বেতের চেয়ারে বসে, ছোট মতন এক চৌকিতে তার পা। জানলা বন্ধ। ঘরের দরজা পুরোপুরি ভোলা নয়। লোহার ঝাঁঝরির মধ্যে কাঠকয়লার আগুন ছিল, ক্রমশ নিবে আসছে। বিছানার তলায় প্রায় মহীতোষের পায়ের কাছে ঝাঁঝরিটা। ঘরের মধ্যে মোটামুটি আরাম পাওয়া যাচ্ছিল। সামান্য তাপও অনুভব করা যায় আগুনের। লণ্ঠনটা উঁচু জায়গায় রাখা; কারও মুখে সরাসরি আলো পড়ছেনা, খুব স্পষ্ট করে মুখও দেখা যায় না হয়তো। তবু দেবযানী নীলেন্দুর হাসি লক্ষ করতে পারল।
দেবযানী কী মনে করে বলল, আমাদের দেখে তোমার যে ভাল লাগেনি বুঝতেই পারছি তোমায় দেখে আমাদের কিন্তু ভালই লেগেছে।
নীলেন্দু ঘাড় বেঁকিয়ে দেবযানীর দিকে তাকাল। বলল, ওটা তোমার মনের কথা নয়, দেবীদি।
নয়? দেবযানী যেন অবাক হল।
আমার একটু ভুল হয়েছিল, শুধরে নিচ্ছি। তোমরা আমায় দেখে হয়তো খুশি হতে চেয়েছিলে কিন্তু পুরোপুরি খুশি হওনি। তুমি অন্তত প্রথম দুটো দিন আমায় বড় সন্দেহ করেছ।
দেবযানী আহত হল, কথার জবাব দিল না।
