অভ্যেসটা প্রায় ছেলেবেলার। ছেলেবেলায় মহীতোষ বাড়িতে একা একাই থাকত। মা মারা যাবার আগে মার ঘরেই তার থাকার ব্যবস্থা ছিল। বাবা পাশের বড় ঘরে থাকত। রাত্রে ঘুম ভেঙে গেলে মহীতোষ অনেক সময় মাকে বিছানার পাশে দেখতে পেত না। ঘর অন্ধকার থাকত। দরজা পুরোপুরি ভেজানোও থাকত না। মহীতোষ বুঝতে পারত মা বাবার ঘরে গিয়েছে। মা যে বাবার ঘরে গিয়েছে এটা বোঝার কোনও অসুবিধে ছিল না। কেননা মা বাবার ঘরে গেলেই গলা পাওয়া যেত, বাবার সঙ্গে মা ঝগড়া করছে, মাঝরাতেও ঝগড়া থামতে চাইত না। খুবই আশ্চর্য, বিছানার পাশে মা না থাকলেও মহীতোষের এমন কিছু ভয় করত না। বরং একা একা জড়সড় হয়ে শুয়ে থাকতেই তার ভাল লাগত। মার চেঁচামেচি, কান্নাকাটি তার পছন্দ হত না।
মা মারা যাবার পর মহীতোষ গেল পিসিমার ঘরে। পিসিমার ঘর ছিল অন্য দিকে, বাবার ঘরের সঙ্গে তার কোনও সম্পর্ক ছিল না। পিসিমার ঘরে আলাদা ছোট বিছানা ছিল মহীতোষের। সে একলা শুয়ে থাকত, আপন মনে কত কী ভাবত, ছেলেমানুষ যেমন ভাবে। পিসিমার ঘরে শোওয়া বসা করলেও নীচের তলায় ছিল মহীতোষের পড়ার ঘর। পুরনো কিছু আসবাবপত্র, নোনাধরা দেওয়াল, খানিকটা ঝাপসা মতন আলো, বাবার ফেলে রাখা একরাশ কাগজপত্র–ওর মধ্যে মহীতোষের সকাল-সন্ধে কাটত। তার যখনই খারাপ লাগত, কিংবা ওই ঘরের মধ্যে হাঁপিয়ে উঠত–সে বাইরে এসে বাতাবি লেবুর গাছের তলায় গিয়ে বসে থাকত চুপ করে।
তাদের কলকাতার মলঙ্গা লেনের বাড়িতে দু-চারটে বাড়তি জিনিস থেকে গিয়েছিল। মহীতোষ শুনেছে, ঠাকুরদার যখন অবস্থা খুব ভাল যাচ্ছিল তখন মলঙ্গা লেনের পুরনো অথচ নিরিবিলি এই মুখটায় ঠাকুরদা বাড়িটা সস্তায় কিনে নেয়। বাড়িটার মালিকানা নিয়ে সামান্য জটিলতা ছিল, ঠাকুরদা সেটা মিটিয়ে ফেলেছিল বুদ্ধি করে। পুরনো বাড়ি ছেড়ে তখনই এ বাড়িতে চলে আসে ঠাকুরদা। পুরনো বাড়িতে অসুবিধে ছিল অনেক, সাবেক কালের বাড়ি। গলিটা হাত পাঁচেকও চওড়া নয় বোধ হয়, আলো বাতাসের অভাব, তার ওপর বাড়ির গায়ে এক বস্তি দিন দিন বেড়ে উঠতে লাগল। নতুন বাড়িতে এসে ঠাকুরদা অবশ্য বাড়ি মেরামতির জন্যে আর পয়সা খরচ করেনি। করব করছি করেই একদিন কিছু না করে মারা গেল।
মলঙ্গা লেনের বাড়ির উত্তর ঘেঁষে, পেছনের দিকেই প্রায়, অল্প ফাঁকা জমি ছিল। সেই জমিতে নানা আবর্জনার স্তূপের পাশে একটা বাতাবি লেবুর গাছ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকত, গাছটায় কোনওদিন একটা লেবু ফলতে কেউ চোখে দেখেনি; গাছটার গায়ে গায়ে তুলসীর ঝোপ ছিল, আর আবর্জনার স্কৃপের মধ্যে ঘাসের ডগা, সন্ধ্যামণি ফুলের গাছ, এমনকী গাঁদা ফুলের গাছও দেখা যেত। বাড়ির বাইরে, গলিটা যেখানে বাঁক নিয়েছে, বাড়ির গায়ে গায়ে একটা ছোট্ট মন্দির ছিল শিবের। শিবরাত্রির দিন খুব ভিড় হত মন্দিরে।
মহীতোষ ছেলেবেলা থেকেই বাতাবি-তলার দিকটা যেমন পছন্দ করত, সেই রকম তার শিবমন্দিরের দিকেও টান ছিল। ছোট্ট মন্দির, ভেতরে দশ হাত জায়গাও আছে কি না সন্দেহ, সাদা ঠাণ্ডা মেঝেতে বেলপাতা-টাতা পড়ে থাকত, বুড়ো পুরুতঠাকুর সব সময়ে মন্দিরে থাকত না, লোহার শিক রানো দরজা বন্ধ করে দিয়ে বাইরে চলে যেত। মহীতোষ মাঝে মাঝেই শিবমন্দিরের সিঁড়িতে গিয়ে বসে থাকত চুপচাপ। নিরিবিলি গলিতে লোকজন গেলে দেখত, রিকশা চলে যাবার সময় তাকিয়ে থাকত। তার ভাল লাগত মন্দিরের সিঁড়িতে বসে থাকতে। পুরুতমশাই মন্দিরে থাকলে মহীতোষের সঙ্গে গল্প করতেন, নানারকম গল্প।
মহীতোষ যখন আরও বড় হয়ে উঠল, বাবা বেঁচে রয়েছে, নতুন মা-ও মারা গেল, পরিতোষও বেড়ে উঠেছে, তখন বাড়িতে মহীতোষ নিজের থাকার জায়গা একেবারে আলাদা করে নিয়েছিল। সে নীচের তলায় থাকত। তার ঘর আলাদা। বসবার জায়গাও আলাদা। ওপরের সঙ্গে কোনও সম্পর্কই প্রায় ছিল না। খাওয়ার সময় যা ওপরে উঠতে হত মহীতোষকে। তাও রাত্রের দিকে অর্ধেক দিন বাড়ির ঠাকুর নীচে এসে মহীতোষের খাবার রেখে যেত।
বাবা মারা যাবার পরও মহীতোষ যেমন-কে-তেমনই থাকল। সংসারের কোনও ব্যাপারেই তার গা ছিল না। যোগেশকাকাই সব দেখাশোনা করতেন আর সামলাতেন। সদানন্দ ছিল। তারপর যোগেশকাকা যখন হাল ছাড়লেন তখন পরিতোষ সংসারের ভার ঘাড়ে করে নিল।
মহীতোষ আর পরিতোষের মধ্যে সবচেয়ে বড় তফাত এইখানে। মহীতোষ যা পারেনি, চেষ্টাও করেনি কোনওদিন, পরিতোষ পারল। পারল, কারণ–পরিতোষের স্বভাবটাই ছিল আলাদা। সে ছেলেবেলা থেকেই বংশের গুণ পেয়েছিল, বাপ-ঠাকুরদার মতন টাকা পয়সা, হিসেব, কোথায় সাংসারিক লাভক্ষতি সেটা বুঝতে শিখে গিয়েছিল। লেখাপড়ায় পরিতোষের মাথা তেমন খোলেনি। সাধারণ ছেলের মতন স্কুল কলেজ টপকে গেছে। কলেজ টপকে যাবার আগে থেকেই সে বাবার ব্যবসাপত্রের পড়তি অবস্থা দেখছিল। বাবা মারা যাবার পর যোগেশকাকার আমলেই পরিতোষ কাকার সঙ্গে ঘোরাফেরা করতে শুরু করে। কোনও রকমে বি কম পরীক্ষাটা দিয়েই পরিতোষ ব্যবসা নিয়ে পড়ল। এব্যাপারে তার মাথা পরিষ্কার, ঝোঁকও যথেষ্ট। যোগেশকাকা বেঁচে থাকতে থাকতেই পরিতোষ পাকা হয়ে গিয়েছিল, তার দূরদৃষ্টি খুলে গিয়েছিল।
পরিতোষ যখন সংসারের ভার নিল তখন বাড়িতে লোকজন কমে গেছে। বাবা, যোগেশকাকা, পিসিমা–কেউ আর বেঁচে নেই। আশ্রিতদের মধ্যেও বেশির ভাগই নেই। শুধু সদানন্দ আর সম্পর্কে এক মাসি ছিল। পরিতোষ কাউকে তাড়ায়নি। বরং সদানন্দকে বুড়ো বয়সে সংসারের দেখাশোনার কর্তা করে দিয়েছিল।
