যাক গে, মহীতোষ আশিসকে পেয়ে যেন আরও জোর পেল। তার উদম্য গেল বেড়ে। কাগজ কলম থেকে হাতেনাতে নিজের কাজকর্ম নিয়ে মেতে উঠল মহীতোষ। দেবযানী ততদিনে মেনে নিয়েছে, মহীতোষ যা করছে, এ ছাড়া তার আর কিছু করার ছিল না।
তবু মনে মনে একটা ক্ষোভ বা প্রতিবাদ ছিল বই কী! মুখে দেবযানী কিছু আর বলত না, কিন্তু মনের দ্বিধা সে কেমন করে কাটাবে।
নীলেন্দু যা বলেছে মহীতোষের যে সেটা পছন্দ হয়নি দেবযানী বুঝতে পারল। বুঝতে পেরেও সে অখুশি হল না, কেননা নীলেন্দুর কথার সঙ্গে যেন এখনও দেবযানীর খানিকটা সায় রয়েছে।
বিছানা থেকে নেমে পড়ল দেবযানী।
মহীতোষ বলল, পরিতোষ যতক্ষণ না টাকা পাঠাচ্ছে আমি ধানের জমিগুলো কিনতে পারছি না। কথা বলে রেখেছি, কিন্তু বেশিদিন শুধু কথা দিয়ে ফেলে রাখলে চলবে না। মহিন্দর বলছিল, তাড়াতাড়ি না করলে হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। রজনী মাহাতোর বিঘে পাঁচেক জমি রয়েছে ওর গায়ে, ওটাও পেতে পারতাম যদি আগের জমিটা কেনা হয়ে যেত।
জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়াল দেবযানী। বাইরের নিস্তেজ রোদ দেখতে লাগল। পেয়ারা গাছের সরু ডাল কাঁপছে বাতাসে।
আশিসকে বললে পারতে, ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তোলার ব্যবস্থা করত, দেবযানী মৃদু গলায় বলল।
মাথা নাড়ল মহীতোষ। তোমার টাকায় আর হাত দেব না।
এখন তো দরকার।
তা হোক।
আমার টাকায় তোমার এত আপত্তি কেন?
আপত্তি কোথায়! …যা হয়েছে সবই তোমার টাকায়। তোমার টাকাই নিয়েছি। আমার নিজের তো পুরো দু হাজার টাকাও ছিল না।
দেবযানী মুখ ফেরাল না। কোথায় বুঝি একটা ঘূর্ণি উঠেছিল। তার দমকা বাতাসে উড়ে যাচ্ছিল ধুলো, দু-একটা শুকনো পাতা।
কিছুক্ষণ চুপচাপ। শেষে দেবযানী বলল, পরিতোষ বোধ হয় তোমার অংশ বেচতে রাজি হবে না।
কেন? কী জানি, আমার কেমন মনে হচ্ছে…
ওর রাজি না হবার কারণ কী। পুরনো বাড়িতে সে থাকে না। ওই ছোট গলির মধ্যে বাড়ি, তার যা চেহারা না বলাই ভাল। পরিতোষ নিজে কোনওদিন ও বাড়িতে থাকবে না। ভাঙাচোরা পুরনো বাড়ি বেচতে তার আপত্তি হবে কেন? নীচে দু-এক ঘর ভাড়াটে আর ছোট মুদির দোকান, মুড়ি বাতাসা বিক্রি হয়। মহীতোষ এমন ভাবে বলল কথাটা যেন কলকাতায় রাতারাতি বাড়ি-টাড়ি বেচে ফেলা যায়। পরিতোষ ইচ্ছে করলে অনায়াসেই কাজটা সেরে ফেলতে পারত।
দেবযানী চুপ করে থাকল। মহীতোষের বৈষয়িক বুদ্ধি সম্পর্কে তার কোনও আস্থা নেই। বরং দেবাযানী মেয়ে হয়েও কিছু কিছু বুঝতে পারে। নিজেদের বাড়িতে সে দাদাদের মুখে এসব অনেক শুনেছে। তার নিজের ধারণা, যত সহজ ভাবছে মহীতোষ কাজটা অত সহজ নয়।
মহীতোষ বলল, তুমি যা বলছ তা হতে পারে। পরিতোষ হয়তো রানুর জন্যে ঝাটে রয়েছে। একটা চিঠি লেখা এমনিতেও দরকার।
ঘরের বাইরে লাটুর গলা শোনা গেল। দুপুরের কাজকর্ম সেরে রাখছে একে একে। খানিকক্ষণ আগে কুয়া থেকে জল তুলে কলঘরের ড্রাম ভরে রাখছিল। আজ হাটবার। স্টেশনের পশ্চিম দিকে আমবাগানে হাট বসে। দুপুরেই কেনাবেচা শেষ হয়ে যায়। বিকেলের গোড়ায় ব্যাপারিরা ফিরতে শুরু করে। শীতের দিন। বিকেলের মধ্যে কেনাবেচা সেরে ফেলতে না পারলে দু-চার ক্রোশ এমনকী আরও দূর জায়গায় ফেরা মুশকিল। পায়ে হেঁটেই ফেরে বেশির ভাগ ব্যাপারি, এক-আধটা গোরুর গাড়িও থাকে। বিকেলের প্যাসেঞ্জার গাড়িতেও ফিরে যায় কেউ কেউ।
লাটু হাটে যাবে। টাকা পয়সা চাইতে এসেছে।
দেবযানী ঘরের বাইরে গেল।
মহীতোষ সামান্য বসে থেকে উঠে পড়ল। কেমন এক অশান্তি বোধ করছিল সে। দেবযানীর কাছে আরও কিছু বলার ছিল, বলা হল না। অথচ মহীতোষ নিজেই বুঝতে পারছিল না–কী বলবে সে। নীলেন্দু কি তার মন ভেঙে দেবার চেষ্টা করছে? হয়তো করছে। মহীতোষকে হতাশ করে অবশ্য কোনও লাভ নেই নীলেন্দুর। তা ছাড়া, অন্যের কথায় ভেঙে পড়ার মতন মানুষ মহীতোষ নয়।
আসলে ব্যাপারটা অন্যরকম। মহীতোষ যে বাস্তবিক কিছু করতে যাচ্ছে–এটা নীলেন্দুকে বোঝানো গেল না। খানিকটা ফাঁকা মাঠ দেখিয়ে কিছু বোঝাবার চেষ্টা করাই ভুল। যদি নীলেন্দু দেখত—ওই মাঠে কিছু ফসল ফলে আছে তবে হয়তো বুঝতে পারত মহীতোষ যা বলছে সেটা মুখের কথা নয়। তাঁতঘরের ব্যাপরাটাও ওই রকম। তাঁত বসাবার বাড়িটা টিনের চালা দিয়ে তৈরি হয়েছে মাত্র, তাঁত বসেনি এখনও। বসতে বসতে আর মাস দেড়-দুই। হাতে চালানো তাঁত। কলের জন্যে আগাম দেওয়া হয়েছে, এখনও পাওয়া যায়নি। ধানের জমি তো এযাবৎ কেনাই হল না। কথাবার্তা হয়ে রয়েছে মাত্র। যদি নীলেন্দু দেখত, মাঠে মাঠে সবুজ ফসল ফলে আছে, যদি দেখত তাঁতকলে কাজ হচ্ছে, সবজিক্ষেতে নানা রকম সবজি ফলেছে–সে হয়তো বুঝতে পারত মহীতোষ অলস হয়ে বসে নেই। কাজকর্ম করছে। কিন্তু নীলেন্দুকে দেখানোর মতন আপাতত কিছু নেই মহীতোষের। কিছু না দেখলে মানুষ কেন বিশ্বাস করবে? নীলেন্দুর সন্দেহ স্বাভাবিক।
বাইরের বারান্দায় লাটু একটা ছোটখাটো ঝুড়ি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে। দেবযানী বলে দিচ্ছে কী কী আনতে হবে হাট থেকে।
মহীতোষ বলল, নীলুর জন্যে ডিম-টিম আনতে বলল। আমিষ ছাড়া ও কি খেতে পারবে?
দেবযানী টাকা আনতে ঘরে যাচ্ছিল, কথাটা শুনল; কিছু বলল না।
বারান্দার জাফরি খুলে মহীতোষ বাইরে বেরিয়ে গেল। গাছতলায় গিয়ে বসে থাকবে। অনেক সময় তার এই রকমই হয়। মন চঞ্চল হয়ে পড়লে, কিংবা কোনও অস্বস্তি বোধ করলে সে সকাল কিংবা দুপুরে গাছতলায় গিয়ে বসে থাকে। নানা রকম কথা ভাবে।
