দেবযানী বলল, ওর বউয়ের শরীর খারাপ হয়েছে হয়তো।
মহীতোষ দেবযানীর চোখের দিকে তাকাল, এক পলক, তারপর চোখ ফিরিয়ে নিল।
দেবযানীর কলকাতায় থাকার সময়েই পরিতোষ বিয়ে করেছিল। মহীতোষ বড় ভাই, কাজেই ছোট ভাইয়ের বিয়েতে তাকে সামাজিক ভাবে অভিভাবকের ভূমিকা নিতে হয়েছিল। এরকম কোনও ভূমিকায় তাকে মানায় না, তবু মহীতোষ কোনও রকমে তার কর্তব্য পালন করেছিল। দেবযানী পরিতোষদের বিয়েতে ওবাড়ি গিয়েছিল নিমন্ত্রিত হিসেবেই। তার আগেও সে পরিতোষকে দেখেছে। পরিচয় আছে। পরিতোষের বউকে অবশ্য বউভাতের দিনই প্রথম দেখল। ভালই দেখতে। পরিতোষের জানাশোনা মেয়ে। বয়েস কম, পুরোপুরি সাবালিকাও হয়তো নয়, অন্তত চেহারার মধ্যে সেটা ফুটে ওঠেনি তখনও। খুবই ছেলেমানুষ ছেলেমানুষ দেখাচ্ছিল। পরিতোষের বউয়ের নাম এষা, ডাক নাম রানু।
কিছুদিন–তা মাসখানেকের ওপর হতে চলল–পরিতোষ তার দাদাকে যে চিঠি দিয়েছিল সেই চিঠির মধ্যে, এবং রানু ছোট করে দেবযানীকে যে চিঠি লিখেছিল তার মধ্যে–দেবযানী একটা আভাস পেয়েছিল রানুর শরীর-স্বাস্থ্যের। ওর বাচ্চাকাচ্চা হবে মনে হয়েছিল।
মহীতোষ বলল, টাকার জন্যে কাজকর্মের দেরি হয়ে যাচ্ছে বড়।
দেবযানী ততক্ষণে পা গুটিয়ে হাঁটু মুড়ে বসেছে। তার বসার এই ভঙ্গি তাকে চমৎকার মানায়। বয়েস হওয়া সত্ত্বেও শরীর অতটা ভারী হয়ে ওঠেনি যে গড়নের সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে গিয়েছে, হাত পা এখনও যথেষ্ট স্বাভাবিক দেবযানীর, মেদসঞ্চিত নয়, কোমর ভেঙে বসতে তার অসুবিধে হয় না। পেছনের দিকটা ভারী হলেও পিঠের সঙ্গে মানানসই করে বাঁকানো। মাথায় সামান্য লম্বা বলেই দেবযানীর যেখানে যেটুকু স্থূলতা তা যেন দৃষ্টিকটু হয়ে চোখে পড়ে না।
তুমি যে কী ভাব- দেবযানী বলল, বাড়ি বিক্রি অত তাড়াতাড়ি হয় নাকি? তা ছাড়া তোমাদের পুরনো বাড়ির একটা দিক ওভাবে বেচা কি সহজ?
কী জানি! কলকাতায় বাড়ি বেচাকেনা শুনেছি রাতারাতি হয়।
ওসব শোনা কথা, কাজের কথা নয়।
মহীতোষ কেমন অধীর ভাবে বলল, পরিতোষ নিজেই নিয়ে নিক না। আমি তো তাকে লিখেছি।
দেবযানী সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল না, পরে বলল, পরিতোষ ব্যবসাপত্র করে। অতগুলো টাকা সে হুট করে এদিকে ঢালবে কেন? তাতে তার অসুবিধে। তা ছাড়া অনেকেই ভাই কি দাদার সম্পত্তির অংশ কিনতে চায় না।
মহীতোষ কথাগুলো শুনল কি শুনল না, বলল,দেখি, তাগাদা দিয়ে আবার একটা চিঠি লিখি…।
দেবযানী কোনও জবাব দিল না।
শীতের এই মাঝদুপুর একেবারে নিস্তব্ধ। দেবযানীর ঘরের জানলায় পরদার মতন এক টুকরো কাপড় ঝুলছে, মোটা কাপড়, গম্ভীর হলুদ রঙের, বাইরে রোদ ক্রমশই যেন তাত হারিয়ে শুধু জ্বলজ্বল করছে, বাতাস বইছিল শীতের। কাক চড়ুই–কিছুই ডাকছে না। একেবারে স্তব্ধ যেন চতুর্দিক।
মহীতোষ বলল, নীলু কী বলছিল জান?
তাকাল দেবযানী। নীলেন্দু কী বলতে পারে অনুমান করা তার অসাধ্য নয়। তবু মহীতোষ কী বলতে চাইছে জানার সাধারণ আগ্রহ বোধ করল দেবযানী।
সামান্য চুপ করে থেকে মহীতোষ বলল, ও বলছিল, আমি ভদ্রলোকের ছেলে শহুরে মানুষ এখানে এসে যা করছি এর কোনও মানে হয় না। আমি ছেলেমানুষি করছি। আমার এ খেয়াল দু দিনেই ভেঙে যাবে।
দেবযানী তেমন একটা অখুশি হল না। নীলেন্দুর মতন অতটা নিঃসন্দেহ সে এখন আর হতে পারে না। আগে হয়েছিল। মহীতোষের এই অদ্ভুত খেয়াল কতটা সাংসারিক সে বিষয়ে প্রচুর সন্দেহ ছিল তার। বারণও কবেছে সাধ্য মতন। মহীতোষ শোনেনি। যুক্তি দিয়ে বোঝাবার চেষ্টা করেছে–পরিশ্রম আর আন্তরিকতা থাকলে না হবার কারণ কী? আমাদের স্বভাব হল, মানুষকে সব সময়েই সীমাবদ্ধ করে দেখা, তার সম্ভাবনাকে আগে থেকেই আংশিকভাবে বিচার করে নেওয়া। এটা ঠিক নয়, মানুষ তার পুরনো অভ্যস্ত পারিপার্শ্বিক বদলে নিতে পারে, তার অভ্যাস পালটেও যায়। মানুষকে যদি পুরোপুরি তার বিশেষ সমাজের, শিক্ষার, রুচির, কর্মক্ষমতার দাস করে দেখা যায় তবে তার সম্ভাবনাকে মূল্য দেওয়া হয় না। প্রয়োজনে যে মানুষ সমস্ত রকম অবস্থার মুখোমুখি দাঁড়াতে পারে তার অজস্ব প্রমাণ সংসারের মধ্যেই ছড়িয়ে আছে।
দেবযানী যে মহীতোষের সঙ্গে কোমর বেঁধে তর্ক না করেছে এমন নয়, কিন্তু সে বুঝে নিয়েছিল ব্যাপারটা তর্ক করে মীমাংসা করা যাবে না। জেদের সঙ্গে তর্ক চলে না। সঙ্কল্পের সঙ্গেও নয়।
নিজের অনিচ্ছা আপত্তি যতই থাকুক শেষ পর্যন্ত দেবযানী অবশ্য মহীতোষের সাধ বাসনায় বাধা দেয়নি। বরং মহীতোষ যে ভাবে দিন দিন নিজেকে তার অবাস্তব ভাবনা চিন্তার সঙ্গে জড়িয়ে ফেলছিল তাতে মনে হল, ব্যাপারটা হালকা করে দেখার নয়। দেবযানীও যেন ক্রমশ মহীতোষের দিকে ঢলে পড়তে লাগল।
ঝাড়গ্রামে থাকতেই মহীতোষ আশিসকে পেয়ে গিয়েছিল। বড় ভাল ছেলে আশিস। বয়স কম। মাথার মধ্যে পোকা নড়লে সেও মহীতোষের চেয়ে কিছু কম যায় না। দুজনে মিলে কত রকম কথা হত, কাগজপত্র টেনে নিয়ে লেখালিখি হিসেবপত্র চলত, আশিসকে সঙ্গে করে ঝাড়গ্রামের চারদিকের জলমাটির খবর করে বেড়িয়েছে মহীতোষ, কোথায় কোন ফসল ফলে, কতটা ফলে, জলের অভাব, মাটির গুণ-অগুণ। খরচখরচার রাশি রাশি হিসেব লিখেছে। আশিস ঝাড়গ্রামের ছেলে, তার অনেক কিছুই নখদর্পণে, মুখ বুজে কাজও করতে পারে। তা ছাড়া, এই অল্প বয়সে যা হয় এরা–মনে মনে স্বপ্ন দেখতে ভালবাসে, সেই ধরনের মন আশিসের। আজকালকার শহুরে, বিশেষ করে কলকাতার ছেলেদের চেয়ে অন্য ধাতের ছেলে আশিস, জীবনে বড় বড় আদর্শ-টাদর্শ নিয়ে মুগ্ধ হতে ভালবাসে।
