মহীতোষ শিবপ্রসাদের প্রথমা স্ত্রীর সন্তান। দ্বিতীয় স্ত্রীর সন্তান পরিতোষ। একটি মেয়ে মাঝখানে ভূমিষ্ঠ হলেও বাঁচেনি। কোনও সন্দেহই নেই, শিবপ্রসাদ তাঁর প্রথমা স্ত্রীর সন্তানের ওপর নজর দেননি। প্রয়োজন বোধ করেননি বোধ হয়। মহীতোষ বাল্যকাল থেকেই পিতার দৃষ্টির বাইরে বাইরে বেড়ে উঠছে। সম্ভবত প্রথমা স্ত্রীর প্রতি শিবপ্রসাদের যে বিরাগ এবং ঘৃণা ছিল তার খানিকটা মহীতোষের ওপরেও পড়েছিল। তা ছাড়া শিবপ্রসাদ পুত্ৰপালনকে কর্তব্য বলে মনে করতেন না। যদি বা কখনও তাঁর মনে কর্তব্যজ্ঞান জন্মে থাকে স্ত্রীর ভয়ে মুখ খুলতে সাহস করেননি। এরকম দু-একটা নজির না আছে এমনও নয়। প্রথমা স্ত্রী মারা যাবার পর দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে শিবপ্রসাদ প্রথম দিকে এতই আতিশয্য করেছেন যে, মহীতোষ তাঁর লক্ষে পড়েনি। বরং পরিতোষের জন্মের পর সে শিবপ্রসাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। পরে আর নয়।
বাল্যকাল থেকেই মহীতোষ অযত্নবর্ধিত। যেন বাগানের বহু গাছপালার মধ্যে সে শখের কিংবা যত্নের কোনও গাছ নয়, নিতান্তই কেমন করে জন্মে গেছে, এবং প্রতিটি ঋতুতে নিজের মতন বেড়ে উঠেছে। কেউ তার দিকে চোখ দেয়নি, দেবার কথা মনে করেনি। একেবারে অনাবশ্যক যেন। সুখের কথা মহীতোষ অযত্নবর্ধিত হলেও অত্যাচারিত হয়নি। খানিকটা পিসিমার জন্যে, আর বাকিটা বোধ হয় এই কারণে যে, সংসারের কেউই সেটা প্রয়োজন মনে করেনি। মহীতোষের বিমাতা মানে পরিতোষের মা-ও মহীতোষকে চোখের কাঁটা মনে করত না। বরং বিমাতা হয়েও কখনও কখনও মহীতোষকে আদর যত্ন করেছে ছোট মা।
মহীতোষ বাল্যকাল থেকেই দেখেছে–তাদের পরিবারটি ছিল বিচিত্র। মা, বাবা, পিসিমা, ছেলেরা এই নিয়ে সংসার। কিন্তু এদের বাদ দিয়ে আরও জনা সাতেক পুষ্যি ছিল বাবার। চাকর-বাকর না ধরেই। কারখানার যোগেশবাবু আর সদানন্দ, দেশের কোন জ্ঞাতি সম্পর্কে এক বুড়ো মামা, পিসিমার শ্বশুরবাড়ির কোনও ভাগ্যহীনা ভাসুরঝি–এই রকম। বাড়ির কর্তা এসব ব্যাপারে কথা বলতেন না, ধরেই নিয়েছিলেন সকলেই তাঁর সংসারের অন্তর্ভুক্ত।
শিবপ্রসাদ মারা যাবার পর যোগেশবাবু–মহীতোষরা যাঁকে যোগেশকাকা বলত, বছর দুই ব্যবসাটাকে ধরে রেখেছিলেন। তারপর আর পারলেন না। মহীতোষ ততদিনে বড় হয়ে গেছে পরিতোষও সাবালক। মহীতোষ কোনও দিনই বাবার ব্যবসা সম্পর্কে আগ্রহী ছিল না বিন্দুমাত্র। পরিতোষ বরাবরই যন্ত্রপাতি নিয়ে মাথা ঘামাত, তার শখও ছিল মেশিন টুলস-এর বিক্রিবাটা নিয়ে থাকে। ফলে বেলেঘাটার কারখানার পুঁজিপাটা গুটিয়ে এনে পরিতোষ তার নিজের ব্যবসায় নেমে পড়ল। সংসারের বাড়তি লোকগুলোও ততদিনে হয় মারা গেছে, না হয় চলে গেছে। পিসিমাও মারা গেল।
একটা কথা এখানে বলতে হয়। মহীতোষ আর পরিতোষের মধ্যে বয়সের তফাত বছর সাতেকের। মহীতোষের বছর পাঁচ বয়েসে মা মারা যায়। বাবা পুরো বছরটাও অপেক্ষা করেননি, দ্বিতীয়বার বিয়ে করে আনেন, পরিতোষ জন্মায় পরের বছর। দুই ভাইয়ের মধ্যে বয়েসের ব্যবধানও মহীতোষকে পরবর্তীকালে অভিভাবক হবার সুযোগ দেয়নি। সে সুযোগ মহীতোষ চায়নি, তার ইচ্ছাও ছিল না, তা ছাড়া বাড়ির সঙ্গে হৃদয়ের যোগাযোগ মহীতোষ অনুভব করত না। পরিতোষের সঙ্গে তার সম্ভাব কিন্তু ছিল, হয়তো ওই একটিমাত্র জায়গায় সে কোনও পারিবারিক বন্ধন অনুভব করত। পরিতোষও কোনও দুর্বোধ্য কারণে মহীতোষের প্রতি আন্তরিক প্রীতি অনুভব করেছে বরাবর। একটা সময় গিয়েছে যখন পরিতোষ তার দাদার নানা রকম কাণ্ডকারখানায় বিরক্ত এবং অস্বস্তি বোধ করেছে। আতঙ্কিতও হয়েছে। নিষেধ করেছে। কিন্তু মহীতোষকে বদলাতে পারেনি।
এখন দুই ভাই যে যার মতন, যে যার পথে, স্বাধীন ভাবে চলেছে। হয়তো পরিতোষ দাদার কোনও কোনও ব্যাপারে অখুশি। কিন্তু বিরোধ বাধাবার মতি তার হয়নি।
.
সেদিন দুপুর বেলায় মহীতোষ যেন কিছু মনে করে দেবযানীর ঘরে গিয়ে দেখল, দেবযানী বিছানায় শুয়ে বই পড়ছে।
মহীতোষকে দেখে মুখের পাশ থেকে বই সরিয়ে দেবযানী তাকাল।
মহীতোষ কাছাকাছি এসে কিছু বলতে গিয়ে হঠাৎ থেমে গেল। অন্যমনস্কভাবে দেখতে লাগল দেবযানীকে। তারপর বলল, তোমার কাছে খাম আছে?
না, দেবযানী বলল, বলে খানিকটা যেন অবাক চোখে মহীতোষকে দেখতে লাগল। খাম-টাম, পোস্টকার্ডের সঙ্গে তার সম্পর্ক কবে চুকে গেছে, কলকাতা ছেড়ে চলে আসার পর সে একটা কি দুটো চিঠি লিখেছিল, আর এখানে এসে কখনও-সখনও আশিসকে সাংসারিক প্রয়োজনে কিছু লিখতে হয়, লেখার সময় তাকেই মহীতোষের কাছে খাম পোস্টকার্ড চেয়ে নিতে হয় বরাবর। দেবযানীর কাছে কিছু থাকে না।
মহীতোষ বলল, পরিতোষকে একটা চিঠি দেব ভাবছিলাম।
তোমার কাছে নেই?
ফুরিয়ে গেছে।
বই রেখে দেবযানী উঠে বসল। মহীতোষ তখনও দাঁড়িয়ে।
পরিতোষ যে কী করছে আমি বুঝতে পারছি না, মহীতোষ সামান্য দুশ্চিন্তার মুখ করে বলল, কিছুই জানাচ্ছে না।
বিস্তারিত করে বলার কিছু ছিল না দেবযানীকে, সে জানে মহীতোষ কী কারণে উদ্বেগ বোধ করে। টাকা। মহীতোষ টাকার জন্যে রীতিমতো ভাবনায় পড়েছে।
কী মনে করে মহীতোষ দেবাযানীর বিছানার একপাশে বসল। সেই কবে একটা চিঠি দিয়ে জানিয়েছিল, ব্যাপারটা নিয়ে ভাবছে–তারপর আর কোনও চিঠিপত্র নেই। শরীর-টরীর খারাপ করল কি না কে জানে?
