মহীতোষ বলল আমি তো বলিনি আমি নিজের হাতে চাষ করছি। যারা এসব কাজ করত তারাই করবে।
তুমি তা হলে ফাইনান্স করছ?
করছি। শুধু তাই নয়, ওদের সঙ্গেও থাকছি।
বাঃ! জমি তোমার, আশা করছি–জমি চাষের গরু, লাঙ্গল এসবও তোমার হবে। তাঁতঘরের তুমি মালিক হবে, যন্ত্রপাতির মালিকানাও তোমার থাকবে। তার মানে তুমি এখানে জমি জায়গা তাঁতঘরের মালিকানা ভোগ করবে, আর কিছু লোক তোমার লাভের জন্যে খাটবে। এই তো?
মহীতোষ কিছুক্ষণ নীলেন্দুকে দেখল। যেন তার কোথায় ঘা লেগেছে। সামান্য গম্ভীর গলায় বলল, না, আমি মালিকানা ভোগ করব না।
নীলেন্দু তাকাল।
দেবীর ওই বাড়ি, আর তার কিছু গচ্ছিত টাকার মালিকানাও আমার নয়, নীলু। আমার কোথাও কোনও মালিকানা নেই। …আমি যা করছি তার মালিকানা আমার সঙ্গে যারা থাকবে তাদের সকলের। এটা আমার মুখের কথা নয়। আইনসঙ্গতভাবে সেই ব্যবস্থাই করা হচ্ছে।
টাকাটা তো তোমাদের?
দেবীর কিছুটা, আমার যৎসামান্য। …আমাদের কলকাতার পুরনো বাড়ির আমার অংশটা পরিতোষ বেচে দিতে পারলে সেই টাকাটা আমি এই বাবদ ঢালব। টাকার আমার বড় দরকার। মহীতোষ কেমন অন্যমনস্ক হয়ে গেল।
নীলেন্দু বলল, তুমি বলতে চাইছ, মহীতোষ অ্যান্ড কোম্পানির ফার্মিং-এর ব্যাপারটা তুমি এখানকার গরিবগুরবোদের দান করছ?
অসন্তুষ্ট হল মহীতোষ, বলল, দান নয়, দায়। এই দায় ওদের সকলের। যেখানে নিজের বলে কিছু থাকে না সেখানে মানুষ মনের টান পায় না। মায়ায় জড়ায় না। যদি ওই জমি, ফসল, ওই তাঁত–সবই তার নিজের বলে মনে করে তা হলে সে নিজেকে কাজের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলবে। আমাদের দেশের মানুষের বিশেষ করে যারা জমির সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাদের শ্রমশক্তির কতটা ব্যয় হয় আর কতটা হয় না তুই জানিস?
নীলেন্দু অ-মনোযোগের গলায় বলল, শুনেছি যেন কোথায়!
একটা মোটামুটি হিসেব, বছরের মধ্যে ছ-সাত মাস…। এই ছ-সাত মাস আমাদের দেশের গ্রামের মানুষ তার শ্রম-ক্ষমতার অপব্যয় করে। এই ক্ষতির পরিমাণ কত জানিস।
নীলেন্দু মাথা নাড়ল। বলল, মহীদা, তুমি আমায় কাগজের হিসেবের ফাঁদে ফেলো না। ওটা আমি বুঝি না। বুঝতেও চাই না। …আমি শুধু বুঝি, এই কাঠামোয় কিছু হবে না–হবার নয়। …তোমার এই চেষ্টা আমার কাছে ছেলেখেলা ছাড়া কিছু মনে হচ্ছে না। আমাকে তুমি মাপ করো।
মহীতোষ আর কিছু বলল না।
আরও সামান্য বসে থেকে গাছের ছায়া থেকে উঠে পড়ল দুজনে। বাড়ির দিকে ফিরতে লাগল।
খানিকটা হেঁটে এসে নীলেন্দু যেন আপনমনে বলল, মানুষ কেমন বদলে যায়। আমি স্বীকার করি, জীবনটা ছাঁচে ঢালা ধাতব পদার্থনয়, তার নিজের একটা গতি আছে, আস্তে আস্তে নানা টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে তার অদলবদল ঘটে যায়। কিন্তু এরকম নাটকীয় বদল আমি দেখিনি। অন্তত তোমার বেলায় ভাবিনি, মহীদা।
মহীতোষ কোনও জবাব দিল না।
তুমি, নীলেন্দু মহীতোষকে আঙুল দেখিয়ে বলল, সেদিনও বড় বড় কথা বলতে। দেশ নিয়ে, দেশের মানুষ নিয়ে তোমার মাথাব্যথার অন্ত ছিল না। গলায় তখন তোমার কী ঝাঁঝ, রক্তে যেন আগুন ছিল, বিপ্লব, রেভলুশন, এই অথরিটি, করাটেড সিস্টেম এর মধ্যে থেকে কী করে বেরিয়ে আসা যায় তার কথা বলতে। আর আজ তুমি জমিতে আলু বেগুন ঝিঙে ফলাবার কথা বলছ! আশ্চর্য! বলতে বলতে নীলেন্দু কেমন ঘৃণার চোখে মহীতোষের দিকে তাকাল।
২. পরিবারের একটা ইতিহাস
০৬.
মহীতোষদের পরিবারের একটা ইতিহাস আছে। এরকম ইতিহাস যে কলকাতা শহরে বাঙালি পরিবারে আর দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া যাবে না–তা অবশ্য নয়। বরং অজস্রই পাওয়া যাবে। তবু এই ইতিহাসের খানিকটা চমৎকারিত্ব রয়েছে।
মহীতোষের বাবা শিবপ্রসাদ ছিলেন কারবারি মানুষ। পুরনো বাগমারির দিকে তাঁর কারখানা ছিল, পৈতৃক আমলের কারখানা, যেখানে নানা ধরনের রাসায়নিক পদার্থ তৈরি হত। শিবপ্রসাদের বাবা যখন কারখানা খুলছিলেন তখন বাঙালিদের মধ্যে ব্যবসায় নামার একটা হিড়িক পড়েছিল। চাকরির বাজারের মন্দা চলছিল বলেই শুধু নয়, বাণিজ্যে না নামলে বাঙালির অন্ন জুটবে না–এই বিশ্বাসেই আবেগ এবং উচ্ছ্বাসের বশে রাতারাতি যারা নেমেছিল তাদের বেশির ভাগই টিকতে পারেনি। শিবপ্রসাদের বাবা কিন্তু টিকে গিয়েছিলেন। তখন বাগমারির দিকে লোকালয় বলে বিশেষ কিছু ছিল না, পতিত জমি জলের দরে বিক্রি হত। অনেকটা জমিজমা ইজারা নিয়ে এক বন্ধুর পরামর্শে শিবপ্রসাদের বাবা তাঁর কেমিক্যালস-এর কারখানা খোলেন। বছর পনেরো পরিশ্রমও করেছিলেন প্রচুর। শেষের দিকে ভাল মতন অর্থ উপার্জনও করতে পেরেছিলেন। ব্যবসার যখন সুদিন তখন তিনি মারা যান। শিবপ্রসাদ বাবার ব্যবসায় মন দেবার পর প্রথম দিকে কোনও বাধা পাননি। তারপর একে একে নানা দিক থেকে ঝঞ্জাট এসে জুটতে লাগল। কারখানার লিজের জমি নিয়ে অদ্ভুত এক মামলায় জড়িয়ে পড়লেন, বাজারে প্রতিযোগিতা বেড়ে উঠতে লাগল, কারখানায় গণ্ডগোল অশান্তি। বিশ্বস্ত এক কর্মচারিও তাঁকে দেনায় ডুবিয়ে পালিয়ে গেল। কারখানা বেচে দিয়ে শিবপ্রসাদ বেলেঘাটার দিকে ব্যাটারি তৈরির কারখানা খুললেন। সেটা মোটামুটি ভালই চলতে লাগল।
শিবপ্রসাদ যখন বাগমারির কারখানা নিয়ে ব্যতিব্যস্ত–তখন তাঁর প্রথমা স্ত্রী মারা যান। প্রথমা স্ত্রীর সঙ্গে শিবপ্রসাদের সম্পর্ক ভাল ছিল না। ভাল না থাকার কারণ অবশ্য একাধিক। প্রথম কারণ, স্ত্রী তাঁকে সন্দেহ করত। শিবপ্রসাদ পরিশ্রমী পুরুষ হলেও তাঁর কিছু কিছু দুর্বলতা ছিল। দরজিপাড়ায় একটা বাড়িতে তাঁর যাতায়াত ছিল নিত্য, সেই বাড়ির এক থিয়েটার করা মেয়ের তিনি ভরণ-পোষণ নির্বাহ করতেন। নিজের স্ত্রীকে শিবপ্রসাদ পছন্দ করতেন না। প্রথমত স্ত্রীর রূপের জন্যে, দ্বিতীয়ত তার মুখরা স্বভাবের জন্যে। মনে মনে শিবপ্রসাদের ভীষণ ক্ষোভ ছিল, বাবা কেমন করে এই মদ্দা চেহারার মেয়েটির সঙ্গে তাঁর বিয়ে দিলেন। সম্ভবত অর্থের জন্যেই। তাঁর স্ত্রীর মুখশ্রী বলে কিছু ছিল না, শরীর স্বাস্থ্যেও মেয়েলি গড়নের অভাব ছিল প্রচুর, গায়ের রং ছিল খানিকটা ফরসা এই যা। কিন্তু এমন মুখরা, জেদি, নির্বোধ মেয়েও সচরাচর দেখা যায় না। প্রথমা স্ত্রী মারা যাবার পর শিবপ্রসাদ যথার্থ ভাবে কোনও দুঃখ পাননি। বরং মুক্তিই অনুভব করেছিলেন। দ্বিতীয় বার বিয়ে করার সময় শিবপ্রসাদ নিজেই পাত্রী পছন্দ করেছিলেন। বাবা তখন জীবিত নেই। নিজের বয়সের সঙ্গে মানানসই করে যাকে তিনি পছন্দ করলেন, সেই মেয়েটি অসাধারণ সুন্দরী না হলেও চোখে ধরার মতন। দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়েও শিবপ্রসাদ সুখী হতে পারেননি, কেননা দ্বিতীয় স্ত্রী ছিল অত্যন্ত চতুর, দাম্ভিক, বেপরোয়া। শিবপ্রসাদ পরে বুঝতে পারেন, তিনি ভুল করেছেন। আর এটাও ধরতে পারেন, তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী বাপের বাড়ির এক দূর আত্মীয়ের প্রতি আসক্ত। শিবপ্রসাদ নিজের চারিত্রিক দুর্বলতা শোধরাতে পারেননি, কাজেই স্ত্রীর সঙ্গে কলহে জিততেও পারেননি কখনও। দ্বিতীয় স্ত্রী মারাও গেল রহস্যজনক ভাবে। বাইরের রটনা আর যথার্থ ঘটনা এক নয়। পারিবারিক সম্মানের জন্যে শিবপ্রসাদ নানা জায়গায় ধরাধরি করে অর্থব্যয় করলেন, লোকে জানল–মেয়েলি কোনও মারাত্মক ব্যাধি এবং রক্তক্ষরণের জন্যে শিবপ্রসাদের স্ত্রী মারা গেছেন। শিবপ্রসাদও আর বেশিদিন বেঁচে থাকেননি। হার্টের রোগে মারা যান।
