বিন্দুমাত্র উৎসাহ প্রকাশ করল নানীলেন্দু, তাচ্ছিল্যের গলায় বলল, ছেলেবেলা থেকেই তো বইয়ে পড়ানো হয়েছে, ভারতবর্ষ কৃষিপ্রধান দেশ।
তুই অত তুচ্ছ করে ব্যাপারটা দেখিস না। আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষই এখনও চাষ আবাদ করে পেটের অন্ন জোগায়। …ধানচাল গমের কথা বাদ দেধর, আজ তোদের কলকাতা শহরের বাজারে বাজারে লক্ষ লক্ষ মানুষের আলু পটল কুমড়ো তরিতরকারি এসব কারা জোগাচ্ছে? কাদের পরিশ্রমে তোরা খেতে পাচ্ছিস আমি সে কথাও বলছি না। বলছি যারা খেতখামারে আলু, কচু, পটল, শাকসবজি ফলাচ্ছে, তারা সেগুলো বাজারে বেচে নিজেদের ভাতকাপড়ের ব্যবস্থা করছে। এটা তাদের জীবিকা, তাই কি নয়?
বেশ তো, তাতে কী!
তাতে কথাটা দাঁড়াচ্ছে, ওই দশ বিঘে জমির ফসল যারা ফলাবে, সেই ফলনের বিনিময়ে খুব কম করেও দশ-বিশ জন মানুষের গ্রাসাচ্ছাদন হবে।
নীলেন্দু এবার হেসে ফেলল। বলল, ও!
মহীতোষ যেন সামান্য অপ্রতিভ হল। নীলেন্দুর দিকে তাকাল না, চোখ ফিরিয়ে মাঠের দিকে তাকিয়ে থাকল।
নীলেন্দু কেমন বিরক্ত বোধ করল, বলল, তোমার মাথা সত্যি সত্যি খারাপ হয়ে গিয়েছে মহীদা; এসব ছেলেমানুষির কোনও মানে হয় না। আমি অন্তত বুঝতে পারছি না।
মহীতোষ রাগ করল না, বিরক্তও হল না; বলল, তোরা যে জিনিসগুলোকে তুচ্ছ ভাবিস, সেগুলো অত তুচ্ছ নয়। আমাদের দেশের রাজনীতি সমাজনীতি সব নীতির কাজ হল গোড়ার ব্যাপারটা অবজ্ঞা করা।
ঠাট্টা করে নীলেন্দু বলল, তুমি কি তা হলে গোড়ায় জল ঢালছ?
কথাটা পুরোপুরি উপেক্ষা করে মহীতোষ বলল, আমার সব কথা তো শুনলি না–আগে থেকেই চেঁচাতে শুরু করলি। নীলু, তোর স্বভাবটা পালটে যাচ্ছে, তুই একেবারে ওয়েস্ট বেঙ্গল অ্যাসেম্বলির এম-এল-এ হয়ে যাচ্ছিস! বলে মহীতোষ হেসে ফেলল, জোরেই।
নীলেন্দুও হাসল। কেমন এক বিরক্তির মধ্যে এই হাসি যেন অবস্থাটাকে সহনীয় করে তুলল। নীলেন্দু বলল, বলো, তোমার কথা শুনি।
মহীতোষ তার উদ্দেশ্যের কথা বলতে লাগল।
ওই যে দশ বিঘে মতন জমি–যাতে এক-আধ বছর চাষবাসের চেষ্টা করে কোনও সুফল পাওয়া যায়নি, ওই জমিটাকে মহীতোষ কাজে লাগাবে। কাজে লাগাবে ধান চাষ করে নয়, অন্য রকম ফসল ফলিয়ে। জমির মাটি যেরকম তাতে তরিতরকারির ফসল হতে পারে। জল কাছাকাছি পাওয়া যাবে। সামান্য দূরে একটা ঝিলের মতন আছে, প্রচণ্ড গ্রীষ্মে শুকিয়ে আসার মতন হলেও সারা বছরই তাতে অল্পস্বল্প জল থাকে। সেই জল বয়ে আনার জন্যে ছোট করে নালা কাটা শুরু করেছে মহীতোষ, ওই যে মাটির স্তূপ ওর গায়েই সেই ঝিল।
মহীতোষ বলল, ধানের জমি স্টেশনের পুব দিকে। ধানের জমি এখনও হাতে আসেনি। কথাবার্তা চলছে। শীঘ্রি হয়তো হাতে আসবে।
এ ছাড়া, মহীতোষ একটা তাঁতঘর বসাবার ব্যবস্থা করছে। মোটামুটি কাজও এগিয়েছে খানিকটা। মাস দেড়েকের মধ্যে কাজ শুরু করতে পারবে বলে মনে হয়।
নীলেন্দু ব্যঙ্গ করে বলল, একটা কুমোরপাড়া বসাবে না?
মহীতোষ বলল, বসাতাম যদি এখানে কুমোর থাকত। তবে ইটের ভাটিখানা বসাতে পারি। শুনেছি এখানে ইট করার সুযোগ রয়েছে।
রোদ আরও গাঢ় তপ্ত হয়ে উঠেছিল। সামনের প্রান্তর যেন রং ধরার মতন দেখাচ্ছিল উজ্জ্বল হলুদ। এক জোড়া পাখি উড়ে যাচ্ছিল। বাতাস রয়েছে। দিগন্তে কালচে রেখার মতন গাছপালার মাথায় আকাশ লুটিয়ে পড়েছে।
নীলেন্দুর ভাল লাগছিল না। মহীদা এতটা নির্বোধ হতে পারে তার জানা ছিল না আগে। এমনকী তার বিশ্বাস করতেও ইচ্ছে করছিল না, কোনও মানুষ এই বয়েসে এমন একটা ছেলেখেলায় নামতে পারে।
যেন ক্লান্ত বিরক্ত হয়েই নীলেন্দু আবার একটা সিগারেট ধরাল। কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর বলল, তুমি তা হলে এই সব করবে ঠিক করেছ?
হ্যাঁ।
এতে কী হবে?
কিছু লোক খেতে পারবে।
তাই কী?
তোর সন্দেহ হচ্ছে? তা হলে জিজ্ঞেস করি, এখানকার লোকগুলো খায় কী? কী খেয়ে তারা বেঁচে আছে? এটা তোমাদের কলকাতা শহর নয় যে গভর্নমেন্ট রেশন দিয়ে এদের বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। এখানে কোনও কারখানা নেই, কাজেই চাকরিবাকরির কথা ওঠে না। জমি কুপিয়ে আর বাইরে গিয়ে দিনমজুরি করে এদের জীবন কাটে। ..আমি হিসেব করে দেখেছি, যদি আমার কাজকর্ম ঠিকঠিক মতন চালাতে পারি তাহলে এখানকার পঁচিশ-ত্রিশটা পরিবার মোটামুটি খেতে পরতে পারবে।
তুমি কি পঁচিশ ত্রিশটা পরিবারকে মোটামুটি খাওয়ানো যথেষ্ট মনে করো?
যথেষ্ট মনে করি না,নীলু। কিন্তু সমস্ত মানুষেরই সাধ্য আছে। আমার সাধ্যে এইটুকুকুলোতে পারে আপাতত। যদি বলিস আমি কি আরও বড় কিছুর কথা ভাবি না, তা হলে বলি, ভাবি। কিন্তু সে দিবাস্বপ্ন দেখে লাভ কী? আমি যেটুকু করতে চাইছি তাতেই আমার অনেক টাকার দরকার। সেই টাকার জন্যেই মরছি। এর বেশি এখন আর কিছু করার উপায় আমার নেই।
নীলেন্দু সিগারেটের কোনও স্বাদ পেল না। মুখ থেকে ধোঁয়াটা ঠেলে বের করে দিল। পরে বলল, তোমার এই সব কাজ কোনও কাজ নয়। বাস্তবিকপক্ষে তুমি কিছুই করছ না। করতেও পারবে না। মাসকয়েক আলু-বেগুনের চাষ নিয়ে থাকবে তারপর ছেড়ে দেবে।
মহীতোষ এবার যেন ক্ষুব্ধ হল। বলল, কেন?
কেন, সেকথা আমায় জিজ্ঞেস করছ! আশ্চর্য!
তবু শুনি ।
এ তোমার কাজ নয়, মহীদা। তুমি ভদ্র পরিবারের শিক্ষিত ছেলে, হয়তো তত বড়লোক নও, কিন্তু গরিব ঘরের ছেলেও নও। শহুরে মানুষ তুমি। চাষ আবাদ ফসলের তুমি কিছু জানো না, মাটিতে সোনা ফলানো তোমার কর্ম নয়। যদি তুমি চাষি পরিবারের ছেলে হতে আমি তোমায় বাহবা দিতাম। এটা তোমার খেয়াল।
