সিধু মারা গেছে? দেবযানী যেন চমকে উঠল। কই বলোনি তো?
তোমায় বলিনি। মহীদাকে বলেছি কাল।
আমি শুনিনি।
সিধুকে তুমি পছন্দ করতে না। বলতে, ওকে দেখলে তোমার ভয় করে।
আমার পছন্দ অপছন্দর ওপর একটা লোকের মরাবাঁচা নির্ভর করে না, দেবযানী কেমন অন্যমনস্ক উদাস গলায় বলল। একটু থেমে আবার বলল, সিধুকে আমার ভাল লাগত না; কিন্তু সে মারা যাক এ তো আমি চাইনি। …কবে মারা গেছে?
মাস দুয়েক আগে।
কলকাতাতেই?
না, নৈহাটির দিকে। পুলিস মেরেছে না অন্য কেউ জানি না।
দেবযানী চুপ করে থাকল। কেমন একটা স্তব্ধতা এসেছে হঠাৎ। মহীতোষ বাগানের দিক থেকে এগিয়ে আসছে। কটা চড়ুই পাখি পাক খেয়ে কুয়োতলা থেকে উড়ে গেল। কোথাও কোনও শব্দ নেই। বারান্দায় রোদ ছড়িয়ে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। রান্নাঘরের একটা দরজা বাতাসে সামান্য বেঁকে গেল।
নীলেন্দু বলল, আমি তোমার সঙ্গে অনেক ঝগড়া করেছি দেবীদি, অনেক জ্বালিয়েছি। মহীদাকে আমি যতটা পছন্দ করি তোমাকে তার চেয়ে বেশি ছাড়া কম নয়। তুমি ভেবো না–শুধু মহীদার সঙ্গে আমার লড়াই সেরে আমি ফিরে যাব। তোমার সঙ্গেও আমার ঝগড়া আছে।
দেবযানী যেন হঠাৎ কেমন বিষণ্ণ চোখে নীলেন্দুর দিকে তাকাল। তার মনে হল, নিজেরও যেন অনেক কিছু বলার রয়েছে নীলেন্দুকে মহীতোষকে যা বলা যাবে না।
বেশ তো, ঝগড়া করো, দেবযানী মৃদু গলায় বলল।
কিন্তু ছেলেমানুষের ঝগড়া নয় দেবীদি। সে আগে অনেক করেছি।
না না, বড় মানুষের ঝগড়াই করো।
তুমি আমার স্বভাব জানো। আমায় তুমি গলাধাক্কা দিয়েও তাড়াতে পারবে না যতক্ষণ না আমি বিদায় নিচ্ছি। কাজেই সাবধান।
.
রোদের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মহীতোষ বলল, নীলু, তুই সাইকেল চালাতে জানিস?
এ-রকম ছেলেমানুষি প্রশ্নের জন্যে নীলেন্দু তৈরি ছিল না, খানিকটা অবাক কিছুটা বা মজার মুখ করে মহীতোষকে দেখতে দেখতে বলল, জানি। কেন?
আমি জানি না।
হেসে ফেলল নীলেন্দু। হঠাৎ তোমার সাইকেল চড়তে শেখার কথা মনে হল কেন?
মহীতোষ হাসিমুখে বলল, একটা সাইকেল আমার দরকার। নতুন সাইকেলের দাম কত রে?
জানি না।
বেশি হলে পুরনো একটা কিনব।
নীলেন্দু কিছুই বুঝতে পারছিল না। মহীতোষের সঙ্গে সে বাইরে ঘুরে বেড়াতে বেরিয়েছে। মহীতোষই নিয়ে এসেছে। রোদের মধ্যে হাঁটতে এখন পর্যন্ত ভালই লাগছে তার। শীতের পরিষ্কার আকাশে সূর্য জ্বলজ্বল করছিল। মাঠ-ঘাটের কোথাও বিন্দুমাত্র আর্দ্রতা নেই, গাঢ় তপ্ত রোদ সব কিছু শুকনো খসখসে করে ফেলেছে। শীতে ঘাস মরে যাচ্ছে মাঠের, কোনও কোনও গাছের পাতা শুকিয়ে ঝরতে শুরু করেছে। কাছাকাছি কোনও বনজঙ্গল নেই, উঁচু নিচু মাঠ, দু-পাঁচটা গাছ, ঝোপঝাড়, এক-আধ টুকরো ক্ষেত চোখে পড়ে। অল্প দূরে বালিয়াড়ির মতন মাটির স্তূপ দেখা যাচ্ছিল খানিকটা।
নীলেন্দু হেসে বলল, তোমার এই বুড়ো বয়েসে সাইকেল শেখার শখ হল কেন?
মহীতোষও হাসিমুখে জবাব দিল, শখ নয় রে, দরকার। আমার প্রায় সারাদিন অনেকটা ঘোরাঘুরি করতে হবে। হেঁটে পারব না, সময় নষ্ট হবে।
নীলেন্দু কিছু না বলে হাঁটতে লাগল। নানা রকম অনুমান করছিল, কোনওটাই যেন পছন্দ হচ্ছিল না।
আরও খানিকটা এগিয়ে এসে মহীতোষ বাঁ দিকে সামান্য খাড়াই মতন জায়গার দিকে পা বাড়াল। নীলেন্দুও।
খাড়াই পেরিয়ে এসে মহীতোষ সামনের দিকটা দেখাল। বলল, ওই দেখ–।
নীলেন্দু প্রথমটায় বুঝতে পারল না কী দেখবে; শেষে কাঠের ঘোট ঘোট খুঁটি দেখল, হাত দুই-আড়াইয়ের মতন রোগা রোগা খুঁটি মাটির সঙ্গে পোঁতা।
নীলেন্দু বলল, কী ওটা? কী দেখব?
মহীতোষ সামনের দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর বলল, আয়, বসি। তোকে বলছি।
কাছাকাছি গাছ খুঁজে ছায়ায় বসল মহীতোষ। নীলেন্দু মাটিতে বসে পা ছড়িয়ে সিগারেট ধরাল।
মহীতোষ অল্প সময় চুপচাপ থেকে শেষ বলল, ওই জমিটা কিনেছি আমরা।
নীলেন্দু মহীতোষের চোখের দিকে তাকাল। তার মাথায় কিছু ঢুকছিল না।
খুব বেশি জমি নয়। বিঘে দশেক। বিঘে দশও কম নয়– মহীতোষ বলল, এখানকার মাটি জঙ্গলের, মানে কিছুদিন আগেও ঝোপঝাড় ছিল, কেটেকুটে সাফ করে ফসল ফলাবার চেষ্টা হয়েছিল। জঙ্গলের মাটিতে চাষ আবাদ করা শক্ত। তবু মানুষ চেষ্টা করে। ওই যে জমি-ওখানে আমরা ফসল ফলাব।
ফার্মিং?
ফার্মিং, মানে ধান চাষ নয়– মহীতোষ বলল, আমি ভেবেছি অনেকটা জমি থাকবে শুধু তিসি কলাই এই সব চাষের জন্যে, বাকিটাতে শাকসবজি, এখানে অনেক রকম শাকসবজি হতে পারে।
নীলেন্দুর খুব জোরে হেসে উঠতে ইচ্ছে করছিল। মহীদা পাগল। একেবারে নির্বোধ। কোথাকার কোন রুক্ষ জমিতে চাষ আবাদের স্বপ্ন দেখছে! কী হবে শাকসবজি ফলিয়ে? ব্যবসা করবে? কলকাতার সবজিবাজারের ফড়েদের আলু পটল বেচবে?
হাত জোড় করে নীলেন্দু বলল, দোহাই মহীদা, তুমি আমায় আর হাসিয়ো না। তোমার বুদ্ধির ওপর আমার যেটুকু ভরসা ছিল, তাও গেল।
মহীতোষ বলল, তুই হাসতে পারিস কিন্তু একটা কথা বল তো? আমাদের দেশের কোটি কোটি মানুষ কী করে বেঁচে আছে?
নীলেন্দু মুখ ভরতি ধোঁয়া গিলে দু মুহূর্ত চুপ করে থাকল। পরে বলল, বেঁচে আছে না নেই– সেটাই তো প্রথম প্রশ্ন। এ প্রশ্ন তুমি নিজেই করেছ একদিন।
এখন আমি সে তর্কের মধ্যে যাচ্ছি না। ওটা পরে হবে। আমি তোকে জিজ্ঞেস করছি আমাদের দেশের শতকরা আশি নব্বই ভাগ মানুষের বেঁচে থাকার অবলম্বন কী? চাষবাস না কলকারখানা?
